০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি [শততম পোস্ট]

মোত্তালিব দরবারী

Published : 30 Oct 2012, 11:26 AM

Updated : 24 Jun 2022, 12:00 AM

শিরোনামের প্রথম অংশকে স্বরণীয় করে রাখতে গিয়ে দ্বিতীয় অংশে উল্লিখিত বিষয়ে লেখার যোগ্যতা আমার আছে কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু, যেহেতু স্বরণীয় করে রাখার বিষয়টি এই পোষ্টের সাথে সম্পর্কযুক্ত তাই ব্যতিক্রম কিছু থাকতে হবে এই প্রত্যাশায় বিষটির অবতারণা।
ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে যার স্থান, সে অতি অবশ্যই ময়মনসিংহ গীতিকা। ধান চাষ করতে গিয়ে চাষী নিজের অজান্তে ক্ষেতে কিছু আগাছার জন্ম দেয়; কখনও কখনও রোপনকৃত জাতের বাইরেও অন্য জাতের ধান জন্ম নেয়। ময়মনসিংহের মাটি মহুয়া-মলুয়ার সৃষ্টি করতে গিয়ে আরো কিছু আগাছা এবং ভিন্ন জাতের লোকসংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। যার অধিকাংশই এখন বিলুপ্ত প্রায়। হারিয়ে যাওয়ার মিছিলে সামিল হতে গিয়েও পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে, লোক সংস্কৃতির এমন এক উজ্জল ধারা একদিল গান।
আমার এই পোষ্টের বিষয়- ময়নসিংহের একদিল গান

একদিল গান কী?
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পীর মাহাত্ম্য প্রকাশক গানগুলোর মধ্যে একদিল অন্যতম। প্রচলিত নাট্য ধারা এবং কিচ্ছা পরিবেশনরীতির বাইরে বৈঠকীরীতিতে খণ্ড বা পালা আকারে একদিল পীরের জীবনী বর্ণনার রীতিকেই একদিল গান বলা হয়।

উদ্দ্যেশ্য
সাধারণত গ্রামাঞ্চলের পশ্চাৎপদ শ্রেণীর মানুষজন সন্তান না হওয়া-বড় কোন রোগ থেকে মুক্তির প্রত্যাশা অথবা অন্যকোন মনোবাসনা পূরণের জন্য এ গান মানত করে থাকে। কেউ কেউ একেবারে শখের বশেও এ গানের আয়োজন করে থাকে। এ গানের বিশেষত্ব হলো হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন এ গানের মানত করে থাকে। মানত বা আয়োজনকারী যেই হোন শ্রোতা হিসেবেও থাকে উভয় সম্প্রদায়ের লোক।

আয়োজন
মানতকারী ব্যক্তি গান পরিবেশণকারী দলের সাথে যোগাযোগ করে আলোচনান্তে বায়নার মাধ্যমে গান পরিবেশনের দিন তারিখ নির্ধারণ করেন। যার বাড়িতে গানের আয়োজন করা হয়, তিনি আশে-পাশের লোকজনদের গানের খবর জানিয়ে দেন। নির্ধারিত দিনে গান পরিবেশিত হয় ।

পরিবেশণরীতি
সাধারণত বাড়ির আঙ্গিনায় পরিবেশিত হয় এ গান। কখনও কখনও বাজারে বা রাস্তার ধারেও এ গানের আসর বসে থাকে। যার বাড়ীতে গানের600" caption="এভাবে পীরের দরগা তৈরীর মাধ্যমে আসরের শুরু।"]

[/caption]

গান পরিবেশণের জন্য একজন বয়াতি থাকেন, তার সাথে থাকে আরো ৪/৫ জস দোহার বা পাইল, এদের চারদিকে ঘোরে বয়াতি গান পরিবেশণ করে থাকে।

Image
সম্পূর্ণ আসর ঠিক এরকম।

দোহাররা বয়াতির সাথে সুর মেলানো ছাড়াও বাদ্যযন্ত্র পরিচালনার কাজ করে থাকেন। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে থাকে ঢোল, খোল, করতাল প্রভৃতি। দোহারদের মধ্যে একজন থাকেন যিনি বয়াতির সাথে বিভিন্ন বিষয়ে তর্কের অবতারণা করেন।

Image
গান চলছে।

তর্কের এক পর্যায়ে জবাব দিতে গিয়ে বয়াতি গেয়ে উঠে আদি রসাত্মক গান-
পান খাইলে সুপারী লাগে আরো লাঘে চুন…
…………………………………
আইসো বন্ধু বইসো কোলে চুমা দেও গালে…..

গান পরিবেশিত হয় পালা হিসেবে। গনের দলের মজুরীর টাকাও দেওয়া হয় পালা হিসেবে। এ ক্ষেত্রে পালার হিসেব এরকম¬- একদিল পীরের জন্মবৃত্তান্ত এক পালা, বেড়ে উঠার কাহিনী এক পালা, বিয়ের অংশ এক পালা। প্রতি পালায় সাধারণত ১ ঘণ্টার মত সময় লাগে। সে হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ পালা গান চলে সারারাত ব্যাপী।

গানের সমাপ্তি
সাধারণ নিয়মে মানতকৃত অথবা বায়নাকৃত পালার গান শেষ হওয়ার পর, শুরু হয় সমাপনী গান যাকে বলা হয় ভরা তোলা।

Image
যার জন্য মানত করা হয় তার মাথায় এভাবে কুলা বসিয়ে গানে গানে ঘরে পৌছে দেওয়াকে ভরা তোলা।
Image
ঘরে বা ঘরের কাছে বাড়ির আঙ্গিনায় আরেকবার মঙ্গল কামনা করে গান পরিবেশনরন মাধ্যমে সমাপ্তি।