তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে অনিঃশেষ অস্ত্র প্রতিযোগিতার হাতছানি
চলমান যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। তবে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অথবা ইরান—যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতা থামার সম্ভাবনা খুব কম।
অস্ত্র প্রতিযোগিতা নামক কৌশলগত অস্ত্র রাজনীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে ১৯৪৯ সালে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করে। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সফল পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এই পরীক্ষা চালায়। এই পাল্টা পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগের সূচনা হয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্স’ (আইসিএএন)-এর তথ্যমতে, এই প্রতিযোগিতা ক্রমে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটেন (১৯৫২), ফ্রান্স (১৯৬০), চীন (১৯৬৪), ভারত (১৯৭৪) ও পাকিস্তান (১৯৯৮) পর্যায়ক্রমে এতে যুক্ত হয়। তবে এই প্রতিযোগিতার ধারণাটির জন্ম আরও আগে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে জার্মানি ও ব্রিটেনের মধ্যে নৌ-যুদ্ধের সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশলগত লড়াইকে প্রথম অস্ত্র প্রতিযোগিতা বলা হয়। ১৯৪৫ সালের আগে এটি ছিল সংখ্যার লড়াই—কার কত অস্ত্র আছে। কিন্তু ১৯৪৯ সালের পর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এটি রূপ নেয় সক্ষমতার লড়াইয়ে। অর্থাৎ, কার অস্ত্র কত নিখুঁতভাবে বেশি মানুষ মারতে পারে ওই অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা। এই পর্বে মূল প্রতিযোগিতা চলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। শীতল যুদ্ধ অবসানের পর ১৯৯০ সালে দুই পরাশক্তির এই দৌড় কমলেও তা বিশ্বের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ওঠে এই আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র। ভারত-পাকিস্তান বাদে এই প্রতিযোগিতা মূলত অ-পারমাণবিক অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে এই দৌড় শুরু হয় ১৯৫০ সালে। তারা একে চারটি পর্বে ভাগ করেছেন: ১৯৫০-১৯৭৩; ১৯৭৩-১৯৮০; ১৯৮০-২০০৫ এবং ২০০৫ থেকে বর্তমান।
প্রথম পর্বে ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইসরায়েল ও আরব দেশগুলো, যার মূলে ছিল পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। তবে, এই পর্ব যে এখানেই শেষ হয়েছে তা বলা কঠিন কারণ, ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে এই প্রতিযোগিতা প্রছন্নভাবে আজও বিরাজমান।
দ্বিতীয় পর্বের শুরু ১৯৭৩ সালে। যা মূলত শেষ হয় ১৯৮০ সালে। এই প্রতিযোগিতা ছিল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে। ইরানে রুহুল্লাহ খোমেনির ক্ষমতা দখলের পর মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সকল হিসাব-নিকাশ আমূল পাল্টে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে এই অভূতপূর্ব ঘটনায় এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা কিছু সময়ের জন্য ইরাক ও ইরানের মধ্যে শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতা কিছুটা প্রশমিত হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাধ্যমে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অস্ত্র প্রতিযোগিতার তৃতীয় পর্যায়ের শুরু ১৯৮০ সালের পর। পরবর্তী সময়ে, যার নেপথ্য কারিগর ছিল ইরান ও সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মূল সূত্রপাত হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানি বিপ্লবের পর ইরাক যখন ইরান আক্রমণ করে, তখন সৌদি সরকার সাদ্দাম হোসেনকে বিপুল আর্থিক সহায়তা প্রদান করে—এমনটাই ছিল তেহরানের পক্ষ থেকে আসা প্রধান অভিযোগ। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় সৌদি আরব বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে তেলের দাম কমিয়ে দেয়, যা যুদ্ধের খরচ মেটাতে থাকা ইরানের জন্য ছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক আঘাত। যুদ্ধের ময়দানে সৌদি আরবের এই পরোক্ষ অথচ প্রভাবশালী অবস্থান দুই দেশের মধ্যে এক তীব্র সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় আড়াই দশক ধরে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছিল।
চতুর্থ পর্ব শুরু হয় ২০০৫ সালে, যদিও এর বীজ রোপিত হয়েছিল আশির দশকেই। ‘থিওক্র্যাটিক’ রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের উত্থান দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায় ও রাজনৈতিক দূরত্ব প্রসারিত করে। এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ক্রমান্বয়ে প্রবল আঞ্চলিক বৈরিতায় রুপ নেয়। এই দ্বন্দ্ব যুদ্ধাংদেহী হয়ে ওঠে যখন ইরান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দিতে থাকে। ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েল এই গ্রুপগুলোকে নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করে। ফলে এই দ্বন্দ্ব অনন্ত শত্রুতায় রূপান্তরিত হয়।
চলমান যুদ্ধও ঠিক ওই অনিঃশেষ শত্রুতার ফল। এই যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। বিজয়ী বা পরাজিত নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অথবা ইরান, যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতা থামার সম্ভাবনা খুব কম। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তি বিজয়ী হয় তাহলে ইরানের অস্ত্র মজুদ ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত থাকবে এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। পরাজিত হয়ে ইরানের ‘থিওক্র্যাটিক’ রেজিমের পরিবর্তন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়বে ইরানের ওপর। আর এই রেজিম পরিবর্তন যদি ইরাক বা লিবিয়ার মতো একটি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের দিকে যায় তাহলে ইরানের ব্যাপারে কোনো সরল ভবিষতবাণী করা কঠিন হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, ইরানের পাল্টা হামলার ফলে প্রতিবেশী সুন্নি অধ্যুষিত দেশগুলোতে যে ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিরাপত্তার জন্ম হয়েছে তা ওই দেশগুলোকে অস্ত্রের মজুদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে। যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তির ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য সামরিক নির্ভরতা বাড়াবে।
আর যদি এই যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ এক সময়ের জন্ম হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্র উৎপাদন ও মজুদ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। কারণ, ইরানের হামলা থেকে ভবিষ্যতে নিজেদের সুরক্ষার জন্য এই তেলসমৃদ্ধ রেন্টিয়ার রাষ্ট্রগুলো অনেকটা তৎপর হয়ে পড়বে। ইরানের বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘রক্ষাকর্তা’ স্ট্যাটাসকে নড়বড়ে করে তুলবে, তাই ওই দেশগুলোর জন্য অস্ত্র মজুদ ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়া অত্যন্ত সহজ হবে। যা মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ভয়ানক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় সূচনা করবে।
ইরান যদি এই যুদ্ধে বিশেষ কোনো সমঝোতা ছাড়াই জয়লাভ করে তাহলে এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা অ-পারমাণবিক থেকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে। নিরংকুশ বিজয় ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক নন-প্রলিফারেশান চুক্তির চাপ পাশ কাটিয়ে অস্ত্র উৎপাদন ও পরীক্ষার সুযোগ পাবে তারা। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও তাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা তৈরির জন্য চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্রকে। যা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা যুগের সূচনা করতে পারে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক অনেক দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অনন্ত এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগের দিকে ধাবিত করবে।
অস্ত্র প্রতিযোগিতার অমোঘ পরিণতি হলো যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা মানেই আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের হাতছানি।
