২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

প্রত্যাশার পথ ধরে ট্রফির কাছে বরিশাল, শেষ চমকের আশায় চিটাগং

শক্তি-সামর্থ্য-অভিজ্ঞতায় বিপিএলের ফাইনালে ফেভারিট ফরচুন বরিশাল, তবে শিরোপার মঞ্চে তাদেরকে চমকে দিতে পারে উজ্জীবিত চিটাগং কিংস।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Feb 2025, 09:23 AM

Updated : 10 Sep 2026, 12:32 PM

শক্তির গভীরতা, সামর্থ্যের সীমানা, দল গোছানো-পরিকল্পনা-পরিচালনা, সামগ্রিক ভাবমূর্তি, কোনো কিছুতেই দুই দলের তুলনা চলে না। চট্টগাম থেকে বরিশালের দূরত্ব যতটা, দুই দলের পার্থক্য আসলে তার চেয়েও বেশি। বিপরীতমুখী সেই দুই দলই এখন দাঁড়িয়ে একই মঞ্চে। পথ ভিন্ন হলেও দুই দলই এখন লক্ষ্যের কাছাকাছি। অপেক্ষা শুধু ট্রফি উঁচিয়ে ধরার। 

কিছু ভালো কিছু মন্দ, অনেক সমালোচনা, বিতর্ক, বেশ কিছু ইতিবাচকতা, সব কিছু পেরিয়ে এখন শেষের কাছে বিপিএলের একাদশ আসর। টানা দ্বিতীয় শিরোপার আশায় মাঠে নামবে ফরচুন বরিশাল। ফাইনালেও তারা পরিষ্খার ফেভারিট। চিটাগং কিংসের সামনে হাতছানি প্রথম শিরোপার। সবশেষ তারা বিপিএলে অংশ নিয়েছিল ২০১৩ সালে। সেবার ফাইনালে খেলেও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি তাদের। ১২ বছর পর ফিরেই সুযোগ সেই আক্ষেপ ঘোচানোর।

মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে শুক্রবার ফাইনাল ম্যাচটি শুরুর কথা ছিল সন্ধ্যায় ৭টায়। পরে সময় এগিয়ে এনে ম্যাচ শুরু হবে এখন ৬টায়।

বরিশাল এই মঞ্চে পা রেখেছে প্রত্যাশার পথ ধরেই। গত আসরে রোমাঞ্চ-উত্তেজনার স্রোকে সাঁতরে প্রথম শিরোপার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল তাদের। পরের আসরের পরিকল্পনা তখন থেকেই শুরু করেছিল তারা। ওই ফাইনালের পরই যেমন তারা নিশ্চিত করে ফেলেছিল কাইল মেয়ার্সকে পাওয়া। দলের কর্ণধার মিজানুর রহমান ও অধিনায়ক তামিম ইকবাল মিলে অনেক কিছুর ছক করতে শুরু করেছিলেন তখন থেকেই। সব কিছু মিলিয়েই এখন তারা আরও একবার লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি। 

আপাতত দৃষ্টিতে এই দলের ঘাটতির জায়গা খুব একটা নেই। এবারের আসরে তাদের সেরা বোলার ফাহিম আশরাফ পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ায় যে ফাঁক তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটা পূরণ হয়ে গেছে কাইল মেয়ার্স ফিরে আসায়। প্রথম কোয়ালিফায়ার দিয়ে বিপিএল অভিষিক্ত মোহাম্মদ আলি যেমন বোলিং করেছেন, সেখানেও বড় স্বস্তির ছোঁয়া লেগেছে দলে। আরেক বিদেশি দাভিদ মালান তো অসাধারণ ফর্মে আছেন। সঙ্গে ফাইনালে তাদের শক্তি আরও বেড়েছে জিমি নিশাম যোগ হওয়ায়। গত বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের হয়ে দুর্দান্ত খেলেছিলেন নিউ জিল্যান্ডের এই অলরাউন্ডার।

কোয়ালিফায়ারে তাওহিদ হৃদয়ের বড় ইনিংস খেলাও দলটির একটি দুর্ভাবনা জায়গা দূর করেছে। অধিনায়ক তামিম অবশ্য ব্যাট হাতে খুব দারুণ কিছু করতে পারেননি। তবে ফাইনালে তিনি আগেও জ্বলে উঠেছেন। বড় ম্যাচে বড় কিছুর আশা তার কাছে করা যায় আবারও। 

এমনিতে ফাইনাল ম্যাচে ফেভারিট বলে তেমন কিছু ধাকার কথা নয়। কিন্তু সামগ্রিক বাস্তবতা এমনই যে, ফাইনালে বরিশাল হারলে সেটিই হবে অঘটন!

তামিমের কণ্ঠেও অনেকটা সেই আত্মবিশ্বাসের সুর। গত আসরে অনেক অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে অনেক চ্যালেঞ্জ জিতে তবেই ট্রফি ছুঁতে পেরেছিলেন তারা। এবার প্রাথমিক পর্বের শীর্ষে থেকে প্রথম কোয়ালিফায়ারে দাপটে জয়ের পর বরিশাল অধিনায়কের চাওয়া, ফাইনালে ধীরস্থির থেকে স্রেফ নিজেদের কাজটুকু ঠিকঠাক করা। 

“গতবারের চ্যালেঞ্জ অনেক ভিন্ন ছিল। মাঝের টুর্নামেন্ট থেকে আমরা ১ ম্যাচ বাকি ছিলাম বাদ পড়া থেকে। সেখান থেকে জিতে জিতে ফাইনালে গিয়ে জেতা। এবার একটু ভিন্ন। আমাদের সেরকম চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়নি। আমাদের দল এখন অনেক রিল্যাক্সড আছে। যদি আমরা পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পারি, তাহলে আমাদের পক্ষে আসবে সবকিছু।”

“যে দল বেশি শান্ত থাকবে, তারই জেতার চান্স বেশি। আমি এমনিতে কোয়ালিফায়িংয়ে অনেক নার্ভাস ছিল। ফাইনাল আগেও দুইবার ফাইনাল খেলেছি। অত বেশি চিন্তিত থাকি না ফাইনালে। আশা করি কালকের দিনও এভাবে যাক। ফাইনাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি শান্ত থাকতে না পারেন, চাপে পড়ে যান, তখনই ভুল করবেন। শান্ত থাকা দলই বেশি সুযোগ পাবে।”

গতবারের চেয়ে আরেকটু জায়গাতেও এবার বরিশালের বাস্তবতা ভিন্ন। সেবার প্রথম ট্রফি জয়ের তাড়না ছিল। সেটি তীব্র এক চাওয়া। এবার ট্রফি ধরে রাখার ব্যাপার। তাড়না কতটা প্রবল থাকবে, সেই প্রশ্ন তোলা যায়। তামিম যদিও বললেন, বারবার জিতলেও ট্রফির তেষ্টা কখনও কমে না।

“ট্রফি এমন জিনিস, যারা ৫ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারাও চাইবে ৬ বার হতে। আমরাও অবশ্যই চাইব আবার নিতে। প্রতিপক্ষও অনেক ভালো ক্রিকেট খেলছে। খুলনা দারুণ দল ছিল। তাদেরকে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে চিটাগয। সেই ম্যাচেও দেখা গেছে, কিছুই অনুমান করা যায় না। আপনার ভালো ক্রিকেটার থাকতে পারে, তবে নির্দিষ্ট দিনের পারফরম্যান্স মূল ব্যাপার।”

“ফাইনালে আমাদের সেরা ক্রিকেট খেলতে হবে। ১৩-১৪ ম্যাচে যা করেছি, সব সেভাবেই করতে হবে ভিন্ন কিছু নয়। আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে সেরাটা দেওয়ার। ফাইনালকে শুধু একটি ম্যাচ হিসেবেই দেখতে হবে।”

