২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

জাতীয় দলের ডাক এলে ‘প্রস্তুত’ রিপন

রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে ইয়র্কার-মেশিন হিসেবে নজর কাড়া এই পেসার এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জের জন্যও নিজেকে তৈরি মনে করছেন।

জাতীয় দলের ডাক এলে ‘প্রস্তুত’ রিপন
রিপন মন্ডল নজর কেড়েছেন রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্টে। ছবি: এসিসি।

বিডিনিউজ২৪

আহমেদ রিয়াদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Nov 2025, 11:44 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:12 PM

সম্প্রতি কাতারে রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপ ফাইনালে সুপার ওভারে শিরোপা হাতছাড়া হলেও ১১ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী হয়েছিলেন রিপন মণ্ডল। বিশেষ করে একের পর এক ইয়র্কার নিখুঁতভাবে করে তিনি নজর কেড়েছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের পর হাই পারফরম্যান্স স্কোয়াড, ইমার্জিং দল, ‘এ’ দল, নানা পর্যায়েই তাকে খেলানো হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া স্বাক্ষাতকারে ২২ বছর বয়সী পেসার বললেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জের জন্যও নিজেকে এখন তিনি তৈরি মনে করছেন। 

রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে 'এ' দলের এশিয়া কাপে দারুণ ফাইনাল খেললেন, সব মিলিয়ে কেমন লাগছে?

রিপন মন্ডল: খুবই ভালো লাগছে। টুর্নামেন্টের শুরুটা যেমন চেয়েছিলাম, সেভাবেই এগোতে পেরেছি। শেষটা আরেকটু ভালো হলে ভালো লাগতো। তবে দল হিসাবে আমরা অনেক ভালো করেছি, সবাই নিজের সেরাটা দিয়েছে। শুধু ট্রফি জয়ের আক্ষেপটা আমাদের রয়ে গেছে। 

সেমি-ফাইনালে রোমাঞ্চকর সুপার ওভারে জিতলেও ফাইনালে সুপার ওভারে জেতা হলো না… 

রিপন: আক্ষেপ আছে। ফাইনালে স্রেফ একটা ছোট পার্টনারশিপ করতে পারলে হয়তো ম্যাচটা জিততে পারতাম। হয়তো ফাইনালের দিনটা আমাদের ছিল না, কিন্তু বোলিং বিভাগ বলুন, ব্যাটিং বিভাগ বলুন, আমরা ভালোই করেছি। ভালো না খেললে ফাইনালে হয়তো যেতাম না। আমরা ভালো খেলেছি বলেই ফাইনাল খেলেছি।

গত বছর অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন। এবার রাইজিং স্টার্সেও আপনি শীর্ষে। দেশের বাইরের আসরে ভালো করা কি বাড়তি তৃপ্তি দেয়?

রিপন: একটা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হতে পারা সবার জন্যই ভালো লাগার বিষয়। অবশ্যই দারুণ লাগছে। বিদেশের মাটিতে যে কোনো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় থাকা আলাদা এক তৃপ্তি দেয়। অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড সিরিজের পর আবারও এমন অর্জন আসায় আত্মবিশ্বাসটা আরও বেড়েছে। নিজের প্রস্তুতি, ভরসা আর পরিশ্রমের ফলটাই পেয়েছি। আল্লাহর রহমত ছিল বলেই সম্ভব হয়েছে। তাই অনুভূতিটা সত্যিই বিশেষ।

এই টুর্নামেন্টে আপনাকে নতুন বলে, ইনিংসের মাঝামাঝি ও শেষে, সব জায়গায় ভালো করতে দেখা গেছে। কাজটা কঠিন। কিভাবে সেটা সম্ভব করলেন? 

রিপন: ম্যানেজমেন্ট, কোচ আর অধিনায়ক শুরু থেকেই খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোন ধাপে আমাকে বল করতে হবে। তাই মাঠে গিয়ে কোনো অস্থিরতা বা দ্বিধা ছিল না। মানসিকভাবে ঠিক সেই পরিস্থিতিগুলোর জন্য প্রস্তুত হয়েছি—নতুন বলে আক্রমণ করতে হবে, মাঝে রানের প্রবাহ থামাতে হবে, ডেথে এসে পরিকল্পনা ধরে রাখতে হবে। নিজের দায়িত্বটা মাথায় রেখে, ঠিক কোন বলটা কখন করতে হবে সেই ভাবনাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রস্তুতির কারণেই কাজটা সহজ হয়েছে।

এই টুর্নামেন্টে আপনাকে দেখা গেছে ইয়র্কার-মেশিন হিসেবে। টানা ভালো ইয়র্কার দিয়ে গেছেন, বাংলাদেশে যা বিরল। কিভাবে রপ্ত করলেন? 

