অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা নয়: অভিভাবকদের শিক্ষামন্ত্রী
“আমাদের সারাদিন মুখস্থ করতে হলে, উদ্ভাবনের চিন্তা কোত্থেকে আসবে?” প্রশ্ন শিক্ষামন্ত্রীর।
কথায় কথায় অনেকে মা-বাবাই যে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্যের সন্তানের তুলনা করে থাকেন- এমন আচরণ নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
তিনি বলেছেন, “আমরা সারাক্ষণ অন্যের সন্তানের সাথে তুলনা করতে থাকি। প্রত্যেক মানুষ ভিন্ন, বৈচিত্র্যপূর্ণ। একেকজনের মেধা, ঝোঁক, আগ্রহ, প্রতিভা, সক্ষমতা একেক দিকে।
“বাবা-মা, শিক্ষকরা যদি সেটা চিন্তা করে বাচ্চাদের সেদিকে একটু অনুপ্রাণিত করেন, তাহলে আমরা সমাজে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা দেখব।”
রোববার ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ’ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন দীপু মনি।
পরীক্ষায় প্রথম-দ্বিতীয় হওয়া আর জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের উপর যাতে চাপ তৈরি না করা হয়, সেই আহ্বানও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি মনে করেন, এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়।
“নিজেদের জীবনে আমরা যা করতে পারিনি, সন্তানের মাধ্যমে তা করতে হবে, সেজন্য বাচ্চাদের চাপাচাপি, জোর-জবরদস্তি করে সেদিকে নিয়ে যেতে হবে- এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।”
নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে দীপু মনি বলেন, “২০২৫ সাল নাগাদ আমাদের সকল শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমে আমাদের শিক্ষার্থী পড়াশোনা করবে। মুখস্থ তো নয়ই, এখানে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দক্ষতাও অর্জন করবে।”
শিক্ষার্থীরা বই মুখস্থ না করে যেন অভিজ্ঞতা, প্রকল্পভিত্তিক শিখনের মাধ্যমে উদ্ভাবনের দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেজন্য নতুন শিক্ষাক্রম বলে উল্লেখ করেন তিনি। আর তা পড়াতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কোভিড পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমরা ট্রমা দেখছি, কোভিড পরবর্তী ভয়, শঙ্কা, কাছের মানুষের মৃত্যু দেখা-এসব তাদের ভীত করেছে। অনলাইন নির্ভরতা বাড়ায় কোথাও কোথাও মোবাইল আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে।
“এজন্য আমরা শিক্ষার্থীদের সাইকোলজিক্যাল দিকটিতেও নজর দিচ্ছি। শিক্ষার্থীরা অনেকেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে আত্মহননের মত পথ বেছে নিচ্ছে। আমরা আমাদের কোনো পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীকেও এভাবে হারাতে চাই না। আমাদের সবাইকে শিক্ষার্থীদের এই দিকটিতে নজর দিতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা অনুশীলনের ওপর জোর দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীও।
তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, “আমরা সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ বলছি, কিন্তু আমার মনে হয়- এটা হওয়া উচিত সৃজনশীলতা অনুশীলন। তাদের যে বয়স- এখন তারা সৃজনশীলতা অনুশীলন করবে, তাদের মেধার বিকাশ হবে; ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বড় অফিসার বানানোর জন্য এই প্রতিযোগিতা নয়।”
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রতিবছর ‘বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা’ আয়োজন করে থাকে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি বিভাগ ও পাঁচটি বিষয়ে প্রতিযোগিতাটি হয়ে থাকে, যার মধ্যে আছে ভাষা ও সাহিত্য, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, গণিত ও কম্পিউটার, বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ স্টাডিজ ও মুক্তিযুদ্ধ।
এ আয়োজনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে ১৫ শিক্ষার্থী ‘বছরের সেরা মেধাবী’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে, যারা রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ, ক্রেস্ট, মেডেল ও এককালীন বিশেষ মেধাভিত্তিক বৃত্তি হিসেবে দুই লাখ টাকার চেক গ্রহণ করে।
আর বিকালে শিক্ষামন্ত্রীসহ অতিথিদের কাছ থেকে নানা পর্যায়ে বিজয়ী অন্য ১২০ জন সনদ, ক্রেস্ট, মেডেল ও ৩০ হাজার টাকার চেক গ্রহণ করে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব কামাল হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-১) খালেদা আক্তার অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন।