প্লেয়ার্স ড্রাফটের দিন থেকেই যেমন বরিশালকে ফাইনালে দেখছিলেন অনেকে, ঠিক উল্টো বাস্তবতা চিটাগং কিংসের। অনেক বিতর্ক আর কালিমাকে সঙ্গী করে ২০১৩ আসরের পর থেকে অস্তিত্ব ছিল না এই ফ্র্যাঞ্চাইজির। এক যুগ পর হুট করেই তাদেরকে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্লেয়ার্স ড্রাফটে তারা চমকপ্রদ দল গড়তে পারেনি। দেশি-বিদেশি বড় কোনো তারকা দলে নেই। সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন ‘মেন্টর’ শাহিদ আফ্রিদি, তিনিও মাঝপথে ফিরে গেছেন পাকিস্তানে। ১২ বছর আগের মতো এবারও পারিশ্রমিক বিতর্ক এবং নানা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে তারা। এত কিছুর পরও, পারিপার্শ্বিক সব চ্যালেঞ্জ সামলে আজ তারা শিরোপার মঞ্চে।

বড় কোনো নাম না থাকলেও কার্যকর কিছু ক্রিকেটার তাদের আছে। শামীম হোসেন, সৈয়দ খালেদ আহমেদ, আলিস আল ইসলামরা দলকে টেনে নিয়েছেন নানা পরিস্থিতিতে। অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন নেতৃত্ব দিয়েছেন দারুণভাবে। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে তারা যেভাবে যে পরিস্থিতি থেকে জিতেছেন, তাতে দলটা প্রবল আত্মবিশ্বাসী ও উজ্জীবিত থাকার কথা। কোনো দল যখন এতটা অনুপ্রাণিত থাকে, নাটকীয় অনেক কিছুই তারা করে ফেলতে পারে।

কোচ শন টেইটের কণ্ঠেও ফুটে উঠল সেই আত্মবিশ্বাসের ঝলক। বরিশালকে প্রাপ্য সম্মান ঠিকই দিচ্ছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার। তবে নিজ দলে তার আস্থাও প্রবল।

“অবশ্যই আমরা আত্মবিশ্বাসী। তবে অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছি না। তবে আত্মবিশ্বাস তো রাখতেই হবে। ফাইনাল দুই দলের জন্যই সমান-সমান। দারুণ একটি ম্যাচ জিতে এসেছি আমরা। দলের মধ্যে তাই বিশ্বাস আছে। অনেকে হয়তো বলবে বরিশাল ফেভারিট। সমস্যা নেই। এটা তো বদলানো যাবে না। তবে আমরা খুব ভালো ক্রিকেট খেলছি। আমি নিশ্চিত, আমরা জিতলেও লোকে অবাক হবে না। আমরাও ভালো দল।"

"বরিশাল অবশ্যই খুব ভালো দল। উঁচু মানের ক্রিকেটার আছে। তবে আমি তাদের নিয়ে কথা বলতে চাই না। নিজেদের দিকেই সব মনোযোগ রাখতে চাই।"

নানা বিতর্কে ভরা বিপিএলে ফাইনালের আগের দিনও ব্যতিক্রম ছিল না। ট্রফি নিয়ে দুই অধিনায়কের ফটো সেশনের কোনো আয়োজনই ছিল না। সংবাদমাধ্যমের নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পরে তাড়াহুড়ো করে সন্ধ্যায় টিম হোটেলে ছোট্ট এক আয়োজন রাখা হয়, যেটি শেষ হয়ে যায় চোখের পলকেই। 

তবে ফাইনালের আগে ফটোসেশন যেমনই হোক, ফাইনাল শেষে ট্রফি নিয়ে ছবির পর ছবি তোলা আর উৎসবে মেতে ওঠার আকাঙ্ক্ষা কোনো দলেরই কম নেই। অপেক্ষা এখন শেষের রোমাঞ্চের।