জমি হাসপাতালের, ‘বাণিজ্যিক ব্যবহারের’ আবেদন এমপির
“স্বাধীন দেশের নাগরিক, যেকোনো কিছু চাইতে পারেন। কিন্তু আমরা দিয়েছি কি না, সেটাই বিষয়,” বলেন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম।
ঢাকার রূপনগর আবাসিক প্রকল্পে প্রায় ২৫ কাঠা জমি নির্ধারণ করে দেওয়ার চার দশকেও সেখানে কোনো হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি।
জমিটি তিন ভাগ করে হাসপাতালের জন্য দুটি প্লট বরাদ্দও দেওয়া হয়েছিল। এর ১৫ কাঠার সবচেয়ে বড় প্লটটি বর্তমানে চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিনের দখলে রয়েছে।
সময়ের ব্যবধানে হাতবদল হয়ে জমির ‘মালিকানা’ পেলেও সেখানে তিনি আর হাসপাতাল করতে চান না।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা— জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, ১৫ কাঠা জমি হাসপাতাল করার জন্য ‘যথেষ্ট নয়’।
এছাড়া আশপাশে আরো হাসপাতাল থাকার যুক্তিতে প্লটটি বাণিজ্যিক বা আবাসিক হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন তিনি।
ওই প্লটের ‘যাবতীয় কার্য’ পরিচালনার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ‘আমমোক্তার’ হিসেবে চিঠিটি লিখলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে জালাল উদ্দিন দাবি করেছেন, জায়গাটি তিনি ‘কিনেছেন’।
জমিটি আবাসিক বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জায়গাটা তো আমি হাসপাতালের জন্য নিই নাই। এটা যে নিছিল হাসপাতালের জন্য, সে তো বিক্রি করে ফেলছে আমার কাছে। আর উনি বলে নাই যে, এটাতে হাসপাতাল করা যাবে, অন্য কিছু করা যাবে না।”
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতাল বানানোর জন্যই জমিটা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি চাইলে জমিটা হাতবদল করতে পারেন। কিন্তু যাকে দেওয়া হবে, তাকে হাসপাতালই ‘করতে হবে’।
এমপি জালালের আবেদন প্রসঙ্গে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক, তিনি যেকোনো কিছু চাইতেই পারেন। আমরা দিয়েছি কি না, সেটা বিষয়। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের রূপ পরিবর্তন করছি কিনা, সেটা মূল বিষয়।
“উনি নিয়েছিলেন হাসপাতাল করার জন্য। এখন উনার মনে হচ্ছে যে, হাসপাতাল না করে এটা করবেন। উনি চাইতেই পারেন। আইনের মধ্যে এটা পড়ে কিনা, সেটা বিবেচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত দেব।”
হাসপাতালের জমিতে তিনি অন্যকিছু করার অনুমতি পেতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী না গেলে অবশ্যই দেব না। আমি থাকা অবস্থায় হবে না, এতটুকু বলতে পারি।”
এক খণ্ডের জমিকে করা হয় ৩ খণ্ড
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪-১৯৮৫ অর্থবছরে তৎকালীন গৃহসংস্থান অধিদপ্তর ‘স্ব-অর্থে’ রূপনগর আবাসিক প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল সরকার।
প্রায় ১০১ একর জমিতে বিভিন্ন আকারের ১ হাজার ২৪৫টি আবাসিক প্লট তৈরি করে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তখন ৩৯টি বাণিজ্যিক প্লট রাখা হয়, যেগুলো পরে দরপত্রের মাধ্যমে বণ্টন হয়। কিন্তু প্রায় চার দশক পরে এসে দেখা যাচ্ছে, অল্পকিছু বাদে সেখানকার প্রায় সব প্লটেই বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
‘সুপরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্প’ হিসেবে এর মূল নকশায় নাগরিক সুবিধার জন্য ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্লট’ হিসেবে মসজিদ, খেলার মাঠ, মিলন কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল ও বিপণিকেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্পের মূল নকশায় ১ দশমিক ২২ বিঘা (প্রায় ২৫ কাঠা) জমি নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। যেটি একনেক ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে প্লটটি বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০০০ সালের দিকে ১৮ নম্বর সড়কের প্লটটি ৩টি খণ্ড করা হয়।