রিপন: অনূর্ধ্ব-১৯ থেকেই ইয়র্কার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। পরে হাই পারফরম্যান্স ইউনিটে আসার পর তারেক আজিজ ভাই, ডলার মাহমুদ ভাই আর বোলিং কোচ কোরি কলিমোরের সঙ্গে বেশি কাজ করেছি গত এক বছর। তারা সবসময় ইতিবাচক কথা বলেন। পরিস্কার ধারনা দেন, কীভাবে কি করতে হবে, কোথায় উন্নতি দরকার।

ড্রিলগুলোতেও বেশি জোর দেওয়ার তাগিদ থাকত, প্রতিদিন নেটে মূল অনুশীলন শেষ করে বাড়তি ২–৩ ওভার শুধু ইয়র্কারের জন্য বোলিং করেছি। ডেথ ওভার মাথায় রেখে বল করেছি। যাতে ইয়র্কার দেওয়ার ক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়।

ভারতীয় দলে বেশ আগ্রাসী কয়েকজন ব্যাটসম্যান ছিলেন। বৈভাব সুরিয়াভানশি তো তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন। প্রিয়ানশ আরিয়া ও অনেকেই ছিলেন। তাদের সামনে বোলিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন হলো?

রিপন: পরিকল্পনা খুব পরিষ্কার ছিল। ভারতীয় ব্যাটাররা, বিশেষ করে যারা আইপিএল খেলে, ওরা আক্রমণাত্মক থাকবে, এটা জানতাম। তাই প্রথম ওভারটা ভালো না গেলেও সেটা মাথায় রাখিনি। টি-টোয়েন্টিতে একটা খারাপ ওভার কিছুই নির্ধারণ করে না। আমি শুধু ভেবেছি পরের বলটা কেমন হতে যাচ্ছে, কীভাবে ম্যাচে ফিরতে পারি। নিজের সেরা ডেলিভারি দিতে পারলে ওদের সামলানো কঠিন নয়, এই আত্মবিশ্বাসটাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

বড় টুর্নামেন্ট গুলোতে বাংলাদেশ প্রায়ই শেষে এসে খেই হারায়। এবারও সেটিরই পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?

রিপন: আক্ষেপ তো থাকবেই। চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরতে পারলে অন্যরকম অনুভূতি হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো বড় টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত যেতে হলে সঠিক সময়ে মোমেন্টাম ধরতে হয়। আমরা জায়গায় জায়গায় ম্যাচটা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলাম, আবার কিছু মুহূর্তে সেটা হাতছাড়া হয়েছে। ক্রিকেটে কখনও এক বল, কখনও একটি সিদ্ধান্ত, কখনও একটা ওভার ম্যাচকে পুরো বদলে দেয়। ওরা সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কাজে লাগাতে পেরেছে, আমরা পারিনি।

এটা শুধু ভাগ্য বা নিয়তির ব্যাপার নয়। সময়, অভিজ্ঞতা আর ধারাবাহিকতা লাগবে। আমরা যত বেশি বড় ম্যাচ খেলব, চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। আমি বিশ্বাস করি, এই ব্যবধানটা খুব বেশি দিন থাকবে না। ঠিক জায়গায় কাজ করলে, ভুলগুলো শোধরালে, ট্রফি হয়তো আমরা দ্রুতই জিততে পারব। 

দেশে যখন ফিরলেন, ভোর রাতেও আপনাকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন বন্ধুরা। তাদের সারপ্রাইজ দেখে কেমন লেগেছে?

রিপন: এটা সত্যিই একটা চমক ছিল। তারা সবসময় পাশে থাকে, সাহায্য করে, ইতিবাচক কথা বলে। এর আগেও বহুবার এসেছে, ওদের প্রতি আমার অনেক কৃতজ্ঞতা। গাড়ি নিয়ে ওদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেছে।

সামনে আপনার পরিকল্পনা বা ব্যস্ততা কী নিয়ে?

রিপন: এখন পুরো মনোযোগ এনসিএল। একটা ম্যাচ খেলব। আপাতত এটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। এরপর যদি বিপিএলে সুযোগ আসে, তখন সেটার জন্য প্রস্তুতি নেব।

রাইজিং স্টার্সে আব্দুল গাফফার সাকলাইনের পারফরম্যান্স অনেককেই চমকে দিয়েছে। এসএম মেহেরবও ভালো করেছে। পাশ থেকে কেমন দেখলেন তাদের পারফরম্যান্স?

রিপন: সাকলাইন দারুণ বল করেছে। টুর্নামেন্টজুড়ে ওর বোলিং দেখে মনে হয়নি, ও প্রথমবার এই পর্যায়ে খেলছে। মেহরবও অনেক পরিশ্রমী, ওর মধ্যে ভালো সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে যেভাবে ব্যাট করেছে, সেটা আমার খুবই ভালো লেগেছে।

দেশের হয়ে ভালো খেলায় বাবা–মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন?

রিপন: সন্তান দেশের হয়ে ভালো খেললে যে কোনো বাবা-মায়ের জন্য তা গর্বের। আমি ভালো করেছি বলেই তারা দারুণ খুশি। তাদের খুশিই আমার খুশি। 

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি আপনি তিনটি খেলেছেন বটে, তবে সেটি ছিল এশিয়ান গেমসে। জাতীয় দলে অভিষেক হয়নি এখনও। কি মনে হয়, সময়টা কাছাকাছি? 

রিপন: আমি নিজের দিক থেকে পুরোপুরি প্রস্তুত। বিসিবি আমাকে একটা সিস্টেমের মধ্যে রেখেছে, যাতে প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানো যায়। যখন ডাক আসবে, তৈরি থাকা আমার দায়িত্ব। সুযোগ যেকোনো মুহূর্তে আসুক, আমি সেটাকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত।