গেইলের ৩৩৩ ও রাসেলের ভুলে যাওয়া এক টেস্টের গল্প
সাদা বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ক্রিকেটারদের একজন রাসেল লাল বলে ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন স্রেফ একটি।
কদিন পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে যাচ্ছেন আন্দ্রে রাসেল। সাদা বলে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোয় সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নামগুলোর একটি। তবে টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে তার অল্প পরিচিতির কথা খুব কম লোকই মনে রাখবে।
দেড় দশক আগে যখন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়, রাসেল ছিলেন একজন নবীন পেস বোলিং অলরাউন্ডার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় ১৯ বছর বয়সে, ২০০৭-০৮ মৌসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচের প্রতিযোগিতা ক্যারিব বিয়ার সিরিজে। অভিষেকে জ্যামাইকার হয়ে নতুন বলে বোলিং করার পাশাপাশি তিনি ব্যাটিং করেন ৯ নম্বরে। টেস্ট অভিষেকেও পালন করেন একই ভূমিকা।
রাসেলের টেস্ট অভিষেকের আগের বছর চুক্তি নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের। তখন মূল দলের ক্রিকেটাররা তাই বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে খেলেননি। অনেকটা নতুন চেহারার দল নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ হারে ক্যারিবিয়ানরা। সেটা ভিন্ন আরেক গল্প।
টেস্ট অভিষেকের কয়েক মাস আগে ২০১০ সালের জুনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের হয়ে ভারত ‘এ’ দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকার করেন রাসেল। পাঁচ উইকেট পান দলটির বিপক্ষে পরের ম্যাচেও। এর আগে একই বছরের এপ্রিলে সফরকারী আয়ারল্যান্ড দলের বিপক্ষে তিন দিনের ম্যাচে জ্যামাইকার হয়ে ৬ নম্বরে নেমে ১০ ছক্কা ও ৭ চারে ৬৫ বলে অপরাজিত ১০৮ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি।
একটি নকআউট লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে ৬ উইকেট নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর, ওই বছরের নভেম্বরে নতুন অধিনায়ক ড্যারেন স্যামির নেতৃত্বে রাসেলের টেস্ট অভিষেক হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। গলে সেই ম্যাচে ৩৩৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে সবাইকে আড়াল করে দেন নেতৃত্ব হারানো ক্রিস গেইল। এর আগের মাসেই তাকে সরিয়ে অধিনায়ক করা হয়েছিল স্যামিকে।
টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়েন গেইল। তার আগে এই স্বাদ পান স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, ব্রায়ান লারা ও ভিরেন্দার শেবাগ। ৪৩৭ বলে ৩৪ চার ও ৯ ছক্কায় গড়া ছিল গেইলের ইনিংসটি। এর আগে ২০০৫ সালে অ্যান্টিগায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩১৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।
অভিষেকে ৯ নম্বরে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন রাসেল, গেইলের দুর্দান্ত ইনিংসে ততক্ষণে দলের স্কোর সাড়ে পাঁচশ ছাড়িয়ে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত ৬ উইকেট শিকার করেন রহস্য স্পিনার আজান্তা মেন্ডিস। তার শেষ শিকার ছিলেন রাসেল, গুগলিতে বোল্ড হন তিনি, ৯ বলে করেন ২ রান।
বোলিংয়ে শুরুটা ভালো করেন রাসেল। কিমার রোচের সঙ্গে নতুন বল হাতে নেন তিনি। ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় বলেই তিনি উইকেটের স্বাদ পান তিলাকারাত্নে দিলশানকে ফিরিয়ে। মিড-অনে ক্যাচ দেন শ্রীলঙ্কান ওপেনার। সেটিই হয়ে আছে রাসেলের একমাত্র টেস্ট উইকেট।