২০০১ সালের ৫ মার্চ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমিটির সভায় ১৫ কাঠার প্লটটি ‘রূপনগর জেনারেল হাসপাতালের’ নামে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং আরেকটি ৪ দশমিক ৫৭ কাঠার প্লট ‘সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশের’ নামে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর বাকি ৫ কাঠার একটি প্লটে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নির্মাণ করতে সিটি করপোরেশনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এরমধ্যে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া দুটি প্লটের বর্তমান দখলের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অবগত হলেও, আরেকটির বিষয়ে তাদের কাছে ‘কোন তথ্য নেই’।
স্থানীয় বাসীন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সবশেষ গেল বছরের মে মাসে মাসে রূপনগর প্রকল্পের লেক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মিলন কেন্দ্র, শিশুপার্ক, খেলার মাঠ, বিপণিবিতান নির্মাণের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা বিভাগ।
ওই তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই।
প্রতিবেদনে সই করা ১০ কর্মকর্তার একজন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “আমরা তদন্তে যা পেয়েছি, সেটিই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারব না।”
একটিতে ওয়ার্কশপ; আরেকটিতে গ্যারেজ
রূপনগর জেনারেল হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ১৫ কাঠার প্লটটিতে গাড়ির ওয়ার্কশপ রয়েছে। সেখানে একটি টিনশেড নির্মাণ করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘কার ওয়াশ সেন্টার’।
সেখানকার এক কর্মী বলেন, সেখানে সাধারণত প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল মেরামত এবং ওয়াশ করা হয়। তিনি সেখানে চাকরি করেন। ওয়ার্কশপটি অনেক বছর ধরেই সেখানে রয়েছে, তবে জায়গাটি কীভাবে কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।
একইভাবে ‘সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশের’ জায়গাটিতেও টিনশেড রিকশার গ্যারেজ করা হয়েছে। ভেতরে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাখা থাকলেও কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।
রূপনগর আবাসিক এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “এই এলাকার সাবেক কাউন্সিলর তফাজ্জল হোসেন টেনু জায়গাগুলো দখল করে এসব করেছে, ৫ অগাস্টের পর সে পলাতক। কিন্তু দখল রয়ে গেছে।”
গেল বছরের মে মাসে মাসে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নকশায় ১৫ কাঠার একটি প্লট স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত আছে। প্লটটি ‘রূপনগর জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডের’ নামে ২০০১ সালে বরাদ্দ ও ২০১৩ সালে হস্তান্তর করা হয়। রেজিস্ট্রি হওয়ার ২ বছরের মধ্যে জমিতে অনুমোদিত নকশা ও প্রকল্প মোতাবেক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নিয়ম থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
আরেকটি প্রায় ৫ কাঠার প্লটের বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০০২ সালে সেটির বাস্তব দখল ‘সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশকে’ হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদেরকেও বরাদ্দপত্রের শর্ত অনুযায়ী ২ বছরের মধ্যে মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের বাধ্যকতা থাকলে বাস্তবে ‘কোন হাসপাতাল নির্মাণ করেনি’।
সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মনির হোসাইন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা চেষ্টা করতেছি, এটা করব।”
২ বছরের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ২০০২ সালে বরাদ্দ দেওয়া হলেও এতদিন কেন হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা হল যে, বিভিন্ন কমিটি চেঞ্জ হওয়ার জন্য হয়নি, এখন আমরা ব্যবস্থা করতেছি।”
সেখানে প্রস্তাব অনুযায়ী হাসপাতালই করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে এই চিকিৎসক নেতার ভাষ্য, “হ্যাঁ, এরকমই হবে।”
