টেইলরের অবাক প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে নেই ল্যাথাম
ড্রাগ ও অ্যালকোহলের আসক্তি কাটিয়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়ে প্রায় চার বছর পর বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরছেন জিম্বাবুয়ের ব্রেন্ডন টেইলর, সেই ম্যাচে নিউ জিল্যান্ড পাচ্ছে না অধিনায়ক টম ল্যাথামকে।
বয়স ৩৯ পেরিয়ে গেছে বেশ আগেই। সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলার পর চার বছর হতে চলেছে। এই অধ্যায় শেষ বলেই ধরে নিয়েছিলেন ব্রেন্ডন টেইলর। শুধু ক্রিকেট কেন, জীবনটাই তার কাছে একসময় হয়ে উঠেছিল দুঃস্বপ্নের প্রতিশব্দ। সেই টেইলর আবার বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পেয়ে ক্রিকেটের মূল স্রোতে ফিরে বিস্ময়করভাবে ফিরছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে!
সব ঠিকঠাক থাকলে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরছেন জিম্বাবুয়ের টেইলর। বুলাওয়ায়োতে ম্যাচটি শুরু বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায়।
টেইলরের ফেরার ম্যাচের আগে একটি ধাক্কা খেয়েছে নিউ জিল্যান্ড। কাঁধের চোটের কারণে আগের টেস্টের মতো এই ম্যাচেও খেলতে পারবেন না টম ল্যাথাম। নিয়মিত অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন আবারও মিচেল স্যান্টনার।
টেইলরের ফেরাটাই অবশ্য এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বেলফাস্টে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে অনেকটা আচমকাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। তার অবসরকে ঘিরে নানা রহস্য ছড়িয়েছিল তখনই।
চার মাস পর টেইলর জানান, আইসিসি দুর্নীতি দমন আইনের বেশ কয়েকটি ধারা ভাঙায় বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি তিনি। পাশাপাশি ড্রাগ পরীক্ষায় উতরাতে না পারার খবরও দেন তিনি। এর তিন দিন পরই তার নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। সাড়ে তিন বছরের জন্য তাকে নিষিদ্ধ করে আইসিসি।
নেশার লোভে পরে কীভাবে জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন, সেই গল্পও শোনান তিনি। যদিও সেখানে প্রশ্নের অবকাশ ছিল অনেক। এরপর বলতে গেলে অনেকটা হারিয়েই যান জিম্বাবুয়ের ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন।
দীর্ঘদিন পর গত মার্চে হুট করে জানা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নিজেই জানান, দেশের মাঠে ২০২৭ বিশ্বকাপে তাকিয়ে তিনি ফিরতে চান মাঠে। এর মাস দুয়েক পর ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশদভাবে শোনান তার জীবনের দুঃসহ অধ্যায়ের গল্প, যেখানে ড্রাগ আর অ্যালকোহলে আসক্তিতে ডুবে ছিলেন তিনি।
স্ত্রী কেলি ও পরিবারের কাছে সবকিছু খুলে বলেন টেইলর। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই একটি পুনবার্সন কেন্দ্রে ভর্তি হন তিনি আসক্তি থেকে মুক্তির আশায়। হারারে থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বে জিম্বাবুয়ের ইস্টার্ন হাইল্যান্ডে সেই সেন্টার। কোকেন ও অ্যালকোহলের নেশা থেকে মুক্তি পেতে তার ১২ ধাপের পুনবার্সন প্রক্রিয়া শুরু হয় সেখানে।
২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে ইংল্যান্ডে খেলার সময় তার আসক্তি বাড়ে আরও। সেখানে দুই দফায় ড্রাগ পরীক্ষায় ব্যর্থ হন তিনি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারতে তিনি জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দেন। তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ফিক্সিং করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে আইসিসিকে যতটা দ্রুত সম্ভব জানানোর নিয়ম থাকলেও তিনি জানাননি। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সফরে যখন তাকে ফিক্সিংয়ের জন্য প্রবলভাবে চেপে ধরা হয়, তখন তিনি আইসিসির কাছে জানান। শুরু হয় তদন্ত। একসময় আসে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা। টেইলর অবশ্য বরাবরই দাবি করেছেন, ফাঁদে ফেলা হলেও কোনো ধরনের ফিক্সিংয়ে তিনি জড়াননি।
আসক্তি থেকে মুক্তি পেয়ে পরিবারের সঙ্গে একান্তে সময় কাটান কিছুদিন। পরে ক্রিকেটের পথে ফেরার পথ খুঁজতে থাকেন। তার ভাবনায় ছিল মূলত কোচ হিসেবে ফেরা। কিছু কোর্স করে সেই চেষ্টাতেই তিনি ছিলেন। কিন্তু জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ফিরে পেতে চাইছিল সেই ক্রিকেটার টেইলরকে। তিনিও উজ্জীবিত হয়ে শুরু করেন ফেরার অভিযান।
ফিটনেস নিয়ে কাজ করে ওজন কমিয়ে ফেলেন ২০ কেজি। কিছুদিন আগে তিনি জানান, ক্যারিয়ারের এতটা ফিট আগে কখনও ছিলেন না। ব্যাটিং-কিপিং স্কিলের ঝালাই করাও চলতে থাকে। গত দেড় বছর ধরে নিজেকে আবার শাণিত করার কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নিষেধাজ্ঞার শর্ত অনুযায়ী, জাতীয় দল বা ঘরোয়া কোনো দলের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ তার ছিল না। হারারেতে একটি স্কুলে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন তিনি।
তার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয় গত ২৫ জুলাই। এরপরই নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের দলে রাখা হয় তাকে। অনেক পথ পেরিয়ে তার ফেরার দিনটি অবশেষে চলেই এলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের তৃতীয় সফলতম ব্যাটসম্যান শুরু করতে যাচ্ছেন নতুন অধ্যায়, সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
