সিটিজেন টিভিকাণ্ডে এমপি শফিকুরের বিষয়েও তদন্তের আবেদন দুদকে
“এ বিষয়ে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করা অদায়িত্বশীলতা এবং সন্দেহজনক। এ ব্যাপারে তার দুর্নীতি তথা মানি লন্ডারিং থাকতে পারে।”
সিটিজেন টিভিকাণ্ডে সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান এবং পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী।
ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন রোববার দুদক চেয়ারম্যানকে পাঠানো তার ওই আবেদনে বলেছেন,“শফিকুর রহমান একজন আইনপ্রণেতা ও সাংবাদিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করা অদায়িত্বশীলতা এবং সন্দেহজনক। এ ব্যাপারে তার দুর্নীতি তথা মানি লন্ডারিং থাকতে পারে।
“এ কারণে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে উল্লেখিত পত্রিকা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু আমলে নিয়ে শফিকুর রহমান, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, রাজ্জাকুল হোসেন টুটুল ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হল।”
গত ৩১ মে দৈনিক সমকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘তুলে নিয়ে শেয়ার কেড়ে নেন বেনজীর ও নাফিজ’। সিটিজেন টিভির চেয়ারম্যান ও চাঁদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান লিখিত বক্তব্যের বরাতে পরে আরো কয়েকটি সংবাদমাধ্যম একই খবর প্রকাশ করে।
শফিকুর রহমান লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রথমদিকে তিনি ছাড়া সিটিজেন টিভির আর কোনো শেয়ার হোল্ডার ছিল না। কিন্তু একক চেষ্টায় টেলিভিশন চালু করা সামর্থ্যও তার ছিল না। সে কারণে ‘দূর সম্পর্কের কাজিন’ রাজ্জাকুল হোসেন টুটুলের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। রুট গ্রুপের এমডি টুটুল ‘অঙ্গীকার’ করেন, যত টাকা লাগে তিনি দেবেন।
“আমি রাজি হই এবং তাকে সাথে নেই। তারপর থেকে গড়িমসি শুরু করে। আজ শুরু করব কাল শুরু করব এই করে বছর চলে যায়। তবে এরই মধ্যে সরকারের অন্যান্য যা যা অনুমোদন দরকার করে ফেলি। হঠাৎ এক গভীর রাতে সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত নামে এক যুবক (আগে চিনতাম না) আমার বনানীর বাড়িতে আসে এই প্রথম টুটুই নাফিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সিটিজেন টিভি স্পোর্টস দিয়ে শুরু করার কথা বলে আমাকে তুলে (ওয়েস্টিন হোটেলের নিচ তলায়) বেনজীরের বাসায় নিয়ে যায়। বেনজীর তখন র্যাব ডিজি।”
সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এপি শফিকুর তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, “বেনজীর, নাফিস, টুটুল ছাড়াও অচেনা চেহারার অস্বাভাবিক আরো দুজন লোক যাদের দেখে মনে হল সশস্ত্র। বেনজীর একটা হলুদ কাগজ আমায় হাতে দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলে । আমি লেখা পড়তে শুরু করলে বেনজীর বাধা দিয়ে বলে, সিটিজেন টিভি হবে স্পোর্টস ওরিয়েন্টেড। অচেনা দুজনকে বলে স্পোর্টস এর লোক, তাদের সাথে একটা চুক্তিতে আসতে হবে এবং এই কাগজ সেই চুক্তিপত্র ।
“এক পর্যায়ে তারা ধমকের সুরে কথা বলে। তখন দুইটার দিকে আমি স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হই। তারপর টুটুলকে বারবার তাগাদা দিলে সে বলে বেনজীর আর নাফিস সব করবে, তার কাছে কিছু নেই।”
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুর রহমান ওই লিখিত বক্তব্যে বলেন, “তখন আমি জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে গিয়ে সিটিজেন টিভি এভাবে পাই- ক) আমার নামে ৩০% শেয়ার, চেয়ারম্যান; খ) বেনজীরের দুই মেয়ে ১৫+১৫-৩০%; গ) নাফিজ সরাফাত ২৫% শেয়ার এবং এমডি; ঘ) টুটুল ১৫% শেয়ার পরিচালক।
“এ অবস্থায় 8/৫ বছর চলে গেছে। আমি কিছু করতে পারছি না। ওরাও আইন অনুযায়ী আমাকে বাদ দিয়ে চালু করতে পারেনি । তাগাদা দিলে নানান অজুহাত দেখাতে থাকে।”
ওই ঘটনায় শফিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে দুদকে করা আবেদনে ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন বলেন, “বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকে তদন্ত চলমান। রিট পিটিশন ৪৪২৫/২০২৪-এর পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট ডিভিশন দুই মাসের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।”
‘আইনি পদক্ষেপ নিইনি লজ্জায়’
সিটিজেন টিভির ঘটনা দীর্ঘদিন চেপে রাখার পেছনে শফিকুর রহমানের ‘দুর্নীতি’ থাকতে পারে বলে যে সন্দেহ ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে এই আইনপ্রণেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, “আমার মানি লন্ডারিং আছে কিনা তদন্ত করুক। সিটিজেন টেলিভিশনের শেয়ার কেড়ে নেয়ার বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি লজ্জায়, কারো ভয়ে নয়। কিন্তু মিডিয়াতে এ অপকর্মের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়েছি। কেন বিষয়টি গণমাধ্যমে আসেনি? দশ বছর আগের কাণ্ড কেন এতদিন পড়ে ধরা পড়ল?”
এ বিষয়ে কথা বলতে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
তবে ৩১ মে সমকাল প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক প্রতিবাদলিপিতে তিনি দাবি করেছিলেন, ওই প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট’। তিনি কখনও শফিকুর রহমানের বাসায় ‘যাননি’; বেনজীর আহমেদ, শফিকুর রহমান এবং তার মধ্যে কোনো ‘বৈঠকও হয়নি’।
“একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বনানীর মতো সুরক্ষিত এলাকা থেকে জোর করে তুলে আনা অসম্ভব। একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের জন্য নথি না পড়ে সই করা এবং একই উদ্দেশ্যে অন্য দিন হলফনামায় সম্মতি যাচাই করা অসম্ভব। এই বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি বরং গণমাধ্যমের অপব্যবহার করে মানহানিকর তথ্য প্রচার করছেন।”
নাফিজ সরাফাতের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার সময় সিটিজেন টেলিভিশনে শেয়ারহোল্ডার ছিল না– এটি ‘মিথ্যা বিবৃতি’।
“সিটিজেন টেলিভিশন লিমিটেড ৫ এপ্রিল ২০১৭ সালে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স পায়। আর কোম্পানি গঠন হয় ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি। এর সংঘ স্মারক অনুযায়ী শফিকুর রহমান কোম্পানির ৫১ শতাংশ তথা ১৫ হাজার ৩০০ শেয়ারের মালিক। মোহাম্মদ রজাকুল হোসেন (টুটুল) ১৪ হাজার ৭০০ শেয়ারের মালিক, যদিও তিনি দাবি করেন তাকে শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল।”
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। তিনি বিদেশে থাকায় সিটিজেন টিভির ঘটনা নিয়ে তার বক্তব্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