১৫ কাঠার প্লট যেভাবে জালালের হাতে
প্লটটি ‘জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডের’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল শাহরিয়ার নামে একজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী প্লটটির বাস্তব দখল হস্তান্তর করে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে দায়মুক্তি ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
এরপর প্লটটি ‘হস্তান্তরের অনুমতিক্রমে সাব কবালা দলিল মূলে’ আব্দুস সাত্তার নামে একজনকে হস্তান্তর করেন শাহরিয়ার। সবশেষ ২০১৬ সালে ক্রেতা মালিক হিসেবে সাত্তার প্লটটিতে ‘যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য’ রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে জালাল উদ্দিনকে আম-মোক্তার নিযুক্ত করেন।
তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এমপি জালাল বলেছেন, ২০১৩-১৪ সালের দিকে তিনি শাহরিয়ারের কাছ থেকে জায়গাটি কিনেছেন।
“আমি আজ প্রায় ১৪ বছর জায়গাটা নিছি, কোনো কিছু করতে পারি না, ফালায় রাখছি। এই জায়গাটা সরকারও পাচ্ছে না, আমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।”
মাঝের আব্দুস সাত্তারের প্রসঙ্গে তুলতেই তার পাল্টা প্রশ্ন, “আপনি এটা নিয়ে কেন এত আগ্রহী?”
বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনার যত জানার থাকে, কোনো অসুবিধা নাই। আমি দেশে এলে সামনাসামনি আলোচনা করব।”
কেন তিনি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি চান
সবশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে ১৫ কাঠার প্লটটির ‘আমমোক্তার গ্রহিতা’ জালাল উদ্দিনকে একটি চিঠি দিয়ে ‘হাসপাতাল নির্মানের অগ্রগতির’ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল না হওয়ায় স্থানীয়দের একটি অভিযোগের তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেই চিঠিতে বলা হয়, ১৫ কাঠা প্লটের নকশায় ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র’ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে এবং ‘রূপনগর জেনারেল হাসপাতালের নামে’ বরাদ্দ রয়েছে।
লিজ দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার ২ বছরের মধ্যে জমিতে অনুমোদিত নকশা ও প্রকল্প মোতাবেক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়ম থাকলেও সেটি হয়নি।
প্লটটিতে বর্তমানে কার ওয়াশ সেন্টার ও দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটি রিকশার গ্যারেজ তৈরি করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্তের সুপারিশে।
হাসপাতাল নির্মাণের অগ্রগতির বিষয়ে ‘অবহিত করতে’ ওই চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মে মাসে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বরাবর লেখা আরেক চিঠিতে আব্দুস সাত্তারের পক্ষে জালাল উদ্দিন ওই প্লটে আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন।
সেখানে জালাল উদ্দিন লেখেন, প্লটটির ১৫ কাঠা জমি একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করার জন্য ‘যথেষ্ট নয়’। তার মতে, বর্তমান সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণ করতে কমপক্ষে ৮ বিঘা জমির প্রয়োজন হয়।
তাছাড়া উক্ত এলাকার আশপাশে ৩-৪ টি হাসপাতাল থাকার কথা বলেছেন, তবে সেখানে তিনি ৯টি হাসপাতালের নাম লিখেছেন।
‘সার্বিক বিবেচনায়’ তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৫ কাঠা প্লটটিও বাণিজ্যিক হিসেবে রূপান্তর করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় হবে বলে মত তার।
তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জালাল উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালের জন্য আমি সরকারের কাছে বলছিলাম, আমাকে অন্তত দুই বিঘা জমি দেন, আমি একটা হাসপাতাল করতে চাই। এখন ১৪ বছরে কিছুই করা হচ্ছে না, জায়গাটা পড়ে রইছে।
তার ভাষ্য, “এমন বহু জায়গা উনারা আবাসিক করছেন, বাণিজ্যিক করছেন, বহুত রেকর্ড আমার কাছে আছে।”
