চট্টগ্রামে জয়ী সাত নতুন মুখ
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতে নৌকা, তিনটিতে স্বতন্ত্র এবং একটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন।
এবারের ভোটে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়ে সংসদে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের সাত নতুন মুখ। তাদের মধ্যে পিতার রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হলেন আরও তিনজন।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে দুটিতে নৌকার প্রার্থীদের হারিয়ে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্ররা এবং একটিতে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল হেরে গেছে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্রের কাছে।
রোববারের ভোটে জয়ীদের মধ্যে পাঁচজন প্রয়াত ও বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতাদের সন্তান, যারা কেউ প্রথমবার আবার কেউ একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।
বিএনপিবিহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পাশাপাশি দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদেরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ার অনুমতি দেয়।
এতে করে চট্টগ্রামের ৯টি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হন দলটির মনোনয়ন না পাওয়া স্বতন্ত্ররাই। আর যে দুটি আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়া হয় সেগুলোতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই ছিলেন মূল চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া বাকি পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনীয়া), চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে নৌকার প্রার্থীর জয় ছিল পূর্ব অনুমিত। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি ভোটের ফলেও।
আনিসুল আবারও, শেঠকে হারাল ছালাম
চট্টগ্রামের যে দুটি আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয় তার মধ্যে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে আগের তিনবারের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের আসন একটি। কিন্তু শুরু থেকে তার সামনে আওয়ামী লীগের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী চ্যালেঞ্জ হলেও কাজ হয়নি।
ভোটের ফলে এ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ৫০ হাজার ৯৭৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহজাহান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কেটলি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৬ হাজার ২৫১ ভোট।
এ আসনে ভোট পড়েছে ৯৮ হাজার ১০৭টি। বাতিল হয়েছে ৫৩৯টি ভোট। ভোটের হার ২০ দশমিক ৬২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে নৌকার প্রার্থী নোমান আল মাহমুদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। পরে ছালাম স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটে অংশ নেন।
ভোটের ফলে দেখা যায়, কেটলি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছালাম ৭৮ হাজার ২৬৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নগর আওয়ামী লীগের নেতা বিজয় কুমার চৌধুরী ফুলকপি প্রতীক নিয়ে ৪১ হাজার ৫০০ ভোট পেয়েছেন।
আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী সোলায়মান আলম শেঠ তৃতীয় হয়েছেন, ভোট পেয়েছেন ৮২৪৫ ভোট (লাঙ্গল)।
প্রথমবার সংসদ নির্বাচনের লড়াইয়ে নেমে জয় পেলেন সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম।
নতুন মুখ সাত
জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে সাতটিতেই এবার নতুন মুখ সংসদ সদস্য হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে এবার প্রথমবারের মত ভোটের লড়াইয়ে নেমে জয়ী হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ওই আসনের সাতবারের সংসদ সদস্য ছিলেন।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহবুব রহমান রুহেল ৮৯ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. গিয়াস উদ্দিন ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫২ হাজার ৯৯৫ ভোট।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে প্রথমবারের মতো দলের মনোনয়ন পেয়ে সরাসরি ভোটে প্রার্থী হন সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর খাদিজাতুল আনোয়ার সনি।
এই আসনে ১ লাখ ৬৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন সনি। আর তার নিকটতম ফটিকছড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবু তৈয়ব পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৫৬৬ ভোট।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে এবারই প্রথমবারের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন আওয়ামী লীগের প্রার্তী এস এম আল মামুন। তিনি সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান।
নৌকা প্রতীক নিয়ে এস এম আল মামুন ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। সেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির দিদারুল কবির লাঙল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৮৮০ ভোট।
চট্টগ্রাম-১২ আসনে আওয়ামী লীগ এবার প্রার্থী করে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পটিয়া উপজেলার সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীকে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী।
