নারীর প্রতি সহিংসতা: প্রতিবাদ ‘চলবে’
সমাবেশ থেকে ধর্ষণ, নিপীড়ন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। নারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু নিপীড়নের ঘটনার কথা তুলে ধরেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার ‘ব্যর্থতার’ জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পদত্যাগসহ সাইবার বুলিং বন্ধ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নারীরা।
তারা বলছেন, তারা চুপ থাকবেন না; প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’ শিরোনামে এই কর্মসূচিতে লেখক, অধিকারকর্মী, নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও অনেকে এসেছিলেন সংহতি জানাতে।
এ সমাবেশ থেকে ধর্ষণ, নিপীড়ন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। নারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু নিপীড়নের ঘটনার কথা তুলে ধরেন। পরে মানিকমিয়া এভিনিউ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়।
সমাবেশে অংশ নেওয়া সকলের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্যে সাতটি দাবি তুলে ধরেন আয়োজকদের একজন। তবে ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ তিনি নিজের নাম পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “নারী নির্যাতনের উসকানিদাতা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে তার পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবশ্যই তার শাসন কাঠামোর দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।
“সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নারীদের বিরুদ্ধে চলমান গণহামলা, গণপিটুনি, টার্গেটেড আক্রমণ, হয়রানি এবং ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে এবং এগুলো রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
“গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার বন্ধ করতে হবে এবং জনমত গঠনে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাইবার বুলিং বন্ধ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”
সমাবেশে যোগ দিতে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যকার সামিনা লুৎফা নিত্রা। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশজুড়ে নারীর ওপর যে সহিৎসতা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। এর আগেও এসব উগ্রতা চলেছে, সেই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যেই জনগণ নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণঅভ্যুথান ঘটিয়েছে, তার প্রতিফলন সরকারকে দেখাতে হবে।
“সরকারের নিরাপত্তাবাহিনী রয়েছে, সামাজিকভাবে কাজ করারও অনেক দপ্তর/সংস্থা রয়েছে। তাদেরকে সক্রিয় হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে হবে। সামাজিকভাবে এসব ন্যক্কারজনক সহিংসতা বন্ধে শিক্ষা ও সংস্কৃতির যে জাগরণ দরকার, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। নারীর প্রতি সহিংসতা এখনই থামাতে হবে।”
আয়োজকেরা লিখিত বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের সকল নারীর নিরাপত্তা এখন একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে সমাজের সকল স্তরের নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ, মব অ্যাটাক ও সাইবার বুলিংয়ের উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি নারীদের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত সহিংসতা ও ভয় দেখানোর ধারাবাহিক প্যাটার্নের অংশ।”
কিছু উদাহারণও এ সময় তুলে ধরা হয়। যার মধ্যে ঢাকার শ্যামলীতে যৌনকর্মীদের ওপর হামলা, লালমাটিয়ায় দুই শিক্ষার্থীকে জনসম্মুখে নির্যাতন ও হয়রানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি স্টাফের হাতে এক শিক্ষার্থীর হয়রানির ঘটনা, কক্সবাজারে হিজড়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, রংপুর ও জয়পুরহাটে মেয়েদের ফুটবল মাঠে আক্রমণ, আদিবাসী নারীদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নারীদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের হয়রানি, এমনকি নিষ্ঠুর ‘মব অ্যাটাক’ উল্লেখযোগ্য।
নারীদের প্রতি সহিংসতার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও প্রতিশোধমূলক হামলা, হুমকি ও সংগঠিত মব অ্যাটাক এখন ‘ভয়াবহ রূপ’ ধারণ করেছে মন্তব্য করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা গণ-আন্দোলন এবং জনগণের বিচার, স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীনতার দাবির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিশ্রুতি ও আকাঙ্ক্ষা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
“নারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনেনি। বরং তাদের নিষ্ক্রিয়তা এসব অপরাধকে আরও উসকে দিয়েছে। সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা খুবই উদ্বেগজনক, যেন নারীদের ওপর হামলা ও ভয় দেখানো স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য ঘটনা। সরকারের প্রতিক্রিয়াগুলো কেবলমাত্র মুখের কথায় পরিণত হয়েছে।”
নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যগুলো নারীদের আশ্বস্ত করার পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও মনে করছেন সমাবেশের আয়োজকরা।
তারা বলছেন, “ভুল তথ্য, আইন ও বাস্তবতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, যা কিনা ঘটনার বিচার না করে বরং অপরাধীদের রক্ষা করেছে।”
নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর ওপর এই সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্য বিদ্বেষমূলক প্রচার ও উসকানিমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে অবসানের দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে।
নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে প্রচার হওয়া প্রতিবেদন নিয়েও সমালোচনা করা হয় সমাবেশে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরোয়া না করা গণমাধ্যমের দায়িত্বহীন আচরণ—নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আর এর প্রতিবাদ ভুলভাবে দেখানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে, যা আমরা কখনও মেনে নেব না।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে আয়োজকরা বলেন, “স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে অবিলম্বে অপসারণ করা হোক। তার দায়িত্বহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমানুষের আস্থা নষ্ট করেছে। আমাদের দাবি, সকল শ্রেণি, ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের নারী যেন নিরাপদে ও নির্ভয়ে তাদের অধিকার চর্চা করতে পারে।”
