চাকসু ভোট: ‘অনিয়মের’ ৮ অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্যের
“নির্দিষ্ট প্যানেলের পক্ষে কাজ করতে আসা বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারাসহ নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছেন,” বলেন ফরহাদুল ইসলাম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-চাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পরে প্রশাসনের ‘একপেশে আচরণ’, স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট বাক্সে ঢুকানোসহ আটটি অভিযোগ তুলেছে সুফিবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ‘অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল।
এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ফরহাদুল ইসলাম বুধবার বিকালে চাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেছেন, তারা নির্বাচনে অনিয়মসহ আটটি বিষয় নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত চান তারা।
এদিন আধা ঘণ্টা দেরিতে সকাল সাড়ে ৯টায় পাঁচ ভবনের ৬০টি কক্ষে প্রায় ৭০০ বুথে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।
চাকসু নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে ১৩টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। চাকসুতে ভিপি পদে ২৪ এবং জিএস পদে ২২ জন লড়ছেন।
ভোট শেষে বাম শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমর্থিত প্যানেল ‘দ্রোহ পরিষদ’ অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছে।
এছাড়া ‘কারচুপি ও প্রহসনের’ অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ চাকসু নির্বাচনের দাবিতে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ইনসানিয়াত বিপ্লব স্টুডেন্ট ফ্রন্ট সমর্থিত প্যানেল ‘রেভ্যুলেশন ফর স্টেট অব হিউম্যানিটি’।
‘অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী বলেন, “নির্বাচনের কিছু অনিয়মের বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনকে আটটি বিষয় বলেছি।”
চাকসু নির্বাচনের শুরুতে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি থাকলেও প্রশাসনের ‘একপেশে আচরণ, বিভিন্ন প্রার্থীর শৃঙ্খলা লঙ্ঘন’ করাসহ বিভিন্ন আপত্তিকর বিষয় উঠে এসেছে, যা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফরহাদুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ভবনের ২১৪ নম্বর কক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরবিহীন ২০টি ব্যালট পেপার বাক্সে প্রবেশ করানো হয়েছে। দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জানানোসহ মিডিয়ায় প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া স্বত্বেও প্রশাসন কোনোধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।
“এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষীদের শাস্তি দাবি করে ফরহাদুল ইসলাম বলেন, আমরা বিভিন্ন ভোটারদের সাথে কথা বলে জেনেছি, পানি দিলেই মুছে যাচ্ছে অমোচনীয় কালি। এটা প্রশাসনের উদ্দেশ্যমূলক গাফিলতি। অনেকের মতো আমরাও এই বিষয়টি জাল ভোটকাণ্ডে ব্যবহার হওয়ার সমূহ আশঙ্কা প্রকাশ করছি।”
ভোটকেন্দ্রের গোপন বুথে উদ্দেশ্যমূলক ছাপানো প্যানেলের কপি রেখে আসার অভিযোগ অসংখ্য ভোটাররা করেছেন দাবি করে তিনি বলেন, “প্রিজাইডিং অফিসাররা এ ঘটনা জানার পরেও কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
“আমাদের প্যানেলভুক্ত একজন প্রার্থীর দেওয়া তথ্য মতে, বিবিএ ফ্যাকাল্টি ভবনের ৩৩৫ নম্বর রুমে আগে ভোট দেওয়া একজনের আইডি কার্ড নিয়ে আরেকজন ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেকগুলো ভোট গ্রহণ কক্ষে ভোটারদের ব্যালট পেপার দেওয়ার পর স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়নি।”
সব প্যানেলের জন্য অনুমোদিত পর্যবেক্ষক তালিকা দেওয়া হলেও ‘অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের জন্য কোনো পর্যবেক্ষক কার্ড দেওয়া হয়নি দাবি করে একে ‘বিমাতাসুলভ আচরণ’ বলে অভিহিত করেন এই ভিপি পদপ্রার্থী।
তিনি বলেন, “আইটি ভবনের ৩০৯ নম্বর ভোট কক্ষের সামনে রাখা টেবিলে একটি নির্দিষ্ট প্যানেলের লিফলেট রাখা ভোটারদের প্রভাবিত করা, আইটি ভবন, চাকসু ভবন হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ভবনের সামনে অন্য একটি প্যানেলের ক্যাম্প বসানো হয়েছে যা আচরণ বিধির সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন।
“প্রার্থীদের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের বাইরে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বাধা দিয়েছেন এবং আমার সাথে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অশোভন আচরণ করেছেন। আমরা মনে করি, একটি বিশেষ পক্ষের হয়ে তারা কাজ করছে। এধরনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা এধরনের কর্মকাণ্ডের তদন্তপূর্বক বিচার চাইছি।”
তবে সাংবাদিকরা সেই বিশেষ পক্ষের নাম জানতে চাইলেও তা বলতে রাজি হননি এই প্যানেলের প্রার্থীরা।
ফরহাদুল ইসলাম বলেন, “ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় ছবিযুক্ত আইডি কার্ডগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা না করার কারণে বহিরাগতর সংখ্যা ছিল বেশি। নির্দিষ্ট প্যানেলের পক্ষে কাজ করতে আসা বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারাসহ নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছেন।
“বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল দৃষ্টিকটু। পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে তাদের অবস্থান ছিল রহস্যজনক। এছাড়া নির্বাচনি আচরণ বিধিতে উল্লেখ ছিল কেন্দ্রের ১০০ মিটারের ভেতরে কোনো প্রার্থী প্রচার চালানো বা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারবেন না। কিন্তু বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রার্থী ভোট কেন্দ্রের কাছাকাছি গিয়ে ভোটারদের নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন। এমনকি কাগজে ব্যালট নম্বর লিখে দিয়েছেন।”
৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচন যে আমেজ নিয়ে এসেছিল তা প্রশাসনের ‘অদূরদর্শিতা ও ব্যর্থতার’ কারণে অনুভব করতে পারেননি দাবি করে তিনি বলেন, “আমরা বর্জন করছি না, কারণ আমরা চাই বর্জন করলে একটা পক্ষ বর্জন নাও করতে পারে। এতে বুঝা যেতে পারে, চাকসুর নির্দিষ্ট কোনো প্যানেল বিজয় লাভ করবে। এতে চাকসু গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
“আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত। যাতে নজির স্থাপন হয় আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে বিচার হয়।”