ভোটের ফলে দেখা যায় পটিয়ায় মোতাহেরুল ১ লাখ ২০ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে বিরাট ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী তিন বারের সংসদ সদস্য সামশুল পান ৩৫ হাজার ২৪০ ভোট।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে অনেকটা চমক দেখিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব।
ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোতালেব উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে সংসদ সদস্য হবার ভোটে দাঁড়ান। এ আসনে ৮৫ হাজার ৬২৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন মোতালেব। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু রেজা মো. নেজামুদ্দিন নদভী নৌকা প্রতীক নিয়ে ৩৯ হাজার ২৫২ ভোট পেয়েছেনে।
২০১৪ সাল থেকে এ আসনে জামায়াত ছেড়ে আসা নদভীকে প্রার্থী করছিল আওয়ামী লীগ। এবারও তাকে নৌকার প্রার্থী করা হয়। তবে স্বতন্ত্রের সুযোগ প্রার্থী হন উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে আসা মোতালেব।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনটি প্রচারণার শুরু থেকেই ছিল আলোচনায়। আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে বিতর্কিত হন।
ভোটের দিন শেষ মুহূর্তে মোস্তাফিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। এই আসনে বিজয়ী হন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শিল্পপতি মুজিবুর রহমান।
মোস্তাফিজুরের প্রার্থীতা বাতিল হওয়ায় তার ভোট গণনা হয়নি। ফল ঘোষণার পর দেখা যায় ৫৭ হাজার ৪৯৯ ভোট পেয়ে ঈগল প্রতীকের মুজিবুর জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটন পেয়েছেন ৩২ হাজার ২২০ ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে জয়ী নগর আওয়ামী লীগ নেতা আবদুচ ছালামও সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন মুখ।
পিতার ধারায় তিন নতুন, তিন পুরাতন
চট্টগ্রাম-৩ আসনে এবারসহ টানা তিনবার জয়ী হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা। তার পিতা মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের এক সময়ের সংসদ সদস্য।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মিতা এবার নৌকা প্রতীক নিয়ে ৫৪ হাজার ৭৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএমএ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছেন ২৮ হাজার ৭০ ভোট।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে এবার টানা দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য হলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
তার বাবা প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তিনবারের নির্বাচিত মেয়র। প্রথমবার সংসদে গিয়েই শিক্ষা উপমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন নওফেল।
এবার আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নওফেল নৌকা প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম জাতীয় পার্টির সানজিদ রশিদ চৌধুরী লাঙল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৯৮২ ভোট।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ তৃতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। তার পিতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ২০০৮ সালে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবার সাইফুজ্জামান ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেন। তার নিকটতম মোমবাতি প্রতীকের প্রার্তী পেয়েছেন ৫ হাজার ১৪১ ভোট।
রাজনীতিবিদ পিতার সন্তান এই তিন পুরনো মুখের পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মত জয়ী রাজনীতিবিদ পিতার সন্তান নতুন তিন মুখ হলো চট্টগ্রাম-১ আসনের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ পুত্র রুহেল, চট্টগ্রাম-২ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি এবং চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে এস এম আল মামুন।
এছাড়া এবার চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী পঞ্চমবারের মত এবং চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনীয়া) আসনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ চতুর্থবারের মত জয়ী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলি-ডবলমুরিং) আসনে জয়ী হয়েছেন গত অগাস্টে এই আসনের উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদে যাওয়া মহিউদ্দিন বাচ্চু।
দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জে পড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাচ্চু ৫৯ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী সাবেক মেয়র মনজুর আলম ফুলকপি প্রতীকে পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৫৩৫ ভোট। আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ মাহমুদ পেয়েছেন ২০৩৮ ভোট।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে টানা চতুর্থবারের মত জয়ী হলেন এম এ লতিফ। নগর আওয়ামী লীগের একাংশের বিরোধীতার মধ্যে নৌকার প্রার্থী লতিফ ৫১ হাজার ৪৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউল হক সুমন কেটলি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৫২৫ ভোট।
