২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

ক্রিকেটানন্দের নহরে শান্তর রেকর্ড-সেঞ্চুরির প্রহর

মুশফিকুর রহিমকে ছাড়িয়ে অধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড এখন নাজমুল হোসেন শান্তর।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 May 2026, 04:17 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:34 PM

তখন সবে ১০টি বল খেলেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। মোহাম্মাদ আব্বাসের সুইং অকার্যকর করতে ক্রিজের একটু বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যাট করছিলেন তিনি। আব্বাসের ডেলিভারিটিতে আরেক ধাপ এগিয়ে এসে হাফভলির মতো বানিয়ে নান্দনিক এক অন ড্রাইভ করলেন তিনি। ফিল্ডারকে কোনো সুযোগ না দিয়ে বল চলে গেল বাউন্ডারিতে। একটু পর আরেকটি অন ড্রাইভে চার মারলেন তিনি শাহিন শাহ আফ্রিদিকে। আভাসটা মিলে গেল সেখানেই!

শান্ত যখন ইনিংসের শুরুর দিকে অন ড্রাইভ খেলেন, তাতেই ফুটে ওঠে, খুব ভালো ছন্দ ও অবস্থানে আছেন তিনি। সাধারণত ইনিংসগুলো বড় করেও থাকেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়। শুরুর ইঙ্গিতকে পূর্ণতা দিয়েই বাংলাদেশ অধিনায়ক উপহার দিলেন দারুণ এক সেঞ্চুরি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে ১২ চার ও ২ ছক্কায় ১৩০ বলে ১০১ রানের ইনিংস খেলেন শান্ত। 

৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারে ১৪ বার ফিফটি ছুঁয়ে ৯টিকেই রূপ দিলেন তিনি শতরানে। সবশেষ পাঁচ টেস্টে তার চতুর্থ সেঞ্চুরি এটি।

বাংলাদেশের হয়ে তার চেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি আছে তিনজনের। তবে একটি জায়গায় তিনিই এখন সবার ওপরে। বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড এখন এককভাবে তার।

নেতৃত্বের ৩০ ইনিংসে তার পঞ্চম সেঞ্চুরি এটি। ছাড়িয়ে গেলেন তিনি মুশফিকুর রহিমকে (৬১ ইনিংসে ৪টি)। অধিনায়ক হিসেবে ৩১ ইনিংসে মুমিনুল হকের শতরান ৩টি।

রেকর্ড ও মাইলফলকের জন্যই শুধু নয়, শান্তর ইনিংসটি ক্রিকেটীয় বিচারেও একদম বিশ্বমানের। প্রতিপক্ষের বোলিং ও পারিপার্শ্বিকতা মিলিয়ে সত্যিকারের শীর্ষ মানের ইনিংস।

সবুজাভ উইকেটে টস জিতে বোলিং নেওয়া পাকিস্তান নতুন বলে বাংলাদেশের দুই ওপেনারকে ফেরায় দ্রুতই। দল যখন বেশ চাপে, তখন শান্তর ব্যাটেই মেলে স্বস্তি। পেস সহায়ক উইকেটে পাকিস্তানি পেসারদের সামনে খানিকটা হাঁসফাঁস করতে থাকা দলকে তাজা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেন অধিনায়ক।

ওই অন ড্রাইভ দুটিতে শুরু। এরপর দারুণ সব ড্রাইভ, কাট, পুল শটে পেসারদের লেংথ এলোমেলো করে দেন তিনি। পাকিস্তানি পেসাররা বাধ্য হন পরিকল্পনা থেকে সরে যেতে। তাতে অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যান মুমিনুল হকের কাজও সহজ হয়ে যায়। 

শুরু থেকেই দারুণ ইতিবাচক মানসিকতা ছিল তার ব্যাটিংয়ে, ছিল দারুণ তাড়নার প্রকাশ। শট নির্বাচনে ভুল করেননি বললেই চলে। স্পিন যখন আক্রমণে এসে, তিনি জবাব দিয়েছেন পাল্টা আক্রমণে। সালমান আলি আগাকে উড়িয়েছেন ছক্কায়। ইনিংসজুড়ে তার ব্যাটে নির্ভরতার ছাপ ও কর্তৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। হাসান আলির বলে দুর্দান্ত পুল শটে ফিফটিতে পৌঁছে যান ৭১ বলে।

ফিফটির পরও চোখধাঁধানো কিছু ক্রিকেট শট এসেছে তার ব্যাট থেকে। দিনের সেরা শটটি খেলেন শতরানের কাছে গিয়ে। আব্বাসের ফুল লেংথ ডেলিভারিতে অসাধারণ এক লফটেড শটে লং অন দিয়ে ছক্কায় ৮৯ থেকে পৌঁছে যান তিনি ৯৫ রানে। 

একটু পর আব্বাসের বলেই দৃষ্টিনন্দন কাভার ড্রাইভে চার মেরে শতরানে পা রাখেন ১২৯ বলে।

মাইলফলক ছুঁয়ে শূন্যে লাফিয়ে ওঠা, ব্যাট উঁচিয়ে উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দেওয়া, মাটিতে মাথা ছুঁইয়ে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন, তার চেনা উদযাপনই দেখা যায়। তার পিঠ চাপড়ে দেন ক্রিজে সঙ্গী মুমিনুল হক।

দুজনের জুটিতে ততক্ষণে উঠে গেছে ১৭০ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় উইকেটে যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।

তৃতীয় উইকেটে বাংলাদেশের রেকর্ড জুটিও এই দুজনেরই। ২০২১ সালে পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৪২ রানের জুটি গড়েছিলেন তারা।

এবার সেটির কাছাকাছি যাওয়া হয়নি। উদযাপনে একটু বেশি সময় নিয়েছিলেন বলেই কি না, মনোযোগ একটু নড়ে যায় শান্তর। শতরান ছোঁয়ার পরের বলেই একটু ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে ব্যাট নামাতে খানিকটা দেরি করে ফেলেন। তাতেই সর্বনাশ। বিদায় নিতে হয় এলবিডব্লিউ হয়ে।

টেস্ট শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ব্যাটিং ইউনিটে তারা অনেক সময়ই আলোচনা করেন ১০০-১৫০-২০০ রান করা নিয়ে। ইনিংসটি যেভাবে সাজিয়েছেন তিনি, তাতে আরও বড় কিছুর হাতছানিই ছিল। সেটি পারলেন না।

তবে যেটুকু পারলেন, সেটিই মেলে ধরল তার ব্যাটসম্যানশিপের উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন।