২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

জেন্ডার বাজেটের গুরুত্ব কতটা বাড়ল?

রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও মন্ত্রিসভা এবং সংসদে নারীর সংখ্যা এখনো কম।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Jun 2024, 10:12 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:07 PM

নতুন অর্থবছরের জন্য জেন্ডার সংশ্লিষ্ট বাজেটের পরিমাণ ১২ হাজার ১২৯ কোটি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য মোট ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন তিনি।

সেখানে জেন্ডার সংশ্লিষ্ট খাতে ২ লাখ ৭১ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশ। 

বিদায়ী অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের ৩৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। 

জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০২৪-২৫ বলছে, বাংলাদেশে এখনো যথেষ্ট জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও মন্ত্রিসভা এবং সংসদে নারীর সংখ্যা এখনো কম। এছাড়া অর্থনৈতিক কাজে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে ১৬৪টি দেশের মধ্যে ১৩৯তম অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে।  

জেন্ডার বৈষম্যের কারণ যেসব

নারীদের উচ্চ শিক্ষা অর্জনে বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও প্রথাগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে জানিয়ে জেন্ডার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে বাল্যবিয়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, নিরাপত্তার অভাব, নারীর প্রতি সহিংসতা ইত্যাদি। 

বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২২ অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির শতকরা হার।  

উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, মিড ডে মিল প্রোগ্রাম ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে-পড়ার হার এখনো প্রায় ১৫ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

সরকার বলছে, বাল্যবিয়ে, জেন্ডারভিত্তিক শ্রম বিভাজন, অল্প বয়সে গর্ভধারণের উচ্চ হার, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্যে প্রবেশগম্যতার অভাব, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং কোভিড-১৯ মহামারী নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে। 

এছাড়া গণিত, প্রকৌশল, আইটির মতো বিষয়গুলোতে সক্ষমতার সংশয়ের কারণেও মেয়েরা এসব ক্ষেত্রে পেশা গড়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। 

জেন্ডার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যখাতের বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত কারণ- দারিদ্র্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তা ইত্যাদি একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতের অগ্রগতিকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। জেন্ডার বৈষম্য বাংলাদেশে এখনো স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। 

সাক্ষরতা, উচ্চশিক্ষা, শ্রম বাজারে অংশগ্রহণ, গণমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের ব্যবহারের মতো অনেক সূচকে নারীরা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে ঝরে-পড়ার হার ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশি। এছাড়া আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশ অনেক কম। যারা কর্মক্ষেত্রে আসেন তারাও কম মজুরি এবং চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। 

ওই প্রতিবেদন বলছে, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, প্রতি জেলায় ইমার্জেন্সি অবস্টোট্রক কেয়ার চালু, মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম এবং নগদ প্রণোদনা মাতৃমৃত্যু হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ নমুনা ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক ২০২২ এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাজার শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ২০১৭ সালে ১ দশমিক ৭২ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে এই হার ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়েছে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে বিভিন্ন দেশে নেওয়া পদক্ষেপের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জেন্ডার বৈষম্য হ্রাস করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের রূপরেখা হিসেবে জেন্ডার গ্যাপ মেট্রিক্স প্রস্তাব করা হয়েছে।   

বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০৩১ সালে সরকার তা ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। 

ওই সফলতায় আসতে সরকার সম্ভাব্য যে কার্যক্রম নিচ্ছে-

  • নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণ;
  • নারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন বৃত্তি চালু;
  • ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম মাধ্যম ব্যবহার করে সুবিধাজনক সময়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো;
  • নিরাপদ বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া;
  • নারী শিক্ষা বিশেষত টিভিইটি প্রোগ্রামে নারীর অংশগ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো; 
  • নারী এবং তাদের বিভিন্ন ভূমিকার বিষয়ে ইতিবাচক সামাজিক প্রথা চালু করা;
  • কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে নারীদের জন্য প্রণোদনা সম্প্রসারণ;
  • জেন্ডার সংবেদনশীল লার্নিং পদ্ধতি প্রবর্তন।

মাধ্যমিকে বর্তমানে ৪০ দশমিক ৭৮ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, ২০৩১ সালে তা শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। 

ঝরে পড়ার হার কমাতে সরকার সম্ভাব্য যে কার্যক্রম নিচ্ছে-

  • মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি;
  • নিরাপদ, অহিংস, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে নারীবান্ধব শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ; 
  • যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা এবং মেয়েশিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
  • দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয়তার নিরিখে আর্থিক এবং অ-আর্থিক সহায়তা বাড়ানো;
  • মফস্বল এবং গ্রামের মেধাবী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ঋণ এবং বৃত্তি কর্মসূচি প্রবর্তন;
  • প্রান্তিক পরিবারের জন্য বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি সম্প্রসারণ।

বর্তমানে প্রতি লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৫৩ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে, ২০৩১ সালে সরকার তা ৭০ এ নামিয়ে আনতে চায়। 

মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা কমাতে সরকার সম্ভাব্য যে কার্যক্রম নিচ্ছে-

  • জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে প্রবেশগম্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ প্রতিরোধ;
  • নিরাপদ গর্ভপাত এবং গর্ভপাত- পরবর্তী যত্ন নিশ্চিত করা;
  • গর্ভকালীন এবং প্রসবোত্তর যত্ন নিশ্চিত করা;
  • সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; 
  • স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো;
  • বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা জোরদার করা;
  • স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে টেলিমেডিসিন এবং মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার বাড়ানো।

জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত রূপরেখা বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে এমন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, সহযোগী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ‘সুশীল সমাজের’ প্রতিনিধির সমন্বয়ে একাধিক কমিটি গঠনের প্রয়োজন হবে। গঠিত ওই কমিটি বছরে অন্তত তিনটি সভা করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা সুপারিশ করবে।

ওই সুপারিশের আলোকে মুখ্য ও সহযোগী মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম বা কর্মসূচি বা পরিকল্পনা কিংবা প্রকল্প গ্রহণ করবে।

পরবর্তীতে নারী উন্নয়নে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুকূলে প্রয়োজনীয় সম্পদ বণ্টন করা হবে এবং মন্ত্রণালয় বা বিভাগ গৃহীত পদক্ষেপগুলো জেন্ডার বৈষম্য হ্রাসে কী ভূমিকা রাখছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।