২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

কোহলির দুর্দান্ত ইনিংস আর শেষ ওভারের নাটকীয়তায় পাকিস্তানকে হারাল ভারত

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচটি শেষ বলে ৪ উইকেটে জিতল ভারত।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Oct 2022, 06:03 PM

Updated : 23 Oct 2022, 07:49 PM

রোমাঞ্চ-উত্তেজনার নানা অলিগলি পেরিয়ে ম্যাচ গড়াল শেষ ওভারে। জয়ের জন্য তখন ভারতের দরকার ১৬ রান, শেষ ৩ বলে ১৩। সেখানেও নাটক কম হলো না। বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ নাওয়াজ করলেন উচ্চতার ‘নো’ বল। সেই বলে ছক্কা হাঁকালেন বিরাট কোহলি। ফ্রি হিট ডেলিভারি তার স্টাম্প এলোমেলো করে দিলেও বাই থেকে এলো ৩ রান! ২ বলে যখন দরকার ২, দিনেশ কার্তিক হয়ে গেলেন স্টাম্পড। এরপর বোলার করে বসলেন ওয়াইড। শেষ বল মিড-অফ ফিল্ডারের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে এক রান নিয়ে উল্লাসে মাতলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন।

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে দর্শকে ঠাসা গ্যালারির সামনে রোববার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪ উইকেটে জিতল ভারত। ১৬০ রানের লক্ষ্য তারা ছুঁয়ে ফেলল শেষ বলে।  

অবিশ্বাস্য এই জয়ের নায়ক কোহলি। ৪ উইকেটে ৩১ রানের ধ্বংসস্তূপ থেকে পঞ্চম উইকেটে হার্দিক পান্ডিয়ার সঙ্গে ৭৮ বলে ১১৩ রানের রেকর্ড জুটি উপহার দেন তিনি। ৫৩ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসে মাঠ ছাড়েন দলের জয় সঙ্গে করে।

গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০ উইকেটে হেরেছিল ভারত। এবার প্রতিশোধ নিল তারা।

শেষ ৩ ওভারে ভারতের দরকার ছিল ৪৮ রান। অষ্টাদশ ওভারে শাহিন শাহ আফ্রিদিকে তিনটি চার মারেন কোহলি, রান আসে ১৭।

পরের ওভারে আরেক পেসার হারিস রউফ প্রথম চার বলে দেন কেবল ৩ রান। তবে শেষ দুই বলে দারুণ দুটি ছক্কা হাঁকিয়ে ব্যবধান কমিয়ে আনেন কোহলি।

পাকিস্তানের মূল তিন পেসারের বোলিং কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায় অধিনায়ক বাবর আজম শেষ ওভারে বল তুলে দেন নাওয়াজের হাতে, নিজের প্রথম তিন ওভারে যিনি দিয়েছিলেন ২৯ রান।

নাওয়াজ শেষের শুরুটা করেন দারুণ। প্রথম বলে ফিরিয়ে দেন পান্ডিয়াকে (৩৭ বলে ৪০)। ১২ বছরের বেশি সময় পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে নেমে পরের বলে কার্তিক নেন এক রান। তৃতীয় বলে কোহলির ডাবল।

এরপরই নাওয়াজের ‘নো’ বল, ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা মারেন কোহলি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য আপত্তি তোলেন পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা।

পরের ডেলিভারি নাওয়াজ দেন ওয়াইড। এরপর ফ্রি হিটে ওই ৩ রানের পর নাওয়াজের আরেকটি ওয়াইড ও ভারতের রুদ্ধশ্বাস জয়।

ভারতের মতো পাকিস্তানের শুরুটাও ভালো ছিল না। প্রথম ১০ ওভারে তারা করতে পারে কেবল ৬০ রান। তবে পরের ১০ ওভারে তোলে ৯৯ রান।

শান মাসুদের ৪২ বলে ৫২ ও ইফতিখার আহমেদের ৩৪ বলে ৫১ রানের দায়িত্বশীল দুটি ইনিংসে লড়াইয়ের পুঁজি গড়ে পাকিস্তান।

দারুণ বোলিংয়ে ভারতের হয়ে তিনটি করে উইকেট নেন আর্শদিপ সিং ও পান্ডিয়া।

অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ম্যাচে বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল প্রবল। তবে ম্যাচের মাঝে বৃষ্টি নামেনি একবারও!

টস জিতে অনুমিতভাবে বোলিং নেন ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন আর্শদিপ। তরুণ পেসার ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম বলেই এলবিডব্লিউ করে দেন বাবরকে। পাকিস্তান অধিনায়ক পান গোল্ডেন ডাক এর স্বাদ।

আর্শদিপ নিজের পরের ওভারে এসে শর্ট বলে ফিরিয়ে দেন কিপার-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ানকেও।

গত বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ১৫২ রানের অবিচ্ছিন্ন উদ্বোধনী জুটিতে পাকিস্তানকে জেতানো দুই ওপেনার মিলে এবার করেন স্রেফ ৪ রান। এই সংস্করণে একসঙ্গে ইনিংস শুরু করে যা তাদের সর্বনিম্ন রান।

সেই ধাক্কা সামলে দলকে একটু একটু করে এগিয়ে নেন মাসুদ ও ইফতিখার। ১০ ওভার পর ইফতিখার তোলেন ঝড়। একাদশ ওভারে অশ্বিনকে ছক্কায় ওড়ানোর পর তিনটি ছক্কা হাঁকান আরেক স্পিনার আকসার প্যাটেলের পরের ওভারে। ফিফটির পরই তাকে ফিরিয়ে ৫০ বলে ৭৬ রানের জুটি ভাঙেন মোহাম্মদ শামি।

এরপর পাকিস্তান উইকেট হারায় নিয়মিত। পান্ডিয়ার একই ওভারে প্রায় একইরকম ভাবে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন শাদাব খান ও হায়দার আলি। পরের ওভারে ৩২ রানে থাকা মাসুদকেও ফেরানোর সুযোগ এসেছিল। নিজের বলে কঠিন ক্যাচটি নিতে পারেননি অশ্বিন।

নাওয়াজকে টিকতে দেননি পান্ডিয়া। আর্শদিপ বোলিংয়ে ফিরে শর্ট বলে বিদায় করেন আসিফ আলিকে।

শেষের আগের ওভারে আর্শদিপকে পরপর ছক্কা-চার মারেন আফ্রিদি। আর শেষ ওভারে রউফের একটি ছক্কায় চ্যালেঞ্জিং পুঁজি গড়ে পাকিস্তান।

রান তাড়ায় ভারতের শুরুটা হয় দুঃস্বপ্নের মতো। ইনিংসের দ্বিতীয় আর নিজের প্রথম ওভারে দারুণ ডেলিভারিতে লোকেশ রাহুলকে বোল্ড করে দেন নাসিম শাহ। চতুর্থ ওভারে বল হাতে পেয়ে রোহিতকে বিদায় করেন রউফ। স্লিপে দারুণ ক্যাচ নেন ইফতিখার।

সূর্যকুমার শুরু করেন প্রথম বলে চার মেরে। তবে টিকতে পারেননি তিনি। নিজের পরের ওভারে তাকে ফিরিয়ে দেন রউফ। প্রমোশন পেয়ে পাঁচ নম্বরে নেমে দ্রুতই রান আউটে কাটা পড়েন আকসার।

সপ্তম ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন অন্ধকার দেখছিল ভারত। এরপরই অসাধারণ ওই জুটিতে দলকে আলোর পথে নিয়ে আসেন কোহলি ও পান্ডিয়া।

প্রথম ১০ ওভারে ভারতের রান ছিল ৪৫। পরের ১০ ওভারে দরকার ছিল তাই ১১৫।

দ্বাদশ ওভারে নাওয়াজকে দুটি ছক্কা মারেন কোহলি, একটি পান্ডিয়া। তাতে ভারতের ইনিংস গতি পায় নতুন করে।  

শেষ পাঁচ ওভারে দরকার ছিল ৬০ রান। পরের দুই ওভারে দারুণ বোলিংয়ে রউফ ও নাসিম দেন কেবল ৬ রান করে।

কিন্তু পরের ওভারে আফ্রিদি দিয়ে ফেলেন ১৭ রান। গত বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে শুরুতে দারুণ বোলিংয়ে সুর বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। কিছুদিন আগে চোট থেকে ফেরা পেসার এবার তেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি। ৪ ওভারে দেন ৩৪ রান।

এরপর দুই ওভারে ৩১ রানের সমীকরণ মিলিয়ে ভারতের জয়ের হাসি। ৬ চার ও ৪ ছক্কায় অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসটি খেলে ম্যাচের সেরা কোহলি।  

কোহলি ও পান্ডিয়ার ১১৩ রানের জুটি টি-টোয়েন্টিতে পঞ্চম উইকেটে ভারতের রেকর্ড। আগের সেরা ছিল মহেন্দ্র সিং ধোনি ও যুবরাজ সিং জুটির ১০২ রান, ২০১৩ সালে রাজকোটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

এই নিয়ে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি সবশেষ সাত টি-টোয়েন্টিতেই জিতল রান তাড়া করা দল। আগে ব্যাট করে ২০১২ সালে সবশেষ জিতেছিল ভারত।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

পাকিস্তান: ২০ ওভারে ১৫৯/৮ (রিজওয়ান ৪, বাবর ০, মাসুদ ৫২*, ইফতিখার ৫১, শাদাব ৫, হায়দার ২, নাওয়াজ ৯, আসিফ ২, আফ্রিদি ১৬, রউফ ৬*; ভুবনেশ্বর ৪-০-২২-১, আর্শদিপ ৪-০-৩২-৩, শামি ৪-০-২৫-১, পান্ডিয়া ৪-০-৩০-৩, অশ্বিন ৩-০-২৩-০, আকসার ১-০-২১-০)

ভারত: ২০ ভারে ১৬০/৬ (রাহুল ৪, রোহিত ৪, কোহলি ৮২*, সূর্যকুমার ১৫, আক সার ২, পান্ডিয়া ৪০, কার্তিক ১, অশ্বিন ১*; আফ্রিদি ৪-০-৩৪-০, নাসিম ৪-০-২৩-১, রউফ ৪-০-৩৬-২, শাদাব ৪-০-২১-০, নাওয়াজ ৪-০-৪২-২)

ফল: ভারত ৪ উইকেটে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: বিরাট কোহলি