হ্যাঁচকা টানে শিক্ষকের মৃত্যু: র্যাব কি গ্রেপ্তারদের নিয়ে ‘আষাঢ়ে গল্প’ বলছে?
“যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা যদি প্রকৃত অপরাধী না হয়ে থাকেন, তাহলে তারাও ভিক্টিম হয়ে যাবে।”
ঢাকায় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে সড়কে পড়ে বগুড়ার শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তারদের নিয়ে র্যাব যে ভাষ্য দিয়েছে, তা নিয়ে আরও অসঙ্গতি সামনে আসছে।
ঘটনার পরদিন ‘ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত’ মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সন্দেহভাজন দুজনসহ বাইকের মালিককে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব-২।
তবে উদ্ধার করা বাইকটি আসলেই ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার হয়েছিল কি না, তা নিয়ে র্যাবের ব্রিফিংয়ের পরপরই প্রশ্ন ওঠে।
ছিনতাইয়ের ঘটনার বিভিন্ন সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা মোটরসাইকেল আর র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ব্র্যান্ড, মডেল ও রঙে পার্থক্য দেখা যায়।
আগের এ প্রশ্নের মীমাংসা না হতেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে আরও কিছু তথ্য মিলেছে, যা র্যাবের দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নিহত শিক্ষক রনজিলা পারভিনের স্বামী মামলা করার পর পুলিশ যে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) তৈরি করেছে, তাতে ঘটনার সময় বলা হয়েছে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট।
ওই সময় ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতে এসেছে বাইক মালিক রাকিব বেপারি ওরফে রাকিব হোসেন বেপারির বাসার গ্যারেজের সিসিটিভি ভিডিও।
একাধিক সময়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এফআইআরে যে সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলা হয়েছে, সেই সময় মোটরসাইকেলটি গ্যারেজেই রাখা ছিল।
কেবল তাই নয়, ছিনতাইয়ের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে প্যারা পনি (২৮) ও তার সহযোগী সেড্রিক জুলিয়ানের একই সময়ে ভিন্ন জায়গায় থাকার তথ্য মিলেছে।
গ্রেপ্তার এ তিনজনকে পাঁচ দিন রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ, যা শুক্রবার শেষ হয়েছে।
গত ২৯ অগাস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে নিহত হন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক রনজিলা পারভিন।
চিকিৎসার জন্য স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে ঢাকা এসেছিলেন তিনি। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় বাইকে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ টান দেয়।
তাতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাত ২টা ৬ মিনিটে বাইক নিয়ে বাসায় রাকিব
ঘটনার পরদিন ৩০ অগাস্ট র্যাব-২ ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বাহন হিসেবে যে বাইক দেখিয়েছিল, সেটি নিয়ে ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাত ২টা ৬ মিনিটে রাজধানীর পশ্চিম আরজতপাড়ার বাসায় ঢুকতে দেখা যায় রাকিবকে।
পাশের একটি ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন রাকিব। পেছনে ছিলেন তার বন্ধু হৃদয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বৃহস্পতিবার হৃদয় বলেন, “আমরা প্রায় রাত ২টা পর্যন্ত তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজের সামনে আড্ডা দিয়েছি। এরপর আমি আর রাকিব একসঙ্গে বাইকে করে তার বাড়িতে যাই।”
হৃদয়ের ভাষ্য, আগের দিন রাকিবের বিবাহবার্ষিকী ছিল। তিনি দাওয়াতে যেতে পারেননি। এ কারণে রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম তার জন্য খাবার রেখে দিয়েছিলেন। সেই খাবার নিতে রাকিবের বাসায় যান তিনি।
“খাবার নিয়ে সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরেই আমি চলে আসি,” বলছেন হৃদয়।
ছিনতাইয়ের ঘটনার আগে রাত ৩টা ৪৮ মিনিট, ভোর ৫টা, সাড়ে ৫টা ৩০, ৫টা ৩২, ৫টা ৩৫ এবং ৫টা ৫৫ মিনিটের আশপাশের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলটি গ্যারেজে একই জায়গায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাকিবের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, গ্যারেজে কোনো দারোয়ান নেই। তবে সেই ভোরে মোটরসাইকেলটি গ্যারেজে দেখেছেন—এমন একজনকে খুঁজে পাওয়া গেল।
সুমন নামের ওই ব্যক্তি ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই রাকিবদের বাসায় এসি ও বৈদ্যুতিক কাজ করছিলেন। রাকিবদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ও প্রতিবেশীও তিনি।
সুমন বলেন, সেদিন ফজরের নামাজ পড়ে তিনি ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
“যেহেতু এই বাসায় আমি কাজ করি, তাই ভেতর-বাহির চিনি। বাইরে থেকে আমি বাইকটা দেখেছি। আনুমানিক সময় তখন সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হবে।”
র্যাব-২ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান গত ৩০ অগাস্ট ব্রিফিংয়ে বলেন, “তার (রাকিব) বাইকটি পনি জোর করে বিভিন্ন সময় নিয়ে যায়। গত ২৬ তারিখ থেকে গত শনিবার (২৯ অগাস্ট) বিকেল পর্যন্ত পনি তার বাইকটি নিয়ে এসে রেখেছিল।
“মাঝে মাঝেই পনি বাইক নিয়ে যেত। কিন্তু এটা দিয়ে পনি ছিনতাই-টিনতাই কী করে, এই ব্যাপারে তার (বাইক মালিকের) কোনো ধারণা নেই।”
তবে র্যাব-২ অধিনায়কের এ বক্তব্য ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “উনি (অধিনায়ক) যে বলছেন, চার দিন রাকিবের বাইক পনি ভাইয়ের কাছে ছিল—এটা মিথ্যা কথা। আমি জানি, বাইক রাকিবের কাছেই ছিল।”
সুমাইয়া এও দাবি করেছেন, ঘটনার সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে রাকিব বাইক নিয়ে বাসায় ফেরেন। আবার সেই বাইক নিয়ে যখন বাসা থেকে বের হন, তখন ঘটনার দিন পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে।
ঘটনার রাতে সেড্রিকের বাসায় তার সঙ্গে ছিল পনি
ঘটনার আগের রাত ও ভোরে তেজতুরী বাজার এলাকার সেড্রিকের বাসায় তার সঙ্গে ছিলেন পনি। সেড্রিকের ঘরে থাকা ক্যামকর্ডারে সেই রাতের ভিডিও ধারণ হয়েছে।
রাত ৪টা ৩৩ মিনিট থেকে ৩৪ মিনিট পর্যন্ত সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ঘরের মধ্যে সেড্রিক, পনি ও শাকিব নামের একজন খালি গায়ে ঘোরাফেরা করছেন। একপর্যায়ে তারা গায়ে কাপড় দেন।
সেড্রিককে একটি ধূসর-সোনালি রঙের গোল গলা টি-শার্ট গায়ে দিতে দেখা যায়। পনি গায়ে জড়ান অ্যাডিডাসের লোগো সম্বলিত অফ-হোয়াইট রঙের একটি জার্সি কাপড়ের গোল গলা টি-শার্ট।
এছাড়া শাকিব নামের তরুণের পরনে ছিল কালো গোল গলা টি-শার্ট, বুকের উপর প্রিন্ট করা একটি ছবি। তারা কাপড় গায়ে দেওয়ার পর একসঙ্গেই বাসা থেকে বের হন। এর আগের ভিডিওগুলোতে তাদের মাদক গ্রহণ করতে দেখা যায়।
৫টা ৪১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে সেড্রিক ও পনি মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে ঘরে ঢোকেন। দুজনের হাতেই ছিল পলিথিনে মোড়ানো খাবার। পলিথিনের প্যাকেট ও ফোন রেখে তারা পরনের গেঞ্জি খুলতে থাকেন।
এর মধ্যেই ৫টা ৪২ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে ঘরে ঢোকেন কালো গেঞ্জি পরিহিত শাকিব। তিনিও ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে ঘরে ঢোকেন। এরপর শাকিব পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো একটি বস্তু বের করে খুলে দেখেন। এরপর শাকিব গেঞ্জি খুলে ফেলেন।
অন্যদিকে সেড্রিক দুটি প্লেট এনে সেখানে পলিথিন থেকে খাবার বের করে ঢালতে থাকেন। এরপর তাদের তিনজনকেই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করতে দেখা যায়।
রাত ৪টা ৩৩ মিনিট থেকে ৫টা ৪২ মিনিট পর্যন্ত—এ পুরো সময়ে তারা কোথায় ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পনির বড় ভাই রনি খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তারা ক্যাম্পের বাজারে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে তারা খাবার-দাবার কিনেছে।
“হয়তো নেশাদ্রব্যও কিনেছিল।”
এ তথ্য কীভাবে জানলেন–এমন প্রশ্নে রনি বলেন, “ধরা পড়ার পরে আমার সঙ্গে পনির কথা হইছে। সে এসব আমাকে বলেছে।
“এছাড়া তারা বাসা থাইকা বাইর হয়া সিএনজিতে ক্যাম্পের বাজারে গেছে। আসার সময় রিকশায় কইরা আসছে।”
সেদিন পনি, সেড্রিকের সঙ্গে থাকা শাকিবকে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে শাকিবের বড় ও ছোট দুই ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়।
তাদের দাবি, রাতে বাসা থেকে নামার পরে শাকিবকে রেখেই সেড্রিক ও পনি ক্যাম্পে গিয়েছিল।
এসব বিষয়ে র্যাব-২ অধিনায়ক নয়মুল হাসানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমরা কিন্তু বারবার বলেছি, এই তিনজনকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“এখন পুলিশ তদন্ত করে যদি পায়, তারা নির্দোষ, তাহলে তো ভালোই। এতে তো আমাদের কিছু করার নেই।”
গ্রেপ্তারের স্থানের তথ্যে গড়মিল
মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, ৩০ অগাস্ট বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে তেজগাঁও থানার পূর্ব তেজতুরী পাড়া গাজী আব্বাসের বাসার সামনে পাকা রাস্তার উপর থেকে আসামি পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী (২৮) ও সেড্রিক জুলিয়ানকে (২৪) ধরা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি করে অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং নগদ পাঁচ হাজার উদ্ধার করা হয়।
তবে বুধবার সরেজমিনে এই এলাকা ঘুরে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য। পনিকে গ্রেপ্তার করা হয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের অপর পাশের প্রোপার্টি-রো ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ আবাসিক ভবনে গিয়ে কথা হয় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা খোরশেদ আলমের (৫৫) সঙ্গে।
তিনি বলেন, ২৯ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ ৩০ তারিখ রাত পৌনে ২টার দিকে ‘র্যাবের লোক’ এসে পনিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ধরে নিয়ে যায়।
খোরশেদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কয়জনকে এখান থেকে ধরে নিয়ে গেছে?
তিনি বলেন, “একজনই।”
সেড্রিককে এখান থেকে ধরে নিয়ে গেছে কি না, এ প্রশ্নে খোরশেদ আলম বলেন, “না।”
তখন তাকে পনি ও সেড্রিকের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, এ দুজনের কাকে ধরেছে?
পনির ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এরে ধইরা নিয়া গেছে এহান থাইকা।”
এই বাসার অদূরেই চৌরঙ্গী মোড়ের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন সেড্রিক জুলিয়ান। সেদিন ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার গিয়ে দোতলা বাড়িটি তালাবন্ধ দেখতে পাওয়া যায়। বাড়িটির নিচে দুটি টেইলার্সের দোকান রয়েছে। আর বাড়ির সামনে একটি মুদি দোকান। বাড়ি ও নিচের দোকান দুটি সেড্রিকের বাবার।
গত কয়েক দিন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে এলাকাবাসী কিছুটা সন্তস্ত্র অবস্থায় আছেন।
এলাকার এক চা দোকানি বললেন, “আমি প্রতিদিন সাড়ে ৬টায় দোকান খুলি। সেদিনও দোকান খুলতে আইসা দেখি, মানুষের জটলা।
“নাইট গার্ড ও কয়েকজন নামাজ ফেরত মানুষ বলাবলি করছিল, ‘তারে ধইরা নিয়া গেছে’।”
‘র্যাবের সোর্সের সঙ্গে পনির দ্বন্দ্ব’
মোহাম্মদপুরে জেনিভা ক্যাম্পে বোবার বিরিয়ানি হিসেবে পরিচিত ফায়জানে মদিনা বিরিয়ানি হাউজের কর্ণধার আফতাব হোসেনের ভাই কামরান। সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, কামরানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের যেমন অভিযোগ রয়েছে, তেমনই র্যাবের সোর্স হয়েও তার কাজ করার কথা মুখে মুখে ফেরে। তার সঙ্গে পনিরের দ্বন্দ্ব পুরনো।
ক্যাম্পের কয়েকজন জানান, ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে কামরানকে মারধর করে পনি। সেই সঙ্গে ঘটনার রাতে ক্যাম্পে গিয়ে কামরানের সঙ্গে পনি আবার বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায়।
সেই ক্ষোভে র্যাবের কাছে পনির নাম দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে তার পরিবার।
এমন সন্দেহের কথা বৃহস্পতিবার বলছিলেন রনি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর বলেন, “পনিরে যেই অফিসার ধরতে আইছিল, তারে দেইখাই পনি জিগাইছে, আপনেরে কামরান পাঠাইছে না? এই প্রশ্ন হুইনাই ওই অফিসার তব্দা খায়া গেছে।”
তাদের কী নিয়ে দ্বন্দ্ব, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি রনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে কামরানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
তবে ব্রিফিংয়ে র্যাব কর্মকর্তা নয়মুল হাসান দাবি করেছিলেন, “আমাদের যে স্থানীয় সোর্স আছে, তাদের যখন এই জিনিসগুলো (ঘটনার ছবি, ভিডিও) দেখানোর চেষ্টা করেছি, তাদের মধ্যে প্রায় পনেরজন ব্যক্তি আমাদের নিশ্চিত করেছেন, এটা পনি ছাড়া আর কেউ না। কারণ সিসিটিভিতে কিন্তু খুব ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছিল না।”
মোটরসাইকেলের রঙ-মডেল বিতর্ক
গত ৩০ অগাস্ট ব্রিফিং শেষে র্যাব-২ সদর দপ্তরের সামনে গ্রেপ্তার দুজনকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। তখন পনি গাজী চিৎকার করে বলেন, তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে।
একপর্যায়ে তিনি নিজের মোটরসাইকেলের রঙের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, তার বাইক রূপালি ও কালো রঙের হলেও ছিনতাইয়ের সময় যে বাইক দেখা গেছে সেটির রং নীল। বিষয়টি সাংবাদিকদের তদন্ত করে দেখার অনুরোধ করেন তিনি। এরপর র্যাব সদস্যরা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।
মোটরসাইকেলের রঙের অমিল বিষয়ে প্রশ্নে র্যাব অধিনায়ক নয়মুল হাসান দাবি করেন, তিনি বাইকটি নিহত শিক্ষিকার স্বামীকে দেখিয়েছেন। তার স্বামী বলেছেন, ‘হুবহু এই বাইকটাই ছিল’।
তবে নিহতের স্বামী আবদুল মতিন বলেন, “যখন ঘটনা ঘটেছে, তখন রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম; তখন মোটরসাইকেলের রং কী, কেমন মোটরসাইকেল ছিল তা খেয়াল করিনি। কোনো রঙের মোটরসাইকেল ছিল তা তখন মার্ক করতে পারিনি।
“এমন কোনো কাজ নেই, যা প্রশাসন চেষ্টা করলে পারবে না। আমি চাই, সুষ্ঠু তদন্ত করে যারা অপরাধ করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
র্যাব কর্মকর্তা নয়মুল বলেন, মামলায় আসামি অজ্ঞাত। তাই পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“সন্দেহভাজন থেকেই ধীরে ধীরে জিনিসটা ডেভেলপ করবে। আরও স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব।”
এর আগে ঘটনার দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এসব ভিডিওতে দেখা যায়, নীল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ঘোরাফেরা করছেন। অন্যদিকে র্যাবের সরবরাহ করা উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের ছবিতে সেটি রূপালি ও কালো রঙের দেখা গেছে।
রাতের বেলা আলোর কারণে বাইক দুটির রঙে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপ্তি দত্তের কাছে।
ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে দীপ্তি দত্ত বলেন, ভিডিওতে রাস্তার পাশে গ্রামীণফোনের লোগোযুক্ত একটি ডিজিটাল এলইডি ব্যানার দেখা যাচ্ছে। খালি চোখে ব্যানারটির যে রং দেখা যায়, ভিডিওতেও সেটি প্রায় একই রকম রয়েছে।
তার ভাষ্য, একইভাবে ভিডিওতে থাকা লাল ইটের গেইটটির রংয়ের বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সড়কের বিভিন্ন স্থাপনা এবং দুই মোটরসাইকেল আরোহীর পোশাকের রংও ভিডিওজুড়ে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
তিনি এও বলেন, “আলোর প্রতিফলন বা গতির কারণে রঙের বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই।”
র্যাবের উদ্ধার করা এবং ভিডিওতে দেখতে পাওয়া বাইক দুটির মডেলের বিষয়ে মোটরসাইকেল বিষয়ক কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিকু আমির বলছেন, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটি ‘সুজুকি জিক্সার এসএফ ২০২০’ মডেলের একটি মোটরসাইকেল। অন্যদিকে র্যাব যেটি উদ্ধার করেছে, সেটি ‘ইয়ামাহা আর১৫’ মডেলের। দুটো আলাদা মোটরসাইকেল।
মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহার হওয়া সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেলটি কালো বা নেভি ব্লু রঙের হতে পারে।
আর উদ্ধার করা ইয়ামাহা মোটরসাইকেলটির সামনের বডি কিটের অনেকটাই সাদা (পার্ল) রঙের।
‘প্রকৃত সত্য উদঘাটনে কাজ করছে ডিবি’
রনজিলা পারভিনের নিহতের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার ও উদ্ধার মোটরসাইকেল নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যে ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছেন, তারা ‘প্রকৃত সত্যটা উদঘাটনে’ কাজ করছেন।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল বলেন, “এটা একটা আলোচিত ঘটনা ছিল, এ ঘটনার পর পর আমরা সবাই কাজ করতেছি। তদন্ত একটা বিশাল ব্যাপার। এ রকম একটা আলোচিত বিষয় নিয়ে যখন ঘটনা আমরা সব এজেন্সি ওখানে গেছি।”