হাসপাতালের জন্য বরাদ্দের জমি বিক্রি প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, যাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, নির্ধারিত মূল্যেই দেওয়া হয়েছে। তিনি চাইলে অন্য কাউকে বিক্রি করতেই পারেন। তবে সেখানে হাসপাতাল বাদে অন্যকিছু করতে পারবেন কিনা সেটি ‘কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়’।
আরেকটিতে কলেজের পাশেই করা হয় কলেজ
বাকি আরেকটি ৫ কাঠার প্লট যেটি সিটি করপোরেশনকে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র’ করতে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেখানে বর্তমানে ‘রাজধানী মহিলা কলেজ’ রয়েছে। অথচ দেয়াল ঘেঁষে আগে থেকেই সেখানে ‘সরকারি রূপনগর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ রয়েছে।
গেল বছর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে ‘রাজধানী মহিলা কলেজ’ নির্মিত রয়েছে। কিন্তু ওই কলেজ কর্তৃপক্ষকে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কিনা সেই তথ্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গৃহায়নের ‘অসৎ কর্মকর্তাদের কারণে’ সিটি করপোরেশনকে বরাদ্দ দেওয়া যায়নি বলেও চিঠিতে অভিযোগ করা হয়। পরে ওই প্লটে ‘রাজধানী মহিলা কলেজ’ নামে একটি কলেজ করা হয়, যেটিতে রাজউক বা গৃহায়নের কোনো অনুমোদন নেই এবং বরাদ্দপত্রও নেই।
“রূপনগরে প্রায় ১০-১২ বিঘা জমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে আগে থেকেই বরাদ্দ ছিল। তারপরেও হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত স্থানে একটি কলেজের দেয়াল ঘেঁষে আরেকটি কলেজ করার কোনো যুক্তি ছিল না।”
যোগাযোগ করা হলে রাজধানী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শিব শংকর সরকার দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
তারই সহকর্মী মুরাদুজ্জামান বাদলের কাছে কলেজের জন্য বরাদ্দ জমির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, “এটা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট, প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হইছে।”
কিন্তু সেটি হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে কলেজকে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে তার ভাষ্য, “২০১৩-১৪ সাল থেকে কলেজটি এখানে আছে। তৎকালীন স্থানীয় এমপি আসলামুল হক এটির বরাদ্দ দিয়েছিলেন, এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই।”
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কেউই ওই কলেজকে জমি বরাদ্দের বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তাদের ভাষ্য, সেটি তারা দেননি। কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে, সেটিও তারা জানেন না।
অভিযোগের পর অভিযোগ, যাচাইয়ে ‘সত্যতা পেলেও’ কাজ হয়নি
২০২১ সালের এপ্রিলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ‘হাসপাতালের জায়গা নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড’ নিয়ে বাসিন্দাদের একটি আবেদনে বলা হয়েছিল, গৃহায়নের ‘দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে’ প্লটটিকে তিনটি ভাগ করা হয়।
তারা তিনটি প্লটের আলাদা আলাদা বরাদ্দ বাতিল করে পুরো জায়গায় হাসপাতাল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের অগাস্টে মন্ত্রণালয়ের তরফে এক চিঠিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানে সরকার পতনের ২৫ অগাস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চেয়ে’ আরেকটি চিঠি দেওয়া হয় স্থানীয়দের তরফে।
এর ভিত্তিতে ১৭ সেপ্টেম্বরে একইভাবে যুগ্মসচিব জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে পাঠানো একটি চিঠিতে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ করেন।
এর মাঝে সরাসরি ও অনলাইনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একাধিকবার অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদন দাখিলও হয় সংশ্লিষ্টদের তরফে।
গেল বছরের মে মাসে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে রূপনগর আবাসিক এলাকায় লেক বা জলাশয়