২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

আর্কাইভ না থাকলে সংস্কৃতি আস্তে আস্তে মরে যাবে: খুরশীদ আলম

খুরশীদ আলম এখনো নিয়মিত গান গেয়ে চলেছেন।

আর্কাইভ না থাকলে সংস্কৃতি আস্তে আস্তে মরে যাবে: খুরশীদ আলম
খুরশীদ আলম

নিফাত সুলতানা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2025, 06:45 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:12 PM

গানের জগতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মেধা নিয়ে বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলমের কোনো সংশয় না থাকলেও, তারা যোগ্য অভিভাবক পাচ্ছেন না বলে আক্ষেপ রয়েছে তার। 

এছাড়া ইদানিং যে পদ্ধতিতে গান তৈরি হয়, তাতে খুব একটা সন্তুষ্ট নন তিনি। 

গ্লিটজের সঙ্গে আলাপে এ কথা বলেছেন সংগীত শিল্পী খুরশীদ আলম। যিনি শুরু করেছিলে ষাটের দশকে। আশি বছর বয়সেও সুর-গানের সঙ্গে পথ চলছেন তিনি। 

খুরশীদ আলম স্মৃতিচারণ করেছেন ফেলে আসা সময়ের। এছাড়া নতুন প্রজন্মের সংগীতচর্চা, রয়্যালটি বঞ্চনা আর সাংস্কৃতিক আর্কাইভ গড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। 

ষাটের দশকের শুরুতে খুরশীদ আলম গাইতেন রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গান; এরপর ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক তার, আর সেই থেকে শুরু। প্রায় সাড়ে ৪০০ সিনেমায় গান করা আশি বছর বয়সী খুরশীদ আলম এখনো গাইছেন। প্লেব্যাক না করলেও বিভিন্ন টেলিভিশন স্টেশনে গানের অনুষ্ঠানে পাওয়া যায় এই শিল্পীকে।

‘চুরি করেছ আমার মনটা’, ‘বন্দী পাখির মত’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘পাখির বাসার মত দুইটি চোখ তোমার’ ‘অনন্ত প্রেম’,‘যদি বউ সাজো গো, আরও সুন্দর লাগবে গো’, ‘মাগো মা’ এমন বহু জনপ্রিয় গানের শিল্পী তিনি। 

তার গাওয়া গানে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন বাংলা সিনেমার নায়করাজ রাজ্জাক থেকে শুরু করে ওয়াসিম, জাভেদ, মাহমুদ কলি, আলমগীর, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহেল রানা, বুলবুল আহম্মেদসহ প্রায় সব জনপ্রিয় নায়ক।

খুরশীদ আলম মনে করেন, সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণ সরকারের দায়িত্ব। তার কথায় ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী আব্বাসউদ্দিন থেকে এখন পর্যন্ত যন্ত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকারদের জন্য আর্কাইভ তৈরি করা জরুরি।   

গ্লিটজ: কেমন আছেন? 

খুরশীদ আলম: অনেক ভালো আছি। 

গ্লিটজ: গানের ব্যস্ততা কী কমে গেছে?   

খুরশীদ আলম: না, আমাকে কম পাওয়া যায় না। আমি গান এখনো গাচ্ছি। টেলিভিশনে চ্যানেল থেকে নিয়মিত গানের প্রস্তাব পাই। সম্প্রতি এটিএন বাংলায় একটা লাইভ অনুষ্ঠানে রাত ১০টা ৫০ থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গান করেছি। এনটিভি, চ্যানেল আই প্রায় সব চ্যানেলেই আমি গান গাই।  

এখন আমার বয়স আশি। অনেক অনেক শুকরিয়া যে এই বয়সে এসেও গান করতে পারছি। নতুন গানও আসছে।          

গ্লিটজ: ষাট-সত্তর দশক এবং এর পরবর্তী সময়েও আপনার অনেক গান জনপ্রিয় ছিল। এখনকার গানগুলো কেমনভাবে উপভোগ করেন?    

খুরশীদ আলম: তখন যেভাবে গান হত এখন সেভাবে গান হয় না। আগে রেকর্ডিং করতে যেতাম, এখন মোবাইলে গান পাঠানো হয়। যার জন্যে গান পাঠাচ্ছি সে কি বুঝতেছে, না বুঝতেছে আমি কিছু বুঝতে পারি না। আগে আমাদের দেখানো হত এই সিনেমায় এই ভয়েসে এই লোকের গান হবে। নায়করাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে এই গান বাজবে। এই কমেডিয়ানের মুখে মানুষ এই গান শোনবে। সুরকাররা গান ঠিক করত।          

এখন হয়ে গেছে, আমি নিজেই গান লিখি, আমি নিজেই সুর করি, আমি নিজেই গাচ্ছি। একটা কাজ তিনজনে করাটা যেমন কঠিন ছিল তেমন সুন্দর ছিল। এখন তা নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। আমি কাউকে আঘাত করার জন্য কথাগুলো বলছি না। একটা লোক তিন-চারটা কাজ কিভাবে পারে? তবে আমি মনে করি আমাদের যে নতুন প্রজন্ম আসছে, তারা অত্যন্ত ট্যালেন্টেড। এখনকার গানগুলি খুব কমপ্লিকেটেড। কিন্তু এসব গান তারা খুব তাড়াতাড়ি তুলে তাড়াতাড়ি গাইতে পারেন।  