প্রথম ইনিংসে মোট ১৫ ওভার বোলিং করে ৭৩ রান দিয়ে পেয়েছিলেন উইকেটটি। ফলো-অনে পড়া শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ ওভারে ৩১ রান দিয়ে কোনো উইকেটের দেখা পাননি রাসেল। তিন নম্বরে নামা কুমার সাঙ্গাকারা প্রথম বলে ক্যাচ তুলে দিলে সেটি ফেলে দেন তিনি। রোচ যদিও সাঙ্গাকারাকে বেশিক্ষণ টিকতে দেননি। শেষ পর্যন্ত ড্র হয় ম্যাচ।
ওই টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অফ স্পিনার শেন শিলিংফোর্ডের বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, কলম্বোয় দ্বিতীয় টেস্টে একাদশে জায়গা ধরে রাখেন তিনি। গলে মেন্ডিসের সাফল্য দেখে স্পিনে শক্তি বাড়াতে বাঁহাতি স্পিনার সুলেমান বেনকেও একাদশে ফেরায় সফরকারীরা।
প্রথম টেস্টের একাদশ থেকে বাদ পড়েন শুধু রাসেল। নতুন বলে রোচের সঙ্গে জুটি বাঁধেন অধিনায়ক স্যামি।
এরপর আর কখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে খেলার সুযোগ পাননি রাসেল। সেখান থেকে সাদা বলের খেলোয়াড় হিসেবে উত্থান হয় তার।
রাসেলের ওয়ানডে অভিষেক হয় সরাসরি ২০১১ বিশ্বকাপে। অভিষেকে ব্যাটিং কিংবা বোলিংয়ে তেমন ভালো করতে পারেননি। তবে নিজের ষষ্ঠ ওয়ানডেতে ভারতের বিপক্ষে ৯ নম্বরে নেমে ৬৪ বলে অপরাজিত ৯২ রানের ইনিংস খেলেন তিনি, যা এখনও এই পজিশনে বিশ্ব রেকর্ড।
ওই ইনিংস পরের বছর তার প্রথম আইপিএল চুক্তি পেতে হয়তো ভূমিকা রেখেছিল। ২ কোটি ২৬ লাখ রুপিতে তাকে দলে নেয় তখনকার দিল্লি ডেয়ারডেভিলস। দলটির হয়ে দুই আসরে খেলার পর তিনি যোগ দেন কলকাতা নাইট রাইডার্সে। পরে হয়ে ওঠেন কলকাতার কিংবদন্তি, আইপিএলের সুপারস্টার। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও তার প্রভাব প্রবল।
দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী রাসেল টেস্ট ক্যারিয়ার নিয়ে সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমাকে মূলত টেস্ট দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা আমাকে সাদা বলের খেলোয়াড় হিসেবেই দেখত, এটাই।”
আরও বেশি টেস্ট খেলার জন্য টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারকে বদলে ফেলতেন কি-না, এমন প্রশ্নে রাসেলের স্পষ্ট উত্তর, “সত্যি বলতে? না। আমি টেস্ট ক্রিকেট পছন্দ করি, কিন্তু দিন শেষে আমি একজন পেশাদার। এটা (টেস্ট) আমার যাত্রার অংশ ছিল না। আমার কোনো আফসোস নেই।”
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে রাসেলের অবসর নিতে যাওয়ার ঘোষণা আসে গত বুধবার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য দল ঘোষণার কিছুক্ষণ পর ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দেয়, ঘরের মাঠ জ্যামাইকার স্যাবাইনা পার্কে প্রথম দুই ম্যাচই ৩৭ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডারের শেষ। বাংলাদেশ সময় আগামী সোম ও বুধবার সকালে হবে ম্যাচ দুটি।
রাসেলের বিদায়ের ঘোষণা আসার একদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্টে ২৭ রানে গুটিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, প্রায় দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে যা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর।
তার একমাত্র টেস্টের অধিনায়ক ও বর্তমানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ স্যামির প্রত্যাশা, ‘আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবেন’ রাসেল।
