সারাটা জীবন যেন মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে পারি: জন্মদিনে রুনা লায়লা
“গান আমার সব কিছু। এর বাইরে আমার কোনো ভাবনা নেই, পরিকল্পনা নেই, কোনো লক্ষ্য নেই।”
যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে চান কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। সোমবার ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে এই প্রত্যাশার কথা বলেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানালে জবাবে এমনটাই বলেন রুনা লায়লা।
তার কথায়. “মানুষের কাছে অনেক অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। আজকে অনেকে শুভেচ্ছা পেয়েছি। এখন ৭৩ এ এলাম। আজকের দিনে আমার প্রত্যাশা, যত দিন বাঁচব, সারাটা জীবন যেন মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে পারি, মানুষের মনে যেন জীবন্ত থাকতে পারি।”
টানা ৬০ বছরের সঙ্গীত জীবনে বাংলা, উর্দু, হিন্দি পাঞ্জাবিসহ ১৮টি ভাষায় দশ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন রুনা লায়লা। গানে গানে সমাদৃত হয়েছেন দেশে দেশে, খ্যাতির অনন্য উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এদিনে দেশ-বিদেশ থেকে ফোনে বহু মানুষের শুভেচ্ছায় সিক্ত রুনা লায়লা জানালেন, জন্মদিনটা কাটাচ্ছেন একেবারেই সাদামাটাভাবে, ঘরোয়া পরিবেশেই।
তিনি বলেন, “আজকের দিনটা বাড়িতেই থাকছি। কিছু করছি না, কোনো অনুষ্ঠানও নেই। কেক কাটাকাটিও নেই। বলতে পারেন, একেবারে নিজের মত।”
প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে ছোটবেলার জন্মদিনের স্মৃতিকথাও তুলে ধরেন এই শিল্পী।
তিনি বলেন, “ছোটকালের জন্মদিন পালনটা ছিলো অন্যরকম। অনেক স্মৃতি এখনও হৃদয়ে নাড়া দেয়, মনকে দোলায়িত করে, জাগরণ জাগায়।
“মা ও বড় বোন নতুন কাপড় সেলাই করে দিতেন সেটা পরে বার্থ ডে উদযাপন করতাম...বাড়িতে কত বন্ধু-বান্ধব আসতেন তাদের সঙ্গে জন্মদিনে কেক কাটতাম, কত আনন্দ তখন ছিল। সেটা এক অন্যরকম অনুভূতি।”
লুনা লায়লা বলেন, “আর এখন ৭৩ হয়ে গেলাম, এখনের জীবনটাই আরেক রকম। এখন নিজেদের মধ্যেই থাকছি, পরিবারকে নিয়ে দিনটা কাটাব।”
মানুষের দোয়া-আর্শিবাদ কামনা করে তিনি বলেন, “সবার ভালোবাসা-দোয়া-আর্শীবাদ চাই। সবার সাথে সবসময় আমি ছিলাম, আছি এবং আশা করি থাকব।
“আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি সুস্থ থাকি। আরও গান উপহার দিতে সবাইকে। প্রত্যাশা বলুন, ইচ্ছা বলুন...আমি যেন বাকী জীবনটা মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে পারি।”
গান গাইতে এখন কেমন লাগে জানতে চাইলে রুনা লায়লা বলেন, “গান আমার জীবন, গান আমার সব কিছু। এর বাইরে আমার কোনো ভাবনা নেই, পরিকল্পনা নেই, কোনো লক্ষ্য নেই।
“৬০ বছর ধরে গান গেয়ে আসছি। গানকে আমি ভালোবেসে, গানের সাথে প্রেম করে, গানকে সঙ্গি করেই আমার এই পথ চলা। আল্লাহর অশেষ রহমত, সৃষ্টিকর্তা আর্শীবাদ, মানুষের ভালোবাসায় আমি আজকে এখানে। এটাই আমার আনন্দ, এটাই আমার সুখ, এটাই আমার জীবন।”
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে জন্ম হয় জনপ্রিয় এই শিল্পীর। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ এমদাদ আলী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা আমেনা লায়লা ছিলেন সংগীত শিল্পী। মামা সুবীর সেনও ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী।
বাবার বদলির চাকরির কারণে আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে রাজশাহী থেকে পাকিস্তানের মুলতানে চলে গিয়েছিলেন। শৈশব কাটে পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানেই উচ্চাঙ্গ সংগীতে দীক্ষা নেন ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান ও আবদুল কাদের পিয়ারাংয়ের কাছে। গজলে দীক্ষা পান পণ্ডিত গোলাম কাদিরের (মেহেদি হাসানের ভাই) কাছে।
রুনা সিনেমায় প্লেব্যাক শুরু করেন কিশোরী বয়স থেকেই। উর্দু গানের বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে গাইতেন। 'জুগনু' সিনেমা দিয়ে ১৯৬৫ সালে তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ার শুরু হয়। আর বাংলা সিনেমাতে গান গাওয়া শুরু করেন সুবল দাসের সুরে 'স্বরলিপি' ছবিতে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় এক হাজার গান রেকর্ড হয়ে যায় তার।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে আসেন রুনা। সে সময় ভারতে বড় তিনটি কনসার্টে গান পরিবেশন করে সে দেশের দর্শকদের কাছেও সমাদৃত হন। বিশেষ করে ‘দমাদম মাস্ত কলন্দার’ গানটির জন্য ভারতে আলাদা পরিচিতি পান তিনি। ভারতের দুই কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সঙ্গেও সখ্য হয়।
আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন রুনা লায়লা। বাংলাদেশ সরকার এই শিল্পীকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত করেছে। এছাড়া ভারতে পেয়েছেন সায়গল পুরস্কার। পাকিস্তান থেকে তার ঝুলিতে এসেছে নিগার, ক্রিটিক্স, গ্র্যাজুয়েটস পুরস্কার।
কেবল গান নয়, চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন।
বাংলা ছাড়াও উর্দু, হিন্দি পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু, বেলুচি, আরবি, পারসিয়ান, মালয়, নেপালি, জাপানি, ইতালীয়, স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় গান করেছেন। রুনা লায়লা হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি শিল্পী, উপমহাদেশীয় সংগীত জগতের এক বিস্ময়কর নাম।
