‘অবৈধ’ সম্পদ: জিয়াউল আহসান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং ছাড়াও ব্যাংকিং হিসেবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
বৃহস্পতিবার কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলা দুটি দায়ের করা হয় বলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান।
তিনি বলেন, “আসামিদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিং ছাড়াও ব্যাংকিং হিসেবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে।”
দুদক বলছে, সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান তার ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৪২ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। অনুমোদিত সীমা লঙ্ঘন করে নিজ হিসাবে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা করেছেন। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করে স্ত্রী নুসরাত জাহানের ‘সহযোগিতা ও যোগসাজশে’ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করেছেন।
আক্তার হোসেন বলেন, জিয়াউল আহসানের নামে আটটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
“একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে এই কাজে নিজের পদ ও অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দণ্ডবিধি, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।”
জিয়াউল আহসানের স্ত্রী নুসরাত জাহান তার ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৮ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে দুদক। তার নামে থাকা চারটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেন’ হয়েছে। স্বামী জিয়াউল আহসানের ‘সহযোগিতা ও পরস্পর যোগসাজশে’ তিনি বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ওই অর্থ স্তানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করেছেন।
অনুসন্ধানকালে জিয়াউল আহসানের সম্পদের যে তথ্য দুদক তুলে ধরেছে, তাতে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে মধ্যে তিনি এসব সম্পদ অর্জন করেছেন।
এসবের মধ্যে রয়েছে একটি বাগান ও পাঁচটি বাড়ি (ঢাকায় একটি আটতলা ও বরিশাল কেটি আটতলাসহ তিনটি বাড়ি, ঝালকঠিতে একটি বাড়ি), তিনটি ফ্ল্যাট এবং ৩ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমি ।
অনুসন্ধানকালে এসব সম্পদের দাম ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বলে জানতে পেরেছে দুদক।
শেয়ার বাজারে জিয়াউল আহসানের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে জমাসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
তার স্ত্রীর নামেও বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। অনুসন্ধানে দুদক দেখেছে, জিয়াউল আহসান ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এন্টিগা ও বার্বুডার নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য প্রায় ২ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে এন্টিগায় ১৩.৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংকে তার বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা এবং পাচারের তথ্য পাওয়ার কথাও বলছে দুদক।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যাব-২ এর উপঅধিনায়ক হন।
ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র্যাবেই রেখে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে।
পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।
ক্ষমতার পালাবদলের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় জিয়াউল আহসানকে। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
১৬ অগাস্ট গ্রেপ্তার করার পর জিয়াউল আহসানকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও তার নাম এসেছে।
