মাসে দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা বিএমইউতে, খরচ ভারতের ‘এক তৃতীয়াংশ’
এমন অস্ত্রোপচারের খরচ ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারের তহবিল থেকে বিনামূল্যে করা হবে বলে তুলে ধরেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য৷
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপনের তথ্য দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেছেন, এখন থেকে তারা মাসে দুটি করে লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের অস্ত্রোপচার আশেপাশের দেশের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ কম খরচে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটি সফলতার একটি উদাহরণ। এ খরচ ভবিষ্যতে আরো কম হবে।
এখন পর্যন্ত যে কয়টি অস্ত্রোপচার হয়েছে সেগুলোর খরচ সরকার দিয়েছে বলেও তুলে ধরেন তিনি।
উপাচার্য বলেন, এমন অস্ত্রোপচারের খরচ ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারের তহবিল থেকে বিনামূল্যে করা হবে।
মঙ্গলবার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দেন উপাচার্য৷
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সম্প্রতি ছয়টি সফল লিভার প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সপ্ল্যান্টের) তথ্য তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে আরও চারটি প্রতিস্থাপনের জন্য রোগী নির্বাচন ও প্রস্তুতি চলছে। এখন থেকে মাসে দুটি করে লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর বছরে ২৪টি এমন সার্জারির পরিকল্পনা রয়েছে।
এমন অস্ত্রোপচারে ভারতে ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সেই তুলনায় অর্ধেকের কম খরচে এ হাসপাতালে সফল অস্ত্রপাচার সম্ভব হচ্ছে। আশপাশের দেশে সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মত খরচ হয়। কিন্তু এখানে সেটা ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় হবে।
তিনি বলেন, আগের ছয়টি ট্রান্সপ্ল্যান্টের মধ্যে দুটি হয়েছে ২০২৫ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর। বাকি চারটি হয়েছে চলতি বছরের ৩ ও ৪ জুলাই এবং ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে এসব রোগীর ফলোআপ চিকিৎসা চলছে।
উপাচার্য বলেন, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিএমইউতে একটি করে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হলেও কার্যক্রমটি ধারাবাহিক ছিল না। তবে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার পর নিয়মিতভাবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
“আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে আরও দুটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার প্রস্তুতি চলছে। এর জন্য চারজন রোগী ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছেন।”
ডোনার নির্বাচনের স্বচ্ছতার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানবদেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন অনুযায়ী আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম ঠেকাতে একাধিক ধাপে ডোনার ও গ্রহীতার সম্পর্ক, চিকিৎসাগত উপযুক্ততা ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা হয়। এমনকি সব কিছু হওয়ার পর হাসপাতালের একটা বোর্ড রয়েছে, যেটি আবার সব কিছু যাচাই করে।
‘‘বিভিন্ন সময় হাসপাতালের কমিটি ডোনারের পরিচয়, উৎপত্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক যাচাই করে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়, যাতে কোনো আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম না থাকে।'’
মাসে দুটি করে ট্রান্সপ্ল্যান্টের লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়ে অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, “একজন দাতা ও একজন গ্রহীতাকে প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় লাগে। চিকিৎসাগত মিল, আইনগত অনুমোদন, মানসিক প্রস্তুতি এবং বিশাল লজিস্টিক সমন্বয় ছাড়া একটি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্ভব নয়।
‘‘এই ধরনের সফল অস্ত্রপাচার কোনো একজন সার্জনের সাফল্য নয়; সার্জন, হেপাটোলজিস্ট, অ্যানেসথেটিস্ট, নার্স, রেসিডেন্ট চিকিৎসক ও ইনফেকশন কন্ট্রোল টিম—সবাই মিলে এটি সম্ভব হয়েছে।'’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘‘দ্রুতই নিজেদের এ অস্ত্রোপচারে শতভাগ বিশেষজ্ঞ সার্জন তৈরি করতে পারব। যারা এই হাসপাতালের বাইরে দেশের বিভিন্ন সেন্টারে এই ধরনের সফল অস্ত্রপাচার করবেন। কারণ দেশে এটির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের বিষয়ে এখনো সেই ধরনের অস্থার জায়গা তৈরি হয়নি। আশা করি এখানে নিয়মিত অস্ত্রপাচার হওয়ার পর দেশের মানুষের কাছে সেই ইতিবাচক বার্তা যাবে।”
তিনি বিদেশের কিছু ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টারের বিষয়ে বলেন, ‘‘অনেক সেন্টার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সফলতার হার ঠিক রাখার জন্য কোনো ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন করে না। কিন্তু আমরা দেশের মানুষের স্বার্থে শুধু সফলতার হার বৃদ্ধিতে নয়, সেবার জন্য কাজ করবো।”
বিএমইউ বলছে, ছয়টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগ অংশ নেয়। ভারতের হায়দ্রাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (এআইজি) হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দল এতে কারিগরি সহযোগিতা দেয়।
সম্প্রতি সফল হওয়া গৃহীনি জোৎসা বেগম লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে সুস্থভাবে চলাফেরা করছেন, যার দাতা হিসেবে ছিলেন তার ছেলে মো. সাজ্জাদ।
এ বিষয়ে ছেলে সাজ্জাদ বলেন, ‘‘আমি অস্ত্রপাচারের পরও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না বাংলাদেশে এটি সম্ভব। আমার মা খুব সুস্থভাবে এখন জীবনযাপন করছেন। অপারেশনের জন্য আমাদের প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য করেন কিন্তু এই অস্ত্রপাচারের পর বুঝতে পারছি, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’’
সংবাদ সম্মেলনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, বিএমইউ অধ্যাপক ডা. সাইফ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমসহ ট্রান্সপ্ল্যান্ট কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
