‘প্রচণ্ড চাপে ছিলেন বুলবুল, বিশ্বকাপে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন ফারুক’
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য, এছাড়াও এই প্রতিবেদনে আছে লিটন, শান্ত, সালাউদ্দিন, তামিম ইকবালসহ বেশ কজনের অভিমত ও পর্যবেক্ষণ।
বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার ব্যাপারে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের পর প্রবল চাপে ছিলেন ওই সময়ের বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি তার পক্ষ থেকে। তবে সেই সময়ের বিসিবি সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদের মতামত চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে এই তথ্যগুলি জানান যুব ও ক্রীড়া সচিব মোঃ মাহবুব আলম।
তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় মঙ্গলবার। তদন্ত কমিটির মূল বক্তব্য ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একক সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) ড. এ. কে. এম ওলি উল্যার নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
তদন্তের কাজে ক্রিকেট আঙিনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা জনের সঙ্গে কথা বলেছে তদন্ত কমিটি। তাদের অভিমত উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের মতামতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি তুলে ধরা হলো নিম্নে।
মোঃ মাহবুব-উল-আলম
তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলমকে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ডাকার পর আসিফ নজরুল নিজেই তার সিদ্ধান্ত জানান। এর আগে ক্রীড়া সচিব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত, যেহেতু বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে সাবেক বিসিবি সভাপতি বুলবুল প্রবল চাপে ছিলেন, যেহেতু তিনি আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছিলেন না। বিসিবির সহ-সভাপতি ও সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মতামত দেন, বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও বাংলাদেশ সরকার কি আদৌ আনুষ্ঠানিকভাবে তা খতিয়ে দেখেছে? প্রশ্ন তোলেন মাহবুব। পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার কি বিসিবির মতামত নিয়েছে? উত্তরটি যে, ‘না’, সেটিও বলেছেন তিনি।
ক্রীড়া সচিব বলেন, আসিফ নজরুলের একাই সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিসিবির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, ওই সময়ের ভারত বিরোধী মনোভাবের স্রোতে ভেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা।
ক্রীড়া সচিবের মতে, এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি ছিল না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডই সিদ্ধান্ত নিতে পারত। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঠিক প্রটোকল অনুসরণ করে।
মোহাম্মদ সালাউদ্দিন
বিসিবির হাই পারফরম্যান্স কোচ ও ওই সময়ে জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ বলেন, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ না করতে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষনিকভাবে মেনে নেয় বিসিবি। তার মতে, ওই সময়ের সরকার আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল যে, ভারতে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ।
ঢাকার একটি হোটেলে আসিফ নজরুলের সংবাদ সম্মেলনের কথা উল্লেখ করে সালাউদ্দিন বলেন, ওই আয়োজন ছিল স্রেফ ‘আই ওয়াশ।’ ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এবং সংবাদ সম্মেলনের আগেই সরকারের উচ্চ পদস্থরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। ক্রিকেটারা বিশ্বকাপ খেলতে প্রবলভাবেই আগ্রহী ছিলেন, তবে ক্রিকেটার বা কোচিং স্টাফ ও কোনো কর্মকর্তারই মতামত নেওয়া হয়নি বলে জানান অভিজ্ঞ এই কোচ।
নাজমুল হোসেন শান্ত
বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক শান্ত তদন্ত কমিটিকে বলেন, ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে খেলতে খুবই আগ্রহী ছিল, যেহেতু তাদের প্রস্তুতি খুব ভালো ছিল এবং মানসিকভাবে দল খুব ভালো অবস্থায় ছিল। কিন্তু তাদের প্রস্তুতি ও স্বপ্ন ভেস্তে যায় যখন ক্রীড়া উপদেষ্টা জানান যে, নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে না।
শান্ত সরাসরিই বলেন, বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একাই নিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন এবং ক্রিকেট বোর্ডও সেটির সঙ্গে একমত হয়েছে।
লিটন কুমার দাস
বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তুষ্টির ব্যাপারটি সেই সময় কয়েকটি সংবাদ সম্মেলনে লিটনের কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল। সরাসরি বলতে না পারলেও তার কথায় ছিল আভাস। তদন্ত কমিটির কাছেও তা তুলে ধরেন এই ব্যাটসম্যান, বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল যার।