‘সন্দেহভাজন’ লোককে গ্রেপ্তার করেই তদন্ত এগোতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা তো একবারে বলতে পারি না যে, স্পেসিফিক ওখানে কেউ আছে। তাহলে তো ধরেন তাকে আমরা অ্যারেস্ট করে নিলাম।
“কাজেই এটা হতে পারে, যে রকম ধরেছে—এটার এখন তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে প্রকৃত সত্যটা উদ্ঘাটন হবে।”
থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও এ ঘটনায় ছায়া তদন্ত করছে বলে জানান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল।
র্যাবের হাতে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের মধ্যে পনি গাজীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই ১২টি ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাকে একেবারেই ‘ধোয়া তুলসি পাতা’ বলা যায় না।
“আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই মাঠে আছি, আমরা কাজ করতেছি। যে প্রকৃত অপরাধী, তাকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব। এটুকু আস্থা আপনারা আমাদের উপর রাখেন।”
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য তুলে ধরা হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “আপনারা যা বলছেন, সেটা যদি সত্য হয়, তাহলে র্যাবের এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়।
“তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী যদি শক্তভাবে এই বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে, তাহলে খুব অল্প সময়ে তাদের জামিন হয়ে যাবে।”
তিনি এও বলেন, “আসামিপক্ষের আইনজীবী যদি র্যাবের দেওয়া তথ্যপ্রমাণ ভুল প্রমাণিত করতে পারে, এই ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান আছে। যদিও সেটা অনেক পরে এবং বিভিন্ন ধাপের ব্যাপার।”
জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার না করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা হলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা হয়, তা হলো প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসে না।
“এতে তারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে জনগণের মধ্যে আস্থা ও স্বস্তি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক ওমর ফারুক।
তিনি বলেন, “প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে যদি কোনো ঘটনা সাজানো হয়, তাহলে আমি বলব, এটি খুবই অশুভ পদক্ষেপ।
“যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা যদি প্রকৃত অপরাধী না হয়ে থাকে, তাহলে তারাও ভিক্টিম হয়ে যাবে। এতে বিচারের ন্যায্যতা নষ্ট হবে।”
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা গেলে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। জনগণ নিরাপদ ও স্বস্তিবোধ করবে।
“আর ঘটনা সাজানো হলে এ ধরনের কার্যক্রমই একসময় জনগণের জন্য বিপদ হয়ে উঠবে।”
সার্বিক বিষয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-২ এর সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড স্কোয়াড্রন লিডার নিফাজ রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তাদের সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ধরেছিলাম। তাদের যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল, তখন তারা অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছিল।
“পনি একজন চিহ্নিত পেশাদার ছিনতাইকারী। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা আছে। এছাড়া আমরা ঘটনাস্থলের খুব কাছের টাওয়ারে তাদের মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করেছি ঘটনার সময় ও আগে-পরে।
“সেড্রিকের বাসা তল্লাশি করে আমরা বেশ কয়েকটি বাইকের চাবি পেয়েছি। এগুলো কী কাজ, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি সেড্রিক। আমরা তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছিলাম, এটা আপনারা উল্লেখ করছেন না।”
পুরনো খবর
