তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১১০ কিলোমিটার নদীপথ ড্রেজিংয়ের সুপারিশ
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম সমাপ্ত এবং কারিগরি দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক হলে কাজটির সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১১০ কিলোমিটার নদীপথ ড্রেজিংয়ের সুপারিশ করা হয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমীক্ষা প্রতিবেদনে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমানের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, “দাখিলকৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাধীন রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম সমাপ্ত এবং কারিগরি দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক হলে কাজটির সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনা হল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীকে ঘিরে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা, যার মূল লক্ষ্য নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ।
এই পরিকল্পনার আওতায় নদীর দুই তীর সংরক্ষণ, খনন ও প্রশস্তকরণ, জলাধার ও ব্যারেজ উন্নয়ন, এবং আধুনিক সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা রয়েছে। তাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি কমানো এবং বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং নদীভাঙন কমবে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন। উজানে ভারতের পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ মৌসুমভেদে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। ফলে প্রকল্পের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর পানি বণ্টন চুক্তির ওপর।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, “তিস্তা একটি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমের অতিবৃষ্টিতে এই অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও দরী ভাঙনের ঘটনা ঘটে। পক্ষান্তরে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে অনেক স্থানে পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।
“বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির সাথে ব্যাপক মাত্রায় পলি প্রবাহের কারণে তিস্তা নদী ভরাট হয় এবং একাধিক চ্যানেলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।”
২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি সমীক্ষা চালিয়ে এই মহাপরিকল্পনার নকশা চূড়ান্ত করে।
পরে ভারতও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এই প্রকল্পে যুক্ত হতে এবং অর্থায়নে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করে, যার ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্পটি ঝুলে যায়।
২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চীনের কাছে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হবে।
এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার প্রায় ২ কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সরকার আশা করছে।
