ফারুকির রেকর্ড ছুঁলেন আর্শদিপ, ব্যাটিংয়ের সেরা গুরবাজ
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন আফগানিস্তানের রাহমানউল্লাহ গুরবাজ, বোলিংয়ে রেকর্ড গড়ে শীর্ষে আছেন আফগানিস্তানের ফাজালহাক ফারুকির সঙ্গে ভারতের আর্শদিপ সিং।
উগান্ডার বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে শুরু। টুর্নামেন্টজুড়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সেমি-ফাইনালে কুইন্টন ডি কককে বোল্ড করে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার রেকর্ড স্পর্শ করেন ফাজালহাক ফারুকি। তবে বেশি দিন একা থাকা হয়নি আফগান পেসারের। ফাইনালে জোড়া শিকারে রেকর্ড স্পর্শ করে যৌথভাবে চূড়ায় বসেন আর্শদিপ।
ফারুকি ও আর্শদিপের রেকর্ড গড়ার আসরে ব্যাটিংয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন রহমানউল্লাহ গুরবাজ। ফাইনালে সুযোগ থাকলেও তাকে টপকাতে পারেননি রোহিত শার্মা, কুইন্টন ডি ককরা।
রেকর্ড গড়ে বোলিংয়ের শীর্ষে ফারুকি
ফাজালহাক ফারুকি - ৮ ইনিংসে ১৭ উইকেট
প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত শুরুর পর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭ রানে ৪ উইকেট নেন ফারুকি। আফগানদের ৮৪ রানের জয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন তিনি। পরে পাপুয়া নিউ গিনির বিপক্ষে ৩ উইকেট নিলে তিন ম্যাচে ১২ শিকার হয়ে যায় তার।
এরপর কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে যান তিনি। দলের বোলিংয়ে বিকল্প বাড়ার পর শেষ পাঁচ ম্যাচের চারটিতে তাকে পুরো ৪ ওভার করাননি রাশিদ খান। সব মিলিয়ে ওই পাঁচ ম্যাচে তিনি নেন আরও ৫ উইকেট।
২০২১ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম আসরে ১৬ উইকেট নিয়ে এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড গড়েছিলেন হাসারাঙ্গা। শেষ চার থেকে বিদায়ের ম্যাচে ডি কককে ফিরিয়ে সেটি নিজের করে নেন ফারুকি।
মাত্র ৯.৪১ গড় ও ওভারপ্রতি ৬.৩১ রান খরচায় এই ১৭ উইকেট নেন ২৩ বছর বয়সী পেসার। উগান্ডার বিপক্ষে তার ৯ রানে ৫ উইকেট এবারের বিশ্বকাপের সেরা বোলিং।
আর্শদিপ সিং - ৮ ইনিংসে ১৭ উইকেট
পুরো আসরজুড়েই ধারাবাহিক বোলিং করেন আর্শদিপ। ভারতের আট ম্যাচের সাতটিতেই উইকেট নেন ২৫ বছর বয়সী পেসার। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে উইকেটশূন্য না থাকলে ফারুকির রেকর্ড ভেঙে দিতে পারতেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪ ওভারে মাত্র ৯ রানে ৪ উইকেট আর্শদিপের সেরা। ফাইনালে ১৯তম ওভারে মাত্র ৪ রান দিয়ে দলের জয়ে বড় অবদান রাখার আগে এইডেন মার্করাম ও ডি ককের উইকেটও নেন তিনি। ডি কককে ফিরিয়েই ফারুকির উইকেট সংখ্যা স্পর্শ করেন তরুণ বাঁহাতি পেসার।
তার বোলিং গড় ১২.৬৪, ওভারপ্রতি খরচ করেছেন ৭.১৬ রান।
জাসপ্রিত বুমরাহ - ৮ ইনিংসে ১৫ উইকেট
ইনিংসের শুরুতে হোক বা শেষে, পুরো টুর্নামেন্টে যখনই আক্রমণে ডাক পড়েছে, দু হাত উজাড় করে দিয়েছেন জাসপ্রিত বুমরাহ। ফাইনালের শেষ দিকের দুই ওভারে মাত্র ৬ রান দেওয়া ছাড়াও ম্যাচে ২টি উইকেটসহ ৮ ম্যাচে তার শিকার ১৫ উইকেট।
গ্রুপ পর্বে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ছাড়া বাকি সাত ম্যাচেই উইকেট পান বুমরাহ। পাওয়ার প্লের শুরুতে আটকে রাখার পর শেষ দিকেও আঁটসাঁট বোলিংয়ের অনন্য নজির এবার দেখান ৩০ বছর বয়সী পেসার।
এবারের আসরে প্রতিটি উইকেটের জন্য তার খরচ মাত্র ৮.২৬ রান। এক বিশ্বকাপে অন্তত ১০ উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে সেরা গড় এটি। ২৯.৪ ওভার বোলিং করে ওভারপ্রতি তিনি দেন স্রেফ ৪.১৭ রান। বিশ্বকাপের এক আসরে অন্তত ২০ ওভার করা বোলারদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলিংয়ের কীর্তি।
ফাইনালসহ আসরজুড়ে নজরকাড়া বোলিংয়ে টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারও জেতেন বুমরাহ।
আনরিক নরকিয়া - ৯ ইনিংসে ১৫ উইকেট
