শর্ট ফিল্ম ফোরামের ভাঙন প্রকাশ্যে
“তারা বলতে চাইছেন, এখন উৎসব করার অনকূল পরিবেশ নেই। এর মধ্য দিয়ে তারা মূলত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষেই কাজ করছেন।”
চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে প্রকাশ্যে এসেছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের ভাঙনের চিত্র।
আগামী শুক্রবার থেকে ‘সপ্তদশ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল ফোরামের একটি অংশ।
অন্যদিকে বুধবার ওই উৎসব স্থগিতের কথা জানিয়ে পাল্টা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে আরেকটি অংশ।
ফোরামের উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, মানজারে হাসীন মুরাদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উৎসব স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উৎসব স্থগিতের যে তথ্যটি ছড়ানো হয়েছে, তা ঠিক নয়। এটি বিভ্রান্তিকর। আমরা উৎসব আয়োজন করছি, উৎসব সকল আয়োজনই যথা সময়ে হবে।”
তবে শর্ট ফিল্ম ফোরামের উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোরশেদুল ইসলাম দাবি করেছেন, ফোরামের ‘বেশিরভাগ সদস্যের সিদ্ধান্তেই’ উৎসব স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ‘গুটিকয়েক’ সদস্য উৎসবটি আয়োজনের চেষ্টা করছেন।
কেন ভাঙন?
চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, মানজারে হাসীন মুরাদ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তানভীর মোকাম্মেল দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র উৎসব কমিটিরও চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
গত ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফোরামের একটি অংশ উৎসব কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে তানভীর মোকাম্মেলকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয় শর্ট ফিল্ম ফোরামে।
ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুথত্থানকে অস্বীকার করে তানভীর মোকাম্মেল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা আমাদের অনেককেই বেদনাহত করেছে। এজন্য ফোরামের সিদ্ধান্তেই তাকে উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হয়।”
তবে শর্ট ফিল্ম ফোরামের অনুষ্ঠান ও কর্মশালা বিষয়ক সম্পাদক অপরাজিতা সংগীতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফোরামের নামের সাথে তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, মানজারে হাসীন মুরাদ এবং তারেক মাসুদ- এই চারটি নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই চারজনসহ আরও কয়েকজন মিলে ৩৮ বছর আগে এই সংগঠনটি তৈরি করেছিলেন।
“এখন কোনো এক মহলের চাপে শর্টফিল্ম ফোরামের কতিপয় ব্যক্তি গঠনতন্ত্র না মেনে, অসাংবিধানিকভাবে ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তানভীর মোকাম্মেলকে ফেস্টিভালের চেয়ারম্যান পদ থেকে এবং মানজারে হাসীন মুরাদকে ফেস্টিভালের জুড়ি চেয়ার থেকে অপসারণ করেছেন।”
ফোরামের সাধারণ সভায় ‘৮০ শতাংশ সদস্য’ ওই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন অপরাজিতা সংগীতা।
তিনি বলেন, “কোনো অদৃশ্য চাপের মুখে সিনিয়রদের অসম্মান করে ফেস্টিভাল থেকে বিরত থাকার মতামত দিয়েছেন, আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। আমরা প্রায় সবাই উৎসব স্থগিতের ব্যাপারে একমত হয়েছি।”
এ বিষয়ে জানতে তানভীর মোকাম্মেলকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
মোরশেদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাতেগোনা কয়েকজন সদস্য উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর সঙ্গে আমাদের বেশিরভাগ সদস্যই একমত নয়।”
তিনি বলেন, উৎসব স্থগিত করা নিয়ে তাদের বক্তব্য ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই বলা হয়েছে’
তানভীর মোকাম্মেল ও মোরশেদুল ইসলামদের পাঠানো ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম এদেশের বিকল্পধারার স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও নির্মাণকর্মীদের একটি স্বাধীন সংগঠন। প্রতি দুই বছর অন্তর বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম এই আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবটির আয়োজন করে থাকে এবং প্রাণের আনন্দেই সবাই এই উৎসবে অংশ নেন।
“কিন্তু এবারে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো মহলের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে চলচ্চিত্র উৎসবটি তার নিজস্ব মূল্যবোধ ও চরিত্র হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের জরুরি সাধারণ সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্তক্রমে এই উৎসবটি আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অনুকূল পরিবেশে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা হবে।”
শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, “তারা বলতে চাইছেন, এখন উৎসব করার অনকূল পরিবেশ নেই। এর মধ্য দিয়ে তারা মূলত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষেই কাজ করছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের এই উৎসব আয়োজনে যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। তারা আমাদের বিনামূল্যে ভেন্যু বরাদ্দ দিয়েছেন এবং আর্থিক সহযোগিতাও করছেন।
“তথ্য উপদেষ্টা আমাদের উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন। আমরা মনে করছি না এখন অনকূল পরিবেশন নেই। এজন্যই আমরা উৎসবটি আয়োজন করছি এবং যথা সময়েই সবকিছু হবে বলে আশা করছি।”
কী থাকবে উৎসবে?
জহিরুল ইসলামের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১০১টি দেশের ২৭৬টি চলচ্চিত্র নিয়ে এ উৎসবের আয়োজন করছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম।
শুক্রবার থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলবে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারও ভেন্যু হিসেবে রয়েছে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন ও শিল্পকলা একাডেমি।
জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি এবং শিল্পী এস এম সুলতানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে উৎসর্গ করা হয়েছে এ উৎসব। অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ড্রিম, দ্য ফাইট, দ্য ভিক্টরি’ প্রদর্শিত হবে আগামী ২৩ ডিসেম্বর।
এবারের আসরের ‘কান্ট্রি ফোকাস’ ফিলিস্তিন। আগামী ২৫ ডিসেম্বর বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ফিলিস্তিনের আটটি ফিকশন চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে।
আঞ্চলিক ফোকাস হিসেবে আরব দেশগুলোকে নির্বাচিত করা হয়েছে। পরের দিন ২৬ ডিসেম্বর জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স মিলনায়তনে বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং দুপুর ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৯টি ফিকশন ও একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে।
এর বাইরে একাধিক সেশন রয়েছে। এসব সেশনে নুরুল রাশেদ চৌধুরী, রফিকুল আনোয়ার, জহিরুল ইসলাম, তারেক আহমেদ, নাঈম মোহায়মেনসহ অনেকে উপস্থিত থাকবেন।
২৭ ডিসেম্বর বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে হবে সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী আয়োজন।
