ঢাকায় সাংবাদিকতা সম্মেলনের পর্দা উঠল
“বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার মন-মানসিকতা ও সাহস সাংবাদিকদের আছে এবং তারা এটি করতে চায়,” বলেন মুকুর।
দশ দেশের সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে ঢাকায় শুরু হয়েছে দুই দিনের ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’।
শুক্রবার সকাল ৯টায় রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে শুরু হওয়া এ আয়োজনে গবেষক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
উন্নয়ন সংস্থা মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) তাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর বলেন, “আমরা আসলে সবাইকে নিয়েই কনফারেন্সটা করতে চেয়েছি। আমরা একা থাকতে চাইনি।
“আমরা চেয়েছি সবাই আমাদের সাথে থাকুক, অংশীজন হোক এবং সেই কারণেই আমরা এই কনফারেন্সের নাম দিয়েছি ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’।”
দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা যখন ৬০ জনকে ফেলোশিপ দেওয়ার ঘোষণা দেই, তখন মোটামুটি ১৮৮টি ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আইডিয়া আমরা পাই। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার মন-মানসিকতা ও সাহস সাংবাদিকদের আছে এবং তারা এটি করতে চায়।
“তাহলে আমাদের খুঁজে দেখা দরকার—এই সংখ্যাটি যেহেতু এত বড়, কেন আমরা পত্রিকা বা টেলিভিশনে এত বিপুল সংখ্যক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দেখতে পাই না।”
পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অনেক দেশেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে অনেকে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে থাকেন।
“কিন্তু বাংলাদেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং তৎকালীন সরকার অন্তত নীরব ভূমিকা পালন করে যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে তা উদ্বেগজনক।”
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে ঢাকায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, “আমি যে দেশ থেকে এসেছি, সেই সুইডেনে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন কী অর্জন করতে পারে।
“যখন সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করে এবং সমাজ স্বচ্ছতাকে মূল্য দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আস্থা তৈরি হয়। নাগরিকরা আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন যে তাদের প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য এবং এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তোলে।"
সম্মেলনে বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, “গত দুই বছরে আমরা গণমাধ্যম নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ দেখেছি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন হয়েছে, এমআরডিআইয়ের প্রতিবেদন হয়েছে, জাতিসংঘ ও ইউনেস্কোর প্রতিবেদন এসেছে।
“আমাদের কাছে এখন প্রচুর তথ্য আছে, আমরা অনেক আলোচনা করেছি এবং অনেক প্রশিক্ষণও হয়েছে। এখন সুযোগ এসেছে এগুলোকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার এবং সমাধানের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার।”
সুসান বলেন, “বর্তমান সরকারও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এর মানে হলো পরিবর্তন আনার সুযোগ এখন আমাদের সামনে।
“তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো না হওয়া সত্ত্বেও আমি মনে করি দেশের ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।”
সম্মেলনে অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন কানাডার টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলিয়ান শের, পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আইন বিশেষজ্ঞ জোয়ান বারাতা, আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-এডিটর স্বাতী ব্যানার্জী, ইউএনডিপি বাংলাদেশের ইলেক্টোরাল সাপোর্ট-ব্যালটের প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা আন্দ্রেস দেল কাস্তিয়ো সানচেজ, গ্লোবাল ফোরাম ফর মিডিয়া ডেভেলপমেন্টের (জিএফএমডি) ডেপুটি চেয়ার লক্ষ্মণ দত্ত পান্ত। এছাড়া গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
দুই দিনের এ সম্মেলনে মোট ১২টি সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্ল্যানারি সেশন, থিমেটিক সেশন, মাস্টারক্লাস ও প্যারালাল ট্র্যাক। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সংবাদমাধ্যমের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিউজরুম রূপান্তর, লিঙ্গ সমতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয়।
