০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

৮ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে

চলতি বছর গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Aug 2026, 11:16 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভুত পণ্যের দাম কমায় জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতির পারদ বেশ খানিকটা নেমেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে।

গত বছরের নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। ডিসেম্বরে হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

গত ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের শেষ মাস জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর প্রথম মাস জুলাইয়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

এ জুলাই জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হচ্ছে—গত বছরের জুলাইয়ে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা এখন কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা।

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, জুলাইয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভুত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ; জুনে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।

অন্যদিকে জুলাইয়ে খাদ্যবহির্ভুত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ; জুনে হয়েছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।

১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের ধাক্কায় দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের কয়েক মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছিল।

২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার। তবে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই আর্থিক বছর।

এদিকে গত জুলাই শেষে (২০২৫ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই) দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

৩ মাস পর ৯ শতাংশের নিচে নামল

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস পর দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। গত এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। জুনে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামে।

জুলাইয়ে তা থেকে আরও দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে।

চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে অবশ্য কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছিল। এরপর টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাই মাসে এর নিচে নামল।

গ্রামের পাশাপাশি শহরেও কমেছে

জুলাইয়ে শহরের পাশাপাশি গ্রামেও কমেছে মূল্যস্ফীতি। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে এই মাসে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

আগের মাস জুনে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

অন্যদিকে জুলাই মাসে শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২১ শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।

জুনে শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক শূন্য এক শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

মজুরি সূচক বেড়েছে

জুলাই মাসে জাতীয় গড় মজুরির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। আগের মাস জুনে এই হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এর মানে হল—জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি হারের চেয়ে বেশিই রয়ে গেছে। 

মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়; কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়।

মানুষের আয় বেশি বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও তা কিনতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু দেশে সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।

সাধারণত প্রতি মাসে যত মূল্যস্ফীতি হয়, এর বেশি হারে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে টপকে যায় মূল্যস্ফীতি।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ।

এরপর আর কোনোমাসেই মূল্যস্ফীতিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি মজুরি সূচক।

গ্রাম-শহর নির্বিশেষে ১৪৫টি নিম্ন দক্ষতার পেশার মজুরির ওপর হিসাব করে থাকে বিবিএস। মজুরিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ে।

বিবিএস বলছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। দেশে এরকম কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি মতো।