আয়াস-রিমির মামলার শুনানিতে আইনজীবীকে মারধর, হট্টগোল
হট্টগোলের মধ্যে এক পর্যায়ে এজলাস ছাড়েন বিচারক।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার ঘটনায় করা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ ছড়ানো ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতি আল নুর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমির জামিন শুনানিতে হট্টগোল, মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আয়াসের হয়ে কথা বলা এক আইনজীবীকে মারধর করেন কয়েকজন আইনজীবী।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিয়াদ হাসানের আদালতে বুধবার জামিন শুনানিতে এ ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে এজলাস ছাড়েন বিচারক রিয়াদ হাসান।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গত শনিবার শিল্পকলা একাডেমির উল্টোপাশের ফুটপাত সংলগ্ন দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আয়াসসহ একদল তরুণ। এর জেরে উভয়পক্ষের বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে আয়াসসহ ৪ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
আয়াস ছাড়া আটক বাকি ৩ জন হলেন, রিমি, সাকিবুল হাসান ও সুজন মিয়া।
ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি দিতে দেখা যায়। তখন এক পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন। এ সময় ওই নারী বলেন, তারা ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। পুলিশি বাধার মুখে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্য সচিব আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগানও দেন।
এ ঘটনায় শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউল হক শনিবার আটক ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় গত রোববার মারজিয়া খন্দকার রিমি ও সুজনের ২ দিন এবং আয়াস ও সাকিবুল হাসানকে ৩ দিনের রিমান্ড দেয় আদালত। মঙ্গলবার সাকিবুল হাসান ও সুজন মিয়াকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।
বুধবার আয়াস ও রিমিকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই আব্দুল গাফফার হিমেল। আবেদনে বলা হয়, দুই আসামিকে রিমান্ডে পেয়ে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক আসামির বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং তাদের নাম-ঠিকানা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন। তদন্তের স্বার্থে পরবর্তীতে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের পুনরায় রিমান্ডে পাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এ দিন বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে আয়াস ও রিমিকে এজলাসে তোলা হয়। আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মনির হোসেন সুমন জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে তিন ধারার অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে কেউ ভালবাসে আবার অনেকে বিদ্বেষ করে। তিনি আসমান থেকে আসেননি, কোনো দেবদূতও না। আয়াস ও রিমির বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা করা হয়েছে, তা তাদের ধারন করে না। আয়াস অসুস্থ। তাদের জামিনের প্রার্থনা করছি।”
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, “আয়াস পাকিস্তান, জিন্নাহর কবর জিয়ারত নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তান, জিন্নাহকে নিয়ে বক্তব্য রাখা উস্কানি, দুরভিসন্ধি আছে। বাপ-মা, দাদা-দাদী কবর নেন না, পাকিস্তানে গিয়ে জিন্নাহর কবর জিয়ারতের কথা বলে। জিন্নাহকে নিয়ে বক্তব্য দেওয়ায় ষড়যন্ত্র আছে। পাকিস্তান, ভারতকে সামনে এনে তারা বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়।
“সেগুনবাগিচা থেকে হকার উঠিয়ে কেন গ্রাফিতি আঁকা হল, এটা নিয়ে তাদের জ্বালা। আপনারা গোলাম আযম, নিজামীর ছবি রাখার কথা বলতে পারেন। কিন্তু অন্যজনের ছবিতে কালি দিতে পারেন না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উস্কানি দিতে তারা এমন কর্মকাণ্ড করেছে। গত সাতমাস ধরে এই সরকার, জনগণকে নিয়ে তারা গালিগালাজ করছে। এই প্রজন্মকে খারাপ করছে তারা।
“সেফুদা নামে একজন আছে, যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে গালাগাল করে। তাকে দেখে তারা গালিগালাজ শিখেছে। তারা একটা প্রজন্মকে নষ্ট করছে। পাকিস্তান, ভারতকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশে টেনে এনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করছে।”
এক পর্যায়ে আয়াস-রিমির আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে ওমর ফারুক বলেন, “এরা সবাই জামায়াতের আইনজীবী, দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।'
এ সময় আসামিপক্ষের এক আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদ এর বিরোধিতা করে বলেন, “পিপির বক্তব্যে আপত্তি আছে।”
সে সময় রাষ্ট্রপক্ষে থাকা কয়েকজন আইনজীবী তার উপর ক্ষিপ্ত হন। তারা এসে আইনজীবী তৌহিদকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে টানাটানিতে আইনজীবী তৌহিদের শার্ট ছিঁড়ে যায়। সে সময় কয়েকজন বলতে থাকেন, তিনি (আল মহসিন তৌহিদ) অসুস্থ। কয়েকজন গিয়ে তাকে ছিনিয়ে আনেন।
এ অবস্থা দেখে এজলাস ছাড়েন বিচারক রিয়াদ হাসান। তখনও আদালতে হট্টগোল চলতে থাকে। কয়েক মিনিট পর প্রসিকিউটর ফারুকী ও আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসেন সুমন তা নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়াস প্রসিকিউটর ওমর ফারুকের উদ্দেশ্যে বলেন, “ক্ষমা চেয়েছি, স্যার। ক্ষমা চাই। এসব (মারামারি) করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন।”
আল মহসিন তৌহিদের উদ্দেশ্যে আয়াস বলেন, “আপনাকে তো আমি চিনি না। আপনি কেন আসছেন?”
পনের মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার বিচারক রিয়াদ হাসান এজলাসে ওঠেন। আইনজীবীকে মারধর ও আদালত কক্ষে হট্টগোল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিষয়টা খুবই খারাপ লাগল। আপনাদের কাছে এটা আশা করিনি। এ পর্যায়ে অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।”
পরে আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক রিয়াদ হাসান।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাদের আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে আয়াস বলেন, “আমি কি মার্ডার করে আসছি। আমাকে এভাবে নিচ্ছেন।”
পরে তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