আইপিএলে বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার পর বিশ্বকাপে পুরোপুরি ভিন্ন রূপ দেখা যায় আনরিক নরকিয়ার। মিতব্যয়ী বোলিংয়ে নিয়মিতই প্রতিপক্ষের কঠিন পরীক্ষা নেন দক্ষিণ আফ্রিকার গতিতারকা।
সব মিলিয়ে ওভারপ্রতি মাত্র ৫.৭৪ রান খরচ করে ৯ ম্যাচে ১৫ উইকেট নেন নরকিয়া। এই যাত্রায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টানা ১৬ ম্যাচে উইকেট নেওয়ার রেকর্ডও গড়েন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে উইকেটশূন্য থাকায় সমাপ্তি ঘটে এই ধারার।
রাশিদ খান ও রিশাদ হোসেন- ১৪ উইকেট
আফগানিস্তানের স্বপ্নযাত্রায় সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন রাশিদ খান। ওভারপ্রতি মাত্র ৬.১৭ রান খরচ করে ৮ ম্যাচে তিনি নেন ১৪ উইকেট। নিউ জিল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪টি করে উইকেট নেন তারকা লেগ স্পিনার।
এছাড়া ৭ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে রাশিদের ঠিক নিচে রিশাদ হোসেন। প্রথমবার টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড গড়েন তরুণ লেগ স্পিনার।
ব্যাটিংয়ে সেরা গুরবাজ
রহমানউল্লাহ গুরবাজ - ৮ ইনিংসে ২৮১ রান
আগে ব্যাটিংয়ের রাজা, পরে ব্যাটিংয়ে প্রজা; এভাবেই সাজানো যায় গুরবাজের এবারের বিশ্বকাপ। আফগানিস্তানের আগে ব্যাট করা পাঁচ ম্যাচের চারটিতে চল্লিশ ছোঁয়া ইনিংস খেলেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান।
উগান্ডার বিপক্ষে ৭৬ রান করে যাত্রা শুরুর পর নিউ জিল্যান্ড ম্যাচে তিনি খেলেন ৮০ রানের ইনিংস। পরে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসে ৬০ রান। সেমি-ফাইনালে ওঠার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪৩ রান করেন গুরবাজ।
রোহিত শার্মা - ৮ ইনিংসে ২৫৭ রান
নিজের শেষ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার সুযোগ ছিল রোহিতের। ফাইনালে ৩৪ রান করলে তিনি টপকে যেতেন গুরবাজকে। কিন্তু ৯ রানেই থেমে যাওয়ায় দুই নম্বরে থেকে আসর শেষ করতে হয় ভারত অধিনায়ককে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৪১ বলে ৯২ রানসহ তিনটি পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস খেলেন রোহিত। সবমিলিয়ে ১৫৬.৭০ স্ট্রাইক রেটে তিনি করেন ২৫৭ রান।
ট্রাভিস হেড - ৭ ইনিংসে ২৫৫ রান
আইপিএলের দুর্দান্ত ছন্দ বিশ্বকাপেও টেনে আনেন ট্রাভিস হেড। ৭ ম্যাচে ১৫৮.৩৮ স্ট্রাইক রেটে তিনি করেন ২৫৫ রান। সুপার এইটে টিকে থাকার লড়াইয়ে ভারতের বিপক্ষে হেড খেলেন ৪৩ বলে ৭৬ রানের ইনিংস। তবু জিততে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। রান বাড়ানোর সুযোগ পাননি হেড। এই পারফরম্যান্সে অবশ্য আইসিসি টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে উঠে এসেছেন তিনি।
কুইন্টন ডি কক - ৯ ইনিংসে ২৪৩ রান
ফাইনালে একপ্রান্ত আগলে রেখে ৩৯ রানের ইনিংস খেলেন ডি কক। গুরবাজকে টপকে যাওয়ার সুযোগ ছিল তার সামনেও। শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ৭৮ রান করতে পারলে শীর্ষে উঠে যেতেন ডি কক।
বিশ্বকাপে তার শুরুটা প্রত্যাশামাফিক ছিল না। গ্রুপ পর্বের চার ম্যাচে করেন মোটে ৪৮ রান। পরের পাঁচ ম্যাচে তার সংগ্রহ ১৯৫ রান। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৭৪ রান তার সেরা। পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ৬৫ রানের ইনিংস।
ইব্রাহিম জাদরান - ৮ ইনিংসে ২৩১ রান
গুরবাজের সঙ্গে আফগানিস্তানের ব্যাটিং সামলানোর দায়িত্ব বেশ ভালোভাবেই পালন করেন ইব্রাহিম জাদরান। বিশ্বকাপের প্রথম জুটি হিসেবে এক আসরে তারা দুজন গড়েন তিনটি শতরানের জুটি।
দলকে সেমি-ফাইনালে নেওয়ার পথে ৮ ইনিংসে দুই ফিফটিতে জাদরানের সংগ্রহ ২৩১ রান। উগান্ডার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে করা ৭০ রান তার সেরা। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার ব্যাট থেকে আসে ৫১ রান।
