২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

বাংলায় উচ্চশিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব চান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়কে মৌলিক ও উপযোগী গবেষণাসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের আরও কিছু চ্যালেঞ্জ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Oct 2022, 02:37 AM

Updated : 08 Oct 2022, 02:37 AM

উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

এ বিষয়কে তিনি শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘বড় ও বিশেষ’ রকমের চ্যালেঞ্জ বলে চিহ্নিত করেন।

তার মতে, বাংলা ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা দান রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নিশ্চয়ই; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেরও কর্তব্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব সচেতন করে তোলা এবং নিজের দিক থেকেও উদ্যোগী হয়ে দায়িত্বটি গ্রহণ করা।

শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ কবির স্মরণে প্রথম স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব কথা বলেন।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ: বিচারের দুই নিরিখে’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষাকে চেয়েছে তাই নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলাভাষা হবে উচ্চ আদালতের ভাষা এবং অবশ্যই সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম। এই দু'টির কোনোটাই অর্জিত হয়নি।

“বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার তিন ধারাকে এক ধারায় অর্থাৎ মাতৃভাষার মাধ্যমে না আনলে শিক্ষার মধ্য দিয়ে শ্রেণি বিভাজনকে পোক্ত ও গভীর করার যে আত্মঘাতী কাজ আমরা করে চলেছি তা থেকে যে মুক্তি নেই। বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করবার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্ব দেবার আবশ্যকতা ছিল। এটা দুঃখজনক যে তেমনটা ঘটেনি। আগামীতে এই দায়িত্ব পালন করাটা হবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্চ।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তার অর্জন-অবদানকে বিচার করবার প্রধান নিরিখ বুদ্ধিবৃত্তিক। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচার করবার নিরিখ একটি নয়, দু'টি; একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অপরটি সামাজিক। সমাজের সঙ্গে অনিবার্য রূপে রাজনীতি ও অর্থনীতি জড়িত।

“এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, এমনও ঘটনা ঘটেছে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি টিকতে পারবে কি না তা নিয়েই সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক কালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেই হয়তো এত প্রতিবন্ধক হটিয়ে সামনে এগোতে হয়নি। আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে দায়িত্ব পালন করেছে তাও অসামান্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন ও গৌরবকে স্মরণ করার সময় ওইসব বাধা-বিঘ্ন ও দায়-দায়িত্বকে বিস্মৃত হলে চলবে না।”

‘মৌলিক ও উপযোগী গবেষণা চাই’

নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন জ্ঞান আহরণ ও সৃষ্টি প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। 

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তার অস্তিত্বের একশ' বছর পার হয়ে এসেছে। সামনের দিনগুলোতে সে কিভাবে এগোবে সে প্রশ্নটা খুবই সঙ্গত। এগোতে হবে অবশ্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই। তার জন্য প্রয়োজন হবে বিতরণের লক্ষ্যে জ্ঞান আহরণ ও সৃষ্টি।

“জ্ঞানের সৃষ্টি হয় গবেষণার মধ্য দিয়ে। তাই গবেষণা চাই। গবেষণাকে হতে হবে মৌলিক তো অবশ্যই, সেই সঙ্গে উপযোগীও। আর গবেষণার ফল প্রকাশ করাও দরকার পড়বে। তার জন্য চাই প্রকাশনা। বস্তুত একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে চিনতে হলে সেখানে কী ধরনের ও মানের গবেষণা হচ্ছে সেটা যেমন দেখতে হয়, তেমনি খোঁজ নিতে হয় তার প্রকাশনারও।”

শুধু নতুন বই প্রকাশ নয়, গবেষণাভিত্তিক বইপ্রকাশে গুরুত্বরোপ করে তিনি বলেন, বই লেখার জন্য গবেষণাও আবশ্যক হবে। তবে সেই গবেষণা প্রকাশ করতে হবে বাংলা ভাষাতে, যাতে শিক্ষার্থী ও অন্য গবেষকদের কাছে তা সহজে পৌঁছাতে পারে।

একই সঙ্গে অনুবাদের প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, “অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের জ্ঞানকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসা চাই। অনুবাদ একা করা যায় না; এটি সব সময়েই একটি সমবেত কর্ম। বিষয়বস্তুটি ঠিক মত বোঝা এবং তা বাংলাভাষায় যথার্থ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে কি না সেটা দেখা। এই দুই কঠিন কাজের জন্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তো বটেই, অনুবাদকে সাবলীল ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ভাষায় দক্ষতা থাকাও অত্যাবশ্যক।”

বদলাতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জীবন

‘দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সন্তোষজনক নয়’ মন্তব্য করে পরিবেশ উন্নয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই নেতৃত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি বলেন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ দুর্বলতার বিষয়ে যে অভিযোগ, তা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নয়, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই যেহেতু প্রথম ও প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় তাই পরিবেশ উন্নয়নে নেতৃত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই দিতে হবে। এটি তার জন্য ইতিহাসনির্ধারিত কর্তব্য।

“আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলোর আরেকটি হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক জীবনকে উজ্জীবিত করা। এর জন্য অত্যাবশ্যক হচ্ছে ছাত্রসংসদের বার্ষিক নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনকেও নিয়মিত উৎসবে পরিণত করা চাই।”

হৃদয় কী নিয়ন্ত্রণে যাবে কৃত্রিম বুদ্ধির?

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে মানববিদ্যা যাতে সংকুচিত না হয় সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কর্তব্য পালনের তাগিদও দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এই বিপ্লব উৎপাদনশীলতার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটাবে এবং পৃথিবী ভরে যাবে প্রাচুর্যে। আর এর কেন্দ্রে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রশ্ন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তার সৃষ্টিশীলতার মালিকানা থাকবে কাদের হাতে?

“আগের সকল বৈপ্লবিক অবদানের ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটেছে, তেমনি মালিকানা অল্পকিছু সুবিধাভোগীদের হাতেই কি থাকবে, বাকি মানুষদেরকে বঞ্চিত করে? দ্বিতীয় প্রশ্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের হৃদয়ের স্থানটা হবে কোথায়? হৃদয় কী নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে কৃত্রিম বুদ্ধির? প্রশ্ন দু'টি আসলে চ্যালেঞ্জই।”

তিনি বলেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালগুলোর কর্তব্য থাকবে। সেটা হলো মানুষের মনুষ্যত্বকে রক্ষা করা। তার জন্য প্রয়োজন তবে মানববিদ্যার চর্চা।

“বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি অপরিহার্য, কিন্তু মানববিদ্যার চর্চা যাতে সংঙ্কুচিত না হয়- সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ইত্যাদির সৃষ্টিশীল চর্চা যাতে গুরুত্ব না হারায় সেটা দেখা সকল বিশ্ববিদ্যালয়েরই কর্তব্য হবে; এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও। বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেওয়া চাই ইতিহাস ও সাহিত্যকে, যে দু'টি বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে জ্ঞানার্জন কখনোই পরিপূর্ণ হয় না।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।