তদন্ত কমিটিকে লিটন বলেন, সরকারের পূর্ব পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল একপাক্ষিক এবং দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ক্রিকেটাররা ছিলেন স্রেফ দর্শক।
তামিম ইকবাল খান
বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে টানাপোড়েনের সময় তামিম ইকবাল বিভিন্ন মাধ্যমে একাধিকবার বলেছিলেন, বিসিবির উচিত ছিল আরও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কূটনৈতিক পথে এগোনো। তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি ‘সাহসী বক্তব্য’ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।
তামিমের মতে, ক্রীড়া উপদেষ্টার মূল মনোযোগ ছিল ক্রিকেটের বদলে দেশের ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা। ‘ফুটবলের তুলনায় ক্রিকেট কিছুই না’, আসিফ নজরুলের এমন বক্তব্যের জের ধরেই তামিম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল ‘অ্যান্টি ক্রিকেট’ এবং ‘অ্যান্টি ভারত’ মানসিকতার, যেটি বড় ভূমিকা রেখেছে বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার পেছনে।
ক্রীড়া উপদেষ্টার এমন একপাক্ষিক অহংবাদী সিদ্ধান্ত, যেটিতে সায় দিয়েছেন ওই সময়ের বিসিবি সভাপতি, ওই সিদ্ধান্তে দেশের মানুষের, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এবং আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন তামিম।
খেলাধুলায় রাজনীতি যে বড় ভূমিকা রাখে, সেটি তুলে ধরেছেন তামিম। এখানে বিসিবির ক্রিকেট কূটনীতির ব্যর্থতার ব্যাপারটি উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, আইসিসির ভোটে বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তানের ভোটই পেয়েছি, বাকি ১৪টি ভোট ছিল বিপক্ষে। পাকিস্তান শুরুতে বাংলাদেশের পক্ষে থাকার কথা বললেও পরে যে ঠিকই বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছে এবং ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার আভাস দিলেও শেষ পর্যন্ত সেটিও খেলেছে, তা মনে করিয়ে দেন বিসিবির বর্তমান প্রধান।
বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা ক্রীড়া উপদেষ্টা করেছিলেন, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তামিম বলেন, একটি সরকারের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এসব আচরণ। দেশের সাবেক এই অধিনায়কের মতে, নিরাপত্তার ব্যাপারটি ছিল স্রেফ অজুহাত, বরং ক্রীড়া উপদেষ্টার ‘ইগো’ পূরণের জন্যই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল। অন্য দেশের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে বাংলাদেশের মানুষের ও ক্রিকেটারদের স্বপ্ন ধ্বংস হওয়া উচিত নয় বলে অভিমত দেন তিনি।
সৈয়দ আশরাফুল হক
বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজনীয় ছিল না। ক্রিকেটারদের সবসময় ভিন্ন মাত্রার নিরাপত্তা দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে খেলতে যেতে পারত। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের মতে, নিরাপত্তার কোনো ব্যাঘ্যাত ঘটত না এবং দুই দেশের সরকার মিলে ব্যাপারটি দেখতে পারত। মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া ছিল একটি ঘরোয়া ক্রিকেটের ইস্যু এবং বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসরের সঙ্গে এটিকে জড়ানো উচিত হয়নি।
নিজাম উদ্দিন চৌধুরি
বাংলাদেশ দলের সঙ্গে ক্রীড়া উপদেষ্টার বৈঠকের সময় উপস্থিত ছিলেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি। নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে খেলতে না যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের অবস্থানের ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। প্রধান নির্বাহী জানান, সেই সভায় অধিনায়ক লিটন কুমার দাস জানান, তার দল বিশ্বকাপে খেলতে যেতে প্রস্তুত। তবে তিনি এটাও বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও তারা মানতে বাধ্য।
নাজমূল আবেদীন
ওই সময়ের বোর্ড পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন তদন্ত কমিটির কাছে বলেন, ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তবে সরকার যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, ক্রিকেট বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। তিনি বলেন, নিরাপত্তাই ছিল মূল ইস্যু এবং সরকার চায়নি ঝুঁকি নিতে।
এছাড়াও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে তদন্ত কমিটি সাক্ষাৎকার নেয় বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজোয়ান উজ জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের। তাদের কথাতেই কম-বেশি একইরকম ব্যাপারগুলি উঠে আসে, যেখানে মূল বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ আরও কৌশলগত পথ বেছে নিতে পারত এবং বিশ্বকাপে না যাওয়া উচিত হয়নি।
