০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ধর্ম অবমাননা’: পিটুনিতে আহত অপূর্বকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিল পুলিশ

পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার সময় তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Oct 2025, 10:19 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:24 PM

কোরআন অবমাননার অভিযোগে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে পিটুনি দিয়েছে একদল ব্যক্তি।

প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টার পর শনিবার রাত পৌনে ৩টার দিকে অপূর্ব পাল নামের ওই শিক্ষার্থীকে হেফাজতে নিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে পুলিশ।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ভাটারা থানার ওসি রাকিবুল হাসান।

তিনি বলেন, “জনতার মারধরে আহত ওই শিক্ষার্থী বর্তমানে (ঢাকা মেডিকেলে) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

শনিবার রাতে কয়েকটি ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, যেসবে অপূর্ব পাল কোরআন অবমাননা করেছেন বলে বিভিন্ন পোস্টে অভিযোগ তোলা হয়। ওই শিক্ষার্থীর ফেইসবুক পোস্ট শেয়ার করে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়। এর মধ্যেই রাত ১টার দিকে অপূর্ব পালের বাসার সামনে জড়ো হতে থাকেন ক্ষুব্ধ অনেকেই।

খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করে ভাটারা থানা পুলিশ। প্রথমে তাকে আটক করতে জনতার সহায়তা চায় পুলিশ, জনতার তরফেও পুলিশকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।

একপর্যায়ে পুলিশ অপূর্বকে আটক করে থানায় নিয়ে আসার চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা অপূর্বকে মারধর শুরু করে। জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করলে তারা পুলিশের ওপরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ঘটনাস্থলে বাড়তি পুলিশ সদস্য ডেকে নেওয়া হয়।

রাত আড়াইটার দিকে ভাটারা থানার এসআই কামরুজ্জামান বলেন, “আমরা তাকে হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু লোকজনের ভিড় ও বাধার মুখে সেটা সম্ভব হয়নি। পরে ফোর্স বাড়িয়ে তাকে বের করে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

মারধরের মধ্যেই পৌনে ৩টার দিকে অপূর্বকে হেফাজতে নিতে সক্ষম হয় পুলিশ।

ওসি রাকিবুল হাসান বলেন, “আমরা বিষয়টি জানার পর তার ফেইসবুক আইডিতে কোরআন অবমানার ভিডিওর সত্যতা পেয়েছি। কিন্তু তাকে আটক করতে গেলে উত্তেজিত জনতার বাধার মুখে পড়তে হয়।”

বাসাটিতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন ওই শিক্ষার্থী, তবে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ রয়েছেন বলে জানান তিনি।

ওসি বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি সে অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তবে কোন ডিপার্টমেন্ট সেটি এখনও জানতে পারিনি।"

জানতে চাইলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সহকারী কর্মকর্তা নাকিব হাসান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। জনসংযোগ দপ্তরের সহকারী পরিচালক ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি। 

অপূর্ব নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন এ বিভাগের প্রভাষক আসিফ বিন আলী। 

তিনি রোববার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অপূর্ব পাল একজন ধর্মান্তরিত মুসলমান। তিনি আমার ছাত্র ছিলেন। ২০২৩ সালের শেষের দিকে তিনি ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম গ্রহণ করেন, নাম পরিবর্তন করেন এবং নিয়মিত ধর্ম পালন করতেন। তিনি আমার ক্লাস করেছেন জোব্বা পরে, মাথায় পাগড়ি দিয়ে।

“দুঃখজনকভাবে, ছেলেটি পরবর্তীতে ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ক্যাম্পাসে প্রায়ই অদ্ভুত আচরণ করত। সে এনএসউ ও বসুন্ধরার মসজিদে গিয়ে মানুষকে টুপি না পরলে কিংবা টাকনুর উপর কাপড় না পরলে বকা ঝকা করতো।”

এসব নিয়ে ক্যাম্পাসে একাধিক ছেলে-মেয়ের সঙ্গে অপূর্বর ‘ঝামেলা’ বাধে জানিয়ে আসিফ বলেন, “তার বৃদ্ধ মা তাকে সুস্থ করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। ২০২৪ সালে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রাগ আসক্তি ও অস্বাভাবিক আচরণের কারণে বহিষ্কৃত হন।”

এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ বিন আলী বলেন, “যদি আমি ভুল না বলি, তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং পরিবারের সংগ্রামের বিষয়টি বিবেচনা করে তাকে পুনরায় পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ছেলেটির ড্রাগ সমস্যা কিংবা মানসিক সমস্যা—কোনোটিরই যথাযথ চিকিৎসা হয়নি।

“সে যা করেছে, তা মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় করেছে। কাজটি অতি অন্যায় ও ঘৃণিত। কিন্তু বিষয়টি কোনো বড় ষড়যন্ত্র নয়, একজন মানসিক রোগীর কাজ। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা তাকে চিনতেন, সবাই জানেন। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো তাকে দ্রুত পুনর্বাসন কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠানো।”