দুর্গাপূজা না শারদোৎসব: পরিচয়ের রাজনীতির মুখে বহুত্ববাদী সংস্কৃতি
দুর্গাপূজা যদি হয় দেবী আরাধনার ধর্মীয় রূপ, তবে শারদোৎসব তার সাংস্কৃতিক বিস্তার। আচার ও সংস্কৃতির এই সুন্দর মেলবন্ধন কি পরস্পরের বিরোধী, নাকি একে অপরের পরিপূরক?
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—কথাটি একসময় বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে একশ্রেণির রক্ষণশীল গোষ্ঠী এই সরল উচ্চারণটিকে ধর্মীয় বিধানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিষাক্ত সামাজিক আবহ তৈরি করেছে। তাদের ক্রমাগত উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানোর মুখে পিছু হটে অনেক প্রগতিশীল মানুষও বাক্যের মারপ্যাঁচে আশ্রয় খুঁজেছেন, স্লোগানটি বদলে বলতে শুরু করেছেন—‘ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ সবার’। ভাবনাটি ছিল ধর্মাচার বাদ দিয়ে অন্তত সামাজিক আনন্দের অংশীদার হওয়াকে স্পষ্ট করা।
কিন্তু সত্যি বলতে, এই ভাষাগত কারসাজি যে কতটা নিষ্ফল আর করুণ আত্মসমর্পণ, তা প্রতিবছর দুর্গাপূজা এলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির গন্ধ, ভোরের শিশিরের সঙ্গে দেবীদুর্গার আগমনী বার্তা যেমন প্রচারিত হয়, তেমনি আসতে থাকে প্রতিমা ভাঙচুরের খবরও।
বাংলাদেশের আঁচ লেগেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে সেখানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর। ঈদুল আজহার সময় রাজ্যটিতে দেখা গেছে কঠোর প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ও নজরদারি—যেখানে পশু কোরবানির নিয়মকানুন, ছাড়পত্র ও জনপরিসরে ধর্মীয় আচার পালনে নানাবিধ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। ধর্মীয় উৎসবকে সামাজিক শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার এই চেষ্টা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভেতর সৃষ্টি করেছে তীব্র শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা। এখন আবার দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূজামণ্ডপের পাশে প্রতিবছর বামপন্থিদের যে বইয়ের স্টল বসে, সেখানে ‘দুর্গাপূজা’র বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা যাবে না বলে স্পষ্ট শর্ত জারি করেছেন। তার সোজা যুক্তি—‘শারদোৎসব’ লিখে সনাতন ধর্মীয় পরিচয় ঢেকে একে নিছক সামাজিক মেলা বানানোর চেষ্টা চলবে না; স্টল বসাতে হলে ‘দুর্গাপূজা’ লিখেই বসাতে হবে, কারণ এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
শারদ অর্থ শরৎ-সম্পর্কিত। ফলে শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা স্বাভাবিকভাবেই ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিত। সেই পূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনই হচ্ছে ‘শারদোৎসব’। আর মহালয়ার শুরুর দিকে তো রয়েছেই—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী जगন্মাতার আগমন বার্তা’। এখানে শরৎকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের শুরুতে দুর্গার আগমনের কথা বলা হয়েছে।
শারদোৎসবের সর্বজনীন ও আধ্যাত্মিক রূপটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯০৮ সালে রচিত ‘শারদোৎসব’ নাট্যকাব্যে। রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক পূজাপদ্ধতিকে সামনে আনেননি; তার কাছে শারদোৎসব ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা এবং কর্মের বাঁধন ছিঁড়ে আনন্দের সাগরে মিলে যাওয়া।
বাংলার ঐতিহ্যে বসন্তকালের বাসন্তী পূজাও কিন্তু দুর্গাপূজা। আদিতে বসন্তকালে দুর্গা পূজিত হতো। কৃত্তিবাসী রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। প্রচলিত সময়ের বাইরে দেবীর এই আরাধনাই ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত।
শরৎকালের দুর্গাপূজার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য, লোকবিশ্বাস, ঋতুচেতনা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি জড়ানো। সময়ের সঙ্গে পূজা পারিবারিক ও জমিদারি পরিসর অতিক্রম করে বারোয়ারি এবং পরে সর্বজনীন রূপ লাভ করে। সমাজের বৃহত্তর অংশ এতে যুক্ত হতে শুরু করলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাড়াভিত্তিক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।
বিশ শতকে নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত সমাজের বিস্তার, সংবাদমাধ্যম, শিল্পচর্চা এবং নাগরিক সংগঠনের বিকাশ এই পরিবর্তনকে করে আরও শক্তিশালী। আধুনিক সময়ে থিম পূজা এই বিবর্তনে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। প্রতিমা, মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, সংগীত, চিত্রশিল্প ও স্থাপত্য—সবকিছু মিলিয়ে দুর্গাপূজা একটি বিশাল সৃজনশীল শিল্প-অর্থনীতির অংশ। মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে প্যান্ডেল নির্মাতা, আলোকশিল্পী, ঢাকি, ফুল বিক্রেতা, পোশাক ব্যবসায়ী, মিষ্টির কারিগর, পাপড় বিক্রেতাসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকা এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত।
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেসকোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় স্থান পায়। এই স্বীকৃতিতে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার হওয়ার পাশাপাশি শিল্প, কারুশিল্প, সৃজনশীলতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের একটি সম্মিলিত প্রকাশ।
দুর্গাপূজা সরাসরি দেবী দুর্গার আরাধনা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারকে সামনে আনে; শারদোৎসব সামনে আনে শরৎকালকে ঘিরে সেই পূজার বিস্তৃত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহকে। দুটি পরস্পরের বিপরীত নয়—দুর্গাপূজা তার ধর্মীয় পরিচয়, শারদোৎসব তার সাংস্কৃতিক বিস্তার।
‘শারদোৎসব’ বললে দুর্গাপূজার ধর্মীয় চরিত্র অস্বীকার করা হয়—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসসম্মত নয়। তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ শব্দের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি উৎসবকে কোন পরিচয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেটাই সামনে আসে। বিষয়টি তখন সংস্কৃতি থেকে প্রবেশ করে পরিচয়ের রাজনীতিতে। শুভেন্দু অধিকারী পত্রপত্রিকার ‘শারদসংখ্যা’ নয়, ‘পূজাসংখ্যা’ শব্দে বিশ্বাসী—এ যেন বিশালতাকে ক্ষুদ্রে আবদ্ধ করা। আর পূজাসংখ্যা বললে কতটা পূজা হলো, সাধারণ জনগণ সেটাই বোঝে।
বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতি কখনো একরৈখিক নয়। শাক্ত ঐতিহ্য, বৈষ্ণব সংস্কৃতি, লোকাচার, পারিবারিক রীতি এবং আধুনিক নাগরিক সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে বাংলার ধর্মীয় জীবন বহুস্তরের। দুর্গাপূজাও তার বাইরে নয়।
বাংলায় দেবী দুর্গা শুধু মহিষাসুরমর্দিনী নন, বহু বাঙালির কাছে দুর্গা হয়ে যান প্রিয় উমা; বাপের বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য ফিরে আসা ঘরের মেয়ে। কয়টা দিন তিনি আনন্দে কাটাতে চান। সে আনন্দ থাকে ধরণীতে সন্তানদের হাসিমুখ আর উৎসব উদযাপনের মধ্যে। আগমন ও বিসর্জনের আবেগ তাই ধর্মীয় আচারের সঙ্গে বাঙালির পারিবারিক অনুভূতিকেও যুক্ত করে।
খাদ্যসংস্কৃতিতেও রয়েছে এর নিজস্বতা। ভৌগোলিক অবস্থানভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবিকা, মানসিক এবং শারীরিক গঠন ভিন্ন হয়। বাংলায় মাছ শুধু খাদ্য নয়, বহু পরিবারের কাছে এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রেও অঞ্চল ও পরিবারভেদে খাদ্যপ্রথার বৈচিত্র্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্গাপূজায় আমিষ খাবার নিয়ে বিতর্ক উঠেছে, যা প্রচলিত সংস্কৃতি আর প্রথায় আঘাত।
বাংলায় হিন্দুত্বের সাংস্কৃতিক ভাষা বাংলার নিজস্ব শাক্ত ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস, লোকাচার ও বাঙালিয়ানার মধ্য দিয়ে হওয়াই আসল বাঙালিত্ব। বাংলার ধর্মীয় রাজনীতিতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করা সহজ নয়।
তাই পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যখন বলেন, ‘শারদোৎসব’ নয়, ‘দুর্গাপূজা’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে, তখন কেউ কেউ এটিকে ধর্মীয় পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করার ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখবেন হয়তো। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এমন বক্তব্য আত্মপরিচয়ের দৃঢ়তার বার্তা হিসেবেও দৃশ্যমান হতে পারে। বিপরীতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে উৎসব ধর্মের পাশাপাশি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, খাবার, পারিবারিক আবেগ ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে মিশে আছে, তা কি কেবল ধর্মীয় পরিচয়? বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় অধিকার ও সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিষয়, অন্যদিকে বাঙালির বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অংশ।
পপি দেবী থাপা সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী। ই-মেইল: popythapabpc@gmail.com
