২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেরদৌস স্টিলে ১০ মৃত্যু: ‘ক্ষমা’ চাইলেন এমডি, ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর

নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 12:17 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:33 PM

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পুরনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন নিহতের ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি এমডি ফেরদৌস ওয়াহিদ। 

নিহত শ্রমিকদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিতে রোববার বিকেলে ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। 

ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “আমাদের যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে ওটার জন্য আমরা ফেরদৌস স্টিল ফ্যামিলি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা অক্লান্ত চেষ্টা করেছি, নিরাপদ পরিবেশে যেন শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারি। 

ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চান ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের এমডি ফেরদৌস ওয়াহিদ।

ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চান ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের এমডি ফেরদৌস ওয়াহিদ।

“আমরা চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। আমার সাধ্যে যতটুকু পেরেছি আপনাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও করব। ভবিষ্যতে যদি কখনো কিছু প্রয়োজন হয়, আমাদের কাছে আসবেন। আমাদের চেষ্টার কমতি থাকবে না।”

আমার শ্রমিকদের কোনো দোষ ছিল না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমার যে সহকর্মীরা মারা গিয়েছেন, এই দুর্ঘটনায় আমি কারো দোষ খুঁজে পাই না। এটা এমন একটি ঘটনা, গত ৩০-৪০ বছরে শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এর কোন নজির নেই। 

“এটার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছু মাথায় নিয়ে আমরা কাজ করব। আমরা চেষ্টা করব, আরো নিরাপদ কর্মক্ষেত্র কিভাবে তৈরি করা যায়।” 

অনুষ্ঠান শেষে ঘটনার কারণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “এটা তদন্তাধীন। আমরা তদন্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। এই মুহূর্তে কোন উপসংহারে পৌঁছানো সমীচিন বলে আমি মনে করছি না। 

“আপনারা সবাই আমাদের সাথে থাকুন। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা সবকিছু তুলে ধরতে পারব ইনশাল্লাহ।” 

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এখানে ঝুঁকির একটি না। অনেকগুলো ঝুঁকির বিষয় আছে। আগের দুর্ঘটনাগুলো ছিল অন্য রকম। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা হত ইঞ্জিন রুম এবং পাম্প রুমে। এই জাহাজটাতে বিপদের যে জায়গাটা ছিল, সবার আগে সেটা আমরা সরিয়ে ফেলেছিলাম। চেয়েছিলাম ঝুঁকির বিষয়টা ন্যূনতম করে নিয়ে আসব। তারপরও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নতুন একটি বিপদ এসে পড়েছে।”

“ছেলে তো আর পাইতেছি না”

অনুষ্ঠানে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করা হয়। 

চেক হস্তান্তর শেষে নিহত সানি জলদাসের মা আশকা দাস বলেন, “আমি তো ছেলে আর পাইতেছি না। আমি টাকা দিয়ে কি ছেলের মাত (ডাক) শুনতে পারব? টাকা দিয়ে কি আমাকে মা বলে ডাকবে? টাকা হয়ত উপকারে আসবে। উপকার দিয়ে কি করব? মেইন যেটা আমার ছেলে সেই তো আর নাই।” 

গত ১৪ অগাস্ট সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হন। ওই ঘটনায় সেদিনই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।

এ ঘটনায় নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে বিএসবিআরএ ও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। ঘোষিত ১০ লাখ টাকার মধ্যে দুর্ঘটনার পরপরই পরিবারগুলোকে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।

শিল্পনীতির বিধান অনুযায়ী দুই লাখ টাকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। রোববার বাকি সাত লাখ টাকার চেক নিহতদের পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। 

এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী সীতাকুণ্ডে বসবাসকারী পাঁচ নিহত শ্রমিকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। 

অন্য পাঁচ নিহতের পরিবার তাদের স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে একই পরিমাণ অর্থ পাবে।

অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “মানুষের জীবনের কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। তারপরও উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে কোনো পরিবার যেন পথে না বসে কিংবা অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য না হয়, সে জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকরা হলেন- পাবনার সুজানগরের আবদুল আলিম সুজন (৩৬), জামালপুরের ইসলামপুরের হাবিবুর রহমান (৫২), সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মো. মনছুর (৫৬), নাসির উদ্দিন (৫১) ও পলাশ দাশ (৩৯), দক্ষিণ সোনাইছড়ির মতিউর রহমান (১৭), মির্জানগর জেলেপাড়ার সানি দাশ (২০), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের খোকন মিয়া (২৩), গাইবান্ধা সদরের রানা মিয়া (২৩) এবং জামালপুর সদরের ইদ্রিস আলী (৫০)।

আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে তথ্য দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “তাদের অন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকলে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা প্রশাসন বিষয়টি তদারক করবে। আমাদের লক্ষ্য জাহাজভাঙা শিল্পকে শূন্য প্রাণহানির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে এখানে যারা কাজ করেন, তাদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করে জাহাজভাঙা শিল্পে নিয়োজিত সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানান।