সভ্যতার মুখোশ ও পুরুষতান্ত্রিক মনন: এ অন্যায়ের শেষ কোথায়?
আধুনিক যুগেও আমরা নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে এক সত্তা ভাবা ছাড়া আর কিছু কি করতে পেরেছি?
নারী। মাত্র দুই অক্ষরের ছোট্ট শব্দ, অথচ এর পরিব্যাপ্তি কতই না বিশাল। বানানের সীমারেখাকে অতিক্রম করে যদি শুধুমাত্র উচ্চারিত শব্দের প্রতিধ্বনি নিয়ে চিন্তা করা যায়, তাহলে নারীর নাড়ির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র সম্পর্কের সুগভীরতাকেই প্রকাশ করে না, দেখায় অবিচ্ছেদ্য টান, যা চাইলেই ছাপিয়ে যাওয়া যায় না। অথচ যুগে যুগে, কালে কালে এই নারীকেই হতে হয় লাঞ্ছিত, বঞ্চিত আর অপমানিত।
বিশ্বায়ন আর আধুনিকায়নের এই যুগে অনেক কিছুতে আমরা উৎকর্ষ সাধন করলেও আসলেই কি আমরা নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পেরেছি? নাকি আইয়ামে জাহিলিয়াত সময়ের মতো এখনো নারীকে অবজেক্টিফিকেশনের মাধ্যমে আরও সহজলভ্য করে উপস্থাপন করছি? আর যে নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সব নিয়ম মেনে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন না, তার প্রতি আমরা হয়ে উঠছি আরও হিংস্র, আরও ক্রূর।
সিমন দ্য বোভোয়ার তার ‘দ্যা সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে দেখান, নারীকে সব সময় পুরুষের সাপেক্ষে চিন্তা করা হয়। যে নারী গর্ভধারণ করতে পারে না, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরবর্তী প্রজন্মকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না, সমাজ তাকে ‘বাঁঝা’ উপাধিতে ভূষিত করে। সমাজচ্যুত না করলেও পরিবার, সমাজ, আত্মীয়-স্বজন সবার কাছে গঞ্জনা আর দয়ার পাত্রী বানায়। পুরুষের অতিরিক্ত জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য যে পতিতালয়, তার দায়ভারও কেউ পুরুষকে দেয় না। সেখানেও সকল কলঙ্কের বোঝা নারীরূপী পতিতাকেই বহন করতে হয়। আর তাই পেশাগত জীবনে একজন নারী মডেল বা অভিনেত্রীকে অসুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন পুরুষ তার একান্ত ব্যক্তিগত পণ্য হিসেবে চিন্তার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন না। বিনোদন জগতের সঙ্গে জড়িত নারীর পেশাগত জীবন আর ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে যে সীমারেখা, তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে না।
মূলত বিনোদন জগতে নিগ্রহের সবচাইতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চুক্তি বা অডিশনকে কেন্দ্র করে এই ঘটনাগুলোর সূত্রপাত ঘটে। দেশ, কাল, পাত্র ভেদে ঘটনা পরবর্তী পদক্ষেপে ভিন্নতা থাকলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীকেই বলির পাঁঠা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই অন্যায় যে শুধুমাত্র বিনোদন জগতেই সীমাবদ্ধ নয়। গৃহবধূ থেকে শুরু করে সকল স্তরের নারীদের জীবনে অনিরাপত্তা আর সহিংসতার নজির রয়েছে বিশ্বজুড়ে।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মানবতা পুরুষতান্ত্রিক; কারণ তা নারীকে নারীর নারীসুলভ গুণ দিয়ে বিবেচনা করে না, তারা নারীকে ব্যাখ্যা করে পুরুষের আলোকে। যে নারী স্বনির্ভরশীল হবে, তাকে পুরুষের ন্যায় বাইরে কাজ করা জানতে হবে, যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে হবে; কারণ যৌক্তিকতা ও স্বনির্ভরশীলতা পুরুষতান্ত্রিক গুণাবলি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষালি গুণাবলির মধ্য দিয়ে একজন নারীর তার সক্ষমতাকে প্রমাণ করার প্রয়োজন হলেও, পুরুষের এই যুক্তিবাদী আর স্বনির্ভর দীক্ষায় দীক্ষিত নারীদের এই সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে না। তখন তারা হয়ে ওঠে উচ্ছৃঙ্খল, বেপরোয়া এবং অবশ্যই নারীবাদী নারী। তাই আপনি নারী হিসেবে নারীবাদ বুঝুন আর নাই বা বুঝুন, আপনার স্বতন্ত্রভাবে যুক্তিবাদী চিন্তা করার ক্ষমতা আপনাকে শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সুবিধাভোগী পুরুষদের কাছে অপাংক্তেয়ই করবে না, তা আপনাকে তাদের সামনে বিপজ্জনক করে তুলবে। কারণ আপনি ‘না’-কে না আর ‘হ্যাঁ’-কে হ্যাঁ বলতে পারেন, সকল বাধা-বিপত্তির মাঝে মাথা তুলে দাঁড়াতে জানেন, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন পুরুষদের মুখোশ খুলে দিতেও পারেন।
এক্ষেত্রে চাইলেই আপনাকে দিয়ে আপনার মতের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অসামাজিক বা নীতিবিরুদ্ধ কাজ করানো যায় না। আর তাই আপনি যখন আপনার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, সংবাদ সম্মেলন করেন বা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ান, তখন আপনাকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হবে—সেটাই স্বাভাবিক। আর একজন নারীর জন্য তার সম্ভ্রম নিয়ে কথা বলার চাইতে চরম অপমানকর আর কী হতে পারে? আর তাতেও যদি আপনাকে দমানো না যায়, তাহলে অপঘাতে মৃত্যু তো আপনার জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মাঝে মাঝে মনে হয়, এই চিত্র কি শুধুই এই পোড়া দেশের? আশার বিষয় হচ্ছে—না। সমগ্র বিশ্বেই নারীর এক সামগ্রিক চিত্র এটি। দেশ, কাল, পাত্রভেদে আমরা ভিন্ন জাতীয় হতে পারি, কিন্তু এসেন্সে আমাদের সকলেরই গল্পটা কম-বেশি একই রকম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে লাঞ্ছিত, অবহেলিত পুরুষের সংখ্যা নিতান্ত কম না হলেও এমন একজন নারী খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি তার গোটা জীবনে কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যৌন হয়রানির মধ্য দিয়ে যাননি। এমন কোনো মেয়ে খুঁজে পাবেন না যাকে অবজেক্টিফিকেশন করা হয়নি, যাকে বলা হয়নি—‘এটা মাখ, ওইটা খাও যাতে আর একটু সাদা দেখাও।’ এমন একটা অশ্লীল শব্দ, গালি খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা নারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।
আমি বলছি না সব নারীরাই ভুক্তভোগী, পুরুষ কখনোই নারীর দ্বারা লাঞ্ছিত হন না, বা নারীরা কখনো নারী হবার অ্যাডভান্টেজ গ্রহণ করেন না। আমি বলছি, সভ্যতার এতগুলো স্তর পার করে এসেও আমরা আসলে কতটুকু সভ্য হতে পেরেছি বা আদৌ হয়েছি কি না?
যদি আসলেই তা হতে পারতাম, তাহলে কি শুধুমাত্র সমাজের ভয়ে স্বামীর সংসারে নির্যাতিত হওয়াকে বেছে নিতাম আলাদা না হয়ে গিয়ে? সিঙ্গেল মায়েদের কেন হীনমন্যতায় ভুগতে হয়, সব দোষের ভাগীদার হতে হয়? কেন বিধবা নারীর বিয়েতে যত বিধি-নিষেধ, বিপত্নীক পুরুষের বিয়েতে ততটাই আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন? কেন ষাটোর্ধ্ব নারীকে তার চরিত্রহীন পুরুষের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকার জন্য দ্বিতীয় বিয়ের সম্মতি দিতে হয়? কেন অবলা নারী পুরুষের বেলায় হাজার বিধি-নিষেধ আর সবল ও ক্ষমতাবান পুরুষদের হাতে সবাই জিম্মি? প্রশ্নগুলো আপনাকে ভাবতে শিখাক, চিন্তার উপাত্ত দিক।
মনোবিজ্ঞানের ‘The Banality of Evil’ ধারণাটি দেখায়, পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত বড় বড় অপরাধ সবথেকে সাধারণ মানুষ দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। আপনি হয়তোবা মনে করছেন আমি তো কোনো মডেল, অভিনেত্রী বা কোনো নারীর সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতা করিনি; কিন্তু নারীর প্রতি অন্যায় দেখে তাকে পাশ কাটিয়ে যাবার প্রবণতা, নারীর প্রতি সহিংসতার কোনো পোস্টে লাইক, শেয়ার বা বাজে মন্তব্য করা বা ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়তো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ওই ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করছে, যারা নারীকে নিছক রক্তপিণ্ড ছাড়া আর কিছু ভাবার ক্ষমতা রাখে না।
তা ছাড়া, খোলা চোখে আমরা যা দেখি, তা কি প্রতিনিয়ত পুরো সত্যটাকেই প্রকাশ করে? বিনোদন জগতের নারী, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেশাগত কারণে লক্ষ-কোটি মানুষের বিনোদনের উপাত্ত জোগান দেন, তারও কিন্তু স্রষ্টার সঙ্গে নিজস্ব আত্মিক জগৎ থাকতে পারে। সাধারণ কিছু নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যে মানসিকতা আমরা আমাদের মাঝে লালন করে চলেছি, তা কেবলমাত্র বিদ্বেষাত্মকই নয়, বিপজ্জনক এবং ত্রুটিপূর্ণও।
১৮ শতকের স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম দেখান, আমরা যখন বলি আগামীকাল সূর্য উঠবে, তখন আমরা ‘Uniformity of Nature’-এর সাপেক্ষে কথা বলি; অর্থাৎ গতকাল এবং আজ এমন হয়েছে, তাই আগামীকালও এমনটা হবে ধরে নিই। কিন্তু এই পদ্ধতি মূলত চক্রাকার যুক্তি (circular reasoning)। কারণ এক্ষেত্রে আমরা ইন্ডাকশনের সঠিকতা প্রমাণ করার জন্য ইন্ডাকশনের ওপরই নির্ভর করছি; যা পরিষ্কারভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। একইভাবে সকল বিনোদন জগতের বা কর্মজীবী নারী তাদের পেশাগত কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে গমন করেন বা বিভিন্ন কাজ করেন বলে তাদের ব্যক্তিগত জীবন যে তাদের পেশাগত জীবন থেকে আলাদা হবে না, বিষয়টি তেমন নাও হতে পারে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা যে কারণেই হোক না কেন, তাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে দেখার অবকাশ নেই।
চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, “Don't complain about the snow on your neighbor's roof when your own doorstep is unclean.” অর্থাৎ অন্যের সমালোচনা করার আগে, অন্যের দোষ-ত্রুটি দেখার আগে আপনি আপনাকে পরিশুদ্ধ করুন। হে পক্ষপাতদুষ্ট পুরুষতান্ত্রিকতা, আপনি নারী এবং অসহায় ক্ষমতাহীন গোষ্ঠির প্রতি তর্জনী উঁচু করার আগে লক্ষ্য করুন, বাকি আঙুলগুলো আপনার দিকে তাক করানো। আপনি নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন।
রুদমিলা মাহবুব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের সিনিয়র লেকচারার। ই-মেইল: rudmila.bracu@gmail.
