আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ, তদন্ত প্রতিবেদনের ফল
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে, সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার একক সিদ্ধান্তেই গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ।
সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপ না খেলার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তথা আসিফ নজরুলের সেই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছে বিসিবি।
গত মার্চে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত এই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় মঙ্গলবার। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) ড. এ. কে. এম ওলি উল্যার নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্যরা সরাসরি কারও নাম মুখে আনতে চাইছিলেন না। সংবাদমাধ্যমের বারংবার সরাসরি প্রশ্নে তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল এক পর্যায়ে বলেন, "তদন্তে যা উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সবকিছু মিলিয়ে যা বলা যায়, যে মানুষটি দায়ী (বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য), তিনি হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপেদষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সময়ের সরকার ও তিনি দায়ী।"
ফয়সাল জানান, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিতে চিঠি পাঠিয়ে জানানো হয় তাদের সিদ্ধান্ত। বিসিবি সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করেননি। তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল।"
২২ পৃষ্ঠার যে তদন্ত প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হয়, সেখানে ১২ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি এবং তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। সেখানে ক্রিকেটারদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ক্রিকেট আঙিনা থেকে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি, বিসিবির কোচ ও ওই সময়ে জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং ওই সময়ের বিসিবির পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীনের।
যুব ও ক্রীড়া সচিব মোঃ মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গেও কথা বলে কমিটি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে এই কমিটি সাক্ষাৎকার নেয় বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজোয়ান উজ জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রে যে দুজন, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও সেই সময়ের বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল, তাদের সঙ্গে বারবার নানা মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি বলে জানায় তদন্ত কমিটি।
যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্য এই তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, "যুব ও ক্রীড়া সচিবকে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ডাকার পর আসিফ নজরুল নিজেই তার সিদ্ধান্ত জানান। এর আগে ক্রীড়া সচিব পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত, যেহেতু বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে সাবেক বিসিবি সভাপতি বুলবুল প্রবল চাপে ছিলেন, যেহেতু তিনি আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছিলেন না। বিসিবির সহ-সভাপতি ও সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মতামত দেন, বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত।"
ওই সময়ের বোর্ড পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন তদন্ত কমিটির কাছে বলেন, "ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তবে সরকার যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, ক্রিকেট বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য।"
আসিফ নজরুলের সাড়া না পেয়ে ওই সময়টায় সংবাদমাধ্যমে তার বিভিন্ন বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমের লেখা, এসবকে তদন্তের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয় তদন্ত কমিটি।
বিশেষজ্ঞদের বরাতে কিছু পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি, যেখানে আছে ক্রিকেটে রাজনীতির প্রবেশ, আইসিসি বনাম বিসিবির 'পাওয়ার ইমব্যালান্স' এবং বিসিবির অব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই সিদ্ধান্তের প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমস্যা ফুটে ওঠার কথাও বলা হয়।
চূড়ান্ত মূল্যায়নে বিশ্বকাপে না খেলার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, "রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ, আইসিসির গভর্ন্যান্স সংঘাত, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থ আলোচনা।
এই অধ্যায়েই 'সম্ভাব্য মূল কারণ' হিসেবে বিভিন্ন কারণগুলোর র্যাঙ্কিং করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ভেন্যু বদলে আইসিসির অপারগতা ও বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপ, এসবকে র্যাঙ্কিং করা হয়েছে 'অতি উচ্চ' হিসেবে। বিসিবির কূটনৈতিক দক্ষতার ব্যর্থতাকে বলা হয়েছে 'উচ্চ' কারণ আর যোগাযোগ ভেঙে পড়াকে বলা হয়েছে 'মাঝারি' কারণ।
পরিসমাপ্তিতে বলা হয়েছে, "সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, ক্রিকেটাররা এবং সমর্থকেরাই সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন।" তামিম ইকবালের বরাতে সেখানে উল্লেখ করা হয়, "সমাধান বের করার জায়গা ছিল।" ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনগনকে ভাবনায় রেখে এই ধরনের সিদ্ধান্ত কখনও একজন না নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত বলে সেখানে বলা হয়।
সবশেষে কিছু সুপারিশও করে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে আছে ক্রিকেটকে রাজনীতির বাইরে রাখা, বিসিবির স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করা, সংকটকালীন যোগাযোগের দক্ষতাকে উন্নত করা, ক্রিকেটারদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে সুরক্ষিত করা এবং বিসিবি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ক্রীড়া কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক গড়া।
এই বছরের শুরুর দিকে দেশের ক্রিকেট তথা গোটা দেশে তোলপাড় ছিল বিশ্বকাপে না খেলার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে। আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পরই আসিফ নজরুল ফেইসবুকে পোস্টে বলেন, বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দলের ভারতে যাওয়া তিনি নিরাপদ মনে করছেন না। বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন ওই পোস্টে। এরপর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আইপিএলের সকল খেলা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ রাখতে নির্দেশ আসে তথ্য মন্ত্রণালায়ের তরফ থেকে।
পরে নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ । আইসিসির কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিসিবি অনুরোধ জানায়, বাংলাদেশের ম্যাচগুলি যেন শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হয়। এরপর দফায় দফায় বৈঠক হয় দুই পক্ষের। কিন্তু টুর্নামেন্টের এত কাছে এসে ভেন্যু বদলানো সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয় আইসিসি। বাংলাদেশও নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
