ডাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন যারা
স্বাধীনতার পর ১৯ বার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ৭ বার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু হয়েছিল ছাত্র সংসদ; যদিও শত বছরের ইতিহাসে বেশির ভাগ সময়ই ছিল না এর কার্যক্রম।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ডাকসু বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। এ কারণেই ডাকসুকে কেউ কেউ দেখেন ‘দ্বিতীয় সংসদ’ হিসেবে।
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এক লেখায় উঠে এসেছে, ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হল সংসদ গঠিত হয়। প্রত্যেক হল থেকে তিনজন ছাত্র এবং একজন শিক্ষক আর উপাচার্যের মনোনীত একজন শিক্ষক এই নিয়ে হয় সংসদ। শিক্ষকদের মধ্যে একজন সংসদের সভাপতি হতেন।
এরপর ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ গঠন করা হয়। প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) হয়েছিলেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ; আর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হয়েছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। আর ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভিপি ছিলেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, জিএস ছিলেন এ কে মুখার্জি ও এ বি রুদ্র (ভারপ্রাপ্ত)।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের লেখাটি প্রকাশ পায় ১৯৯১ সালে- ডাকসুর এক প্রকাশনায়।
তিনি লিখেছেন, “আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, ১৯৫৩ সালে। তখন ডাকসুর নামও শুনিনি। কিছুকাল পরে শুনলাম।
“প্রবীণ শিক্ষকদের কারো কারো মুখে শুনেছি, স্যার এ এফ রহমানের উদ্যোগেই প্রত্যেক হলে ছাত্র-সংসদ গঠনের ব্যবস্থা হয়। রহমান সাহেব অক্সফোর্ডের ছাত্র ছিলেন, সেখানে ইউনিয়ন দেখে এসেছিলেন; আলীগড়ের শিক্ষক ছিলেন, সেখানেও ইউনিয়ন ছিল। সুতরাং কথাটা সত্য হতে পারে।”
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি আবাসিক হল স্থাপিত হয়– মুসলিম হল, জগন্নাথ হল ও ঢাকা হল। হলগুলোই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র।
“এগুলো ছিল একাধারে ছাত্রদের আবাসস্থল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের আশ্রয় এবং টিউটোরিয়াল-ব্যবস্থার ভিত্তিভূমি।”
১৯৭১ সালের দোসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেখানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ডাকসু নেতারা।
যারা ছিলেন ডাকসুর নেতৃত্বে
১৯২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে হল সংসদ ছিল নেতৃত্বহীন। পরে ১৯২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন এ এম আজহারুল ইসলাম ভূইয়া এবং জিএস হন এস চক্রবর্তী। ১৯২৯-১৯৩০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি ছিলেন রমনীকান্ত ভট্টাচার্য, জিএস ছিলেন কাজী মহব্বত আলী এবং আতা. রহ. খান।
১৯৩০ থেকে ১৯৩২ শিক্ষাবর্ষেও নেতৃত্বহীন ছিল হল সংসদ। ১৯৩২-১৯৪৪ শিক্ষাবর্ষে ভিপি কেউ ছিলেন না। তবে ১৯৩৩-১৯৩৪ শিক্ষাবর্ষে জিএস ছিলেন ভবেশ চক্রবর্তী। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ শিক্ষাবর্ষেও কেউ ছিলেন না। ১৯৩৭-১৯৩৮ শিক্ষাবর্ষে জিএস ছিলেন আ. আওয়াল খান।
১৯৩৯-১৯৪১ শিক্ষাবর্ষেও কেউ নেতৃত্বে ছিলেন না। ১৯৪১-১৯৪২ শিক্ষাবর্ষে জিএস ছিলেন আ. রহিম।
১৯৪৪-৪৫ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদন করেন। এই গঠনতন্ত্রের অধীনে ১৯৪৫-৪৬ সালে উপাচার্য পদাধিকারবলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি হন। ছাত্রদের মধ্যে থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) হন আহমেদুল কবির এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন সুধীর দত্ত।
পরের বছরও এই সংসদ থেকে যায়, তবে আহমেদুল কবির পদত্যাগ করায় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান ফরিদ আহমদ।
১৯৪৭-৪৮ সালে ভিপি হন জগন্নাথ হলের অরবিন্দ বসু এবং জিএস হন গোলাম আযম। এই সংসদও পরের বছরে থেকে যায় এবং এক সময়ে গোলাম আযমের বদলে ভারপ্রাপ্ত জিএস হন এ জেড খান।
১৯৫০ সালে এই কার্যকালের মেয়াদ শেষ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ গঠনের আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদন করে; নামকরণ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা Dhaka University Central Students' Union (DUCSU)। নামের আদ্যক্ষর দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুখে ফেরে ডাকসু।
১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন হয়। ওই বছর সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে কেন্দ্রীয় সংসদে নির্বাচিত হন এস এ বারী এ টি (পরে বাংলাদেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী), জিএস হন জুলমত আলী খান, ফরিদ আহমেদ (ভারপ্রাপ্ত)।
১৯৫৪-৫৫ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন নিরোদ বিহারী নাগ, জিএস হন আব্দুর রব চৌধুরী। পরের বছরও ভিপি হন নিরোদ বিহারী নাগ, জিএস হন আব্দুর রব চৌধুরী।
১৯৫৬-১৯৫৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন একরামুল হক, জিএস হন শাহ আলী হোসেন। ১৯৫৭-১৯৫৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বদরুল আলম, জিএস হন মো. ফজলী হোসেন। ১৯৫৮-১৯৫৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আবুল হোসেন, জিএস হন এটিএম মেহেদী।
১৯৫৯-১৯৬০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আমিনুল ইসলাম তুলা, জিএস হন আশরাফ উদ্দিন মকবুল। ১৯৬০-১৯৬১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন জাহানারা আখতার, জিএস হন অমূল্য কর। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ প্রথম কোনো নারী ভিপি পায়।
১৯৬১-১৯৬২ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন এস এম রফিকুল হক, জিএস হন এনায়েতুর রহমান। ১৯৬২-১৯৬৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, জিএস হন কে এম ওবায়েদুর রহমান।
১৯৬৩-১৯৬৪ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন রাশেদ খান মেনন, জিএস হন মতিয়া চৌধুরী। এর মধ্য দিয়ে প্রথম নারী জিএস পায় ডাকসু।
১৯৬৪-১৯৬৫ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বোরহান উদ্দীন, জিএস হন আসাফুদ্দৌলা।
পরের বছর নেতৃত্বহীন ছিল ডাকসু। ১৯৬৬-১৯৬৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, জিএস হন শফি আহমেদ। ১৯৬৭-১৯৬৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মাহফুজা খানম, জিএস মোরশেদ আলী।
ডাকসুর ইতিহাসে দুজন নারী ভিপি ছিলেন। বেগম জাহানারা আখতারের পর মাহফুজা খান ছিলেন দ্বিতীয় নারী ভিপি।
১৯৬৮-১৯৬৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন তোফায়েল আহমেদ, জিএস হন নাজিম কামরান চৌধুরী। পরের বছরও নেতৃত্বহীন ছিল ডাকসু।
প্রথম প্রত্যক্ষ নির্বাচন ৭০ সালে
শুরু থেকেই ডাকসুতে পরোক্ষ নির্বাচন হত। হল সংসদে নির্বাচিতরাই পরে কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচিত করতেন।
আনিসুজ্জামান লিখেছেন– “পরোক্ষ নির্বাচন-প্রথার বদলে ডাকসুতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন চালু হলো ১৯৭০ সালে। ১৯৭৩ সালে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে আরেক দফা পরিবর্তন হয়েছে।”
ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রব ভাইয়ের সময় (আ স ম আবদুর রব) প্রথম ডাকসুতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন শুরু হয়েছে। ওই মেয়াদে সহসভাপতি হন রব ভাই এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) হন আব্দুল কুদ্দুস মাখন।”
স্বাধীনতার পর ডাকসুতে প্রথম ভিপি হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম; জিএস হন মাহবুব জামান।
১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ ডাকসুর নির্বাচন হয়নি। ১৯৭৯-১৯৮০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মাহমুদুর রহমান মান্না, জিএস হন আখতারুজ্জামান। ১৯৮০-১৯৮১ শিক্ষাবর্ষেও ভিপি হন মাহমুদুর রহমান মান্না, জিএস হন আখতারুজ্জামান।
১৯৮২-১৯৮৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আখতারুজ্জামান, জিএস হন জিয়াউদ্দিন আহমেদ (বাবলু)।
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত ডাকসুর নির্বাচন হয়নি। ১৯৮৯-১৯৯০ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুতে ভিপি হন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, জিএস হন মুশতাক হোসেন। ১৯৯০-১৯৯১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আমানউল্লাহ আমান এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন।
১৯৯১ সালের ১৮ জুন ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় সহিংসতার কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু পরে নির্বাচন হয়নি।
১৯৯৬ সালে অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী উপাচার্য হওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৮ সালেও নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনেও নেমেছেন।
২০০৫ সালে ডাকসু নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হলেও সেবার নির্বাচন করা হয়নি। ২০১২ সাল থেকে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোড়ালো হয়। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন।
সবশেষ ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন নুরুল হক এবং জিএস হন গোলাম রাব্বানী।
স্বাধীনতার পর থেকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একধরনের অনীহা দেখা যায়। ফলে ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১৯ বার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৭ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ছয় বছর বাদে এবছর যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে ২৮টি পদে প্রার্থী হয়েছেন ৪৭১ জন। তাদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন বাম দলের অঙ্গ সংগঠনের প্রার্থী রয়েছেন, তেমনই ‘নির্দলীয়’ অনেকেই আছেন- যারা ইতোমধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছেন।
