শিশু হাসপাতাল: হাম আক্রান্ত শিশুদের ৬৫% পুষ্টিহীন, মায়ের দুধ পায়নি ৩৮%
মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশ জন্মের পর মায়ের দুধ পায়নি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে (বিএসএইচআই) হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৮২ শতাংশ জন্মের পর মায়ের দুধ পায়নি। এছাড়া হাম আক্রান্ত অন্য শিশুদের মধ্যেও ৩৮ শতাংশ মায়ের দুধ পায়নি পরিপূর্ণভাবে।
একইভাবে হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল; যার মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে এবং ৫৩ শতাংশ শিশুর মাঝারি ধরনের অপুষ্টি ছিল।
বিএসএইচআই এবং আইসিডিডিআর,বির একদল গবেষক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৫৪ জন হাম আক্রান্ত শিশুর ওপর গবেষণা করে এ তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে ১১ শিশু হামে মারা যায়।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএসএইচআই অডিটোরিয়ামে বুধবার সকালে এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসএইচআই পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর মুস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে গবেষকদের মধ্যে অর্থসম্মানির চেক তুলে দেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
গবেষকরা জানান, ১১ শিশু মারা যাওয়ার পর বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করা হয়। এতে নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি, এমন নয় মাসের কম বয়সি ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের হাম শনাক্ত হয়। টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের এবং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পর কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে অন্যান্য কারণ হাম আক্রান্তের পেছনে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের কোনটি সংক্রমণে ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করা বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল না।
গবেষণায় অন্তর্ভূক্ত ৩৫৪ জন শিশুর মধ্যে আইসিইউতে ভর্তির প্রয়োজন ছিল ১৮ জনের এবং বাকি ৩৩৬ জনের আইসিইউ প্রয়োজন হয়নি।
আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩৫৪ জনের শরীরে জ্বর, ৩৪৫ জনের ফুসকুড়ি, ৩০৪ জনের কাশি, ৬০ জনের সর্দি-কাশি, ৫৪ জনের ডায়রিয়া ছিল এবং ২১ জন বমি করেছে।
এসব রোগীদের মধ্যে পরিবারের মাধ্যমে হাসপাতালে এসেছে ২৫২ জন এবং রেফারেন্সে এসেছে ১০২ জন। তাদের মধ্যে ৩৪৩ জন সুস্থ্য হয়েছে এবং ১১ জন মারা গেছে।
অনুষ্ঠানে এক প্রেজেন্টশনে দেখানো হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাম রোগীর পরিস্থিতি। সেখানে দেখা যায়, বর্তমানে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশেই হাম রোগী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বর্তমানে হাম ও উপসর্গ থাকা রোগীর ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জন। এছাড়া ভারতে ২২ হাজার ৪৫৬ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ হাজার ১৪১ জন, মেক্সিকোতে ১১ হাজার ৩৯৮ জন, ইয়েমেনে ৯ হাজার ৭৩৬ জন, ক্যামেরুনে ৮ হাজার ৫৪০ জন, পাকিস্তানে ৮ হাজার ৪৫ জন, অ্যাঙ্গোলায় ৫ হাজার ৮৮৭ জন, মাদাগাস্কারে ৫ হাজার ৬১০ জন, নাইজেরিয়ায় ২ হাজার ৯২৩ জন, সুদানে ২ হাজার ৭৫৪ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার ১৩৪ জন, কানাডায় ১ হাজার ৭৯ জন এবং নেপালে সবচেয়ে কম ৪৫৬ জন।
হামের জিনোম সিকুয়েন্সের বিষয়ে পেজেন্টশনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী হামের ২৮ ভিন্ন ধরন রয়েছে; যার মধ্যে ডি-৮ এবং বি৩ গত বছর ছড়িয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশে চড়িয়েছে বি৩ ধরন।
গবেষকরা বলেন, হামের বি৩ ধরনের ১৮টি সিকুয়েন্স করে তারা দেখেছেন এর চাটি মিউটেশন হয়েছে। তবে এই মিউটেশন সিভিয়ার পরিবর্তন হয়নি। ফলে দেশে চলমান টিকা সে ক্ষেত্রে কার্যকরী হবে।
বিএসএইচআই পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী উপস্থিত ছিলেন।