তবে তাদের জন্য একটা জিনিস খারাপ লাগে। আমরা যে কিংবদন্তিদের পেয়েছিলাম যেমন সমর দাস, আব্দুল আহাদ সাহেব, আব্দুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, খান আতাউর রহমান সাহেব, আজাদ রহমান, আলী হোসেন, আলাউদ্দিন আলী, আনোয়ার পারভেজ এদেরকে নতুন প্রজন্মরা পায়নি। কোন গান কাকে মানাবে করবে এটা ওনারা বুঝতে পারতেন।     

এখন মানালেই বা কি না মানালেই বা কি, আর না করলেই কি, গান বের করতে পারলেই হল। অত্যন্ত মেধাবী ছেলেমেয়েগুলি গানে আসছে কিন্তু তারা সঠিক গানের অভিভাবক পাচ্ছে না। 

গ্লিটজ: এখনকার গান আপনার শোনা হয়?     

খুরশীদ আলম: আমি শুনি। প্রত্যেকটা শিল্পীর গান শুনি। সত্যি কথা বলতে কি আমাদের যারা নতুন প্রজন্ম আসছে তাদের কিন্তু মৌলিক গানের সংখ্যাটা অনেক কম। তারা শাহনাজ রহমতুল্লাহর গান, রুনা লায়লার গান, সাবিনা ইয়াসমিনের গান করছেন। তাদের মৌলিক গান হওয়া উচিত, সেগুলো হয়ত ৩০ থেকে ৪০ বছর পর জনপ্রিয়তা পাবে।  

গ্লিটজ: আপনাদের সময়ের গানগুলো সংরক্ষণ করা নিয়ে আপনার বক্তব্য শুনতে চাই।

খুরশীদ আলম: একটা সত্যি কথা বলি দেশভাগের পর অর্থাৎ ৪৭ সালের পর থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে যারা আসছেন তারা শুধু তাদের চেয়ার এবং প্রথম কর্তাব্যক্তি যিনি ছিলেন তার গুণগান ছাড়া আর কিছু করেননি। সংস্কৃতি কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে সেটা তাদের মাথায় ছিল না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে অনেক কিছু করছে। কিন্তু অদ্যাবধি সংগীত নিয়ে কোনো জায়গায় কোন আর্কাইভ নেই। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণ সরকারের সবচাইতে প্রায়োরিটির জায়গা। এটার দায়িত্ব সরকারের। সারা পৃথিবীব্যাপী কিন্তু সরকার তাই করে আসছে, তাদের কালচার ঠিক রাখতেছে। একজন আব্বাসউদ্দিনকে নিয়ে এই দেশে কোনো আর্কাইভ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোক ডিপার্টমেন্ট থেকে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া একজন ছাত্র আব্বাসউদ্দিনকে চিনেন না। আব্বাসউদ্দিন সাহেবকে যে দেশের লোক চেনে না সেই দেশ কোনোদিন কালচারে উন্নতি করতে পারে না। 

আমি বিশ্বাস করি যারা গান-বাজনা করে তাদের জানা উচিত আমার অতীতে কোন কোন শিল্পী ছিল। সেটা যন্ত্রশিল্পী হতে পারে, কণ্ঠশিল্পী হতে পারে, গীতিকার হতে পারে, সুরকার হতে পারে। আমাদের এটা জানার সুযোগ করে দিতে হবে। আমি আশা করব যে আগামী সরকার যারা আসবেন তারা নিশ্চয়ই কালচারটাকে ধরে রাখবেন। না হয় এই দেশে সংস্কৃতি আস্তে আস্তে মরে যাবে। আর্কাইভটা জরুরি। 

গ্লিটজ: শিল্পীদের গানের রয়্যালটি বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করছিলেন আপনি, সেটা নিয়ে জানতে চাই।   

খুরশীদ আলম: শুধু আমার না, প্রত্যেকের। ফেরদৌসী রহমান থেকে শুরু করে আব্দুল আলিম, সৈয়দ আব্দুল হাদী, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, মাহমুদুন্নবী, বশির আহমেদ, আমিসহ অনেক শিল্পী আছেন যারা গানের রয়্যালটি পায়নি। কারো রয়্যালটি দেওয়া হয় না এই দেশে। একই দেশে দুই রকম আইন কীভাবে থাকে আমি জানি না। একটা গানের জন্য যারা গীতিকার তারা পাচ্ছে পয়সা, আমি শিল্পী আমি পাচ্ছি না। যারা গান লেখেন তারা রয়্যালটি পাচ্ছে ভালো, কিন্তু আপনি শিল্পীদের অধিকার দিবেন না? সারা পৃথিবীব্যাপী যদি দেয় তাহলে আমরা কেন বঞ্চিত।  

গ্লিটজ: রয়্যালটি পাওয়ার জন্য কী কী দরকার?

খুরশীদ আলম: আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। সিনেমার এত গান করেছি। এখন শুনছি এই গানের মালিক সিনেমার প্রযোজক, পরিচালক, গীতিকার। আমরা কেউ না। এটা না পাওয়ার আরেক কারণ হচ্ছে আমরা শিল্পীরা একত্রিত না। এটা সরকার বুঝে ফেলেছে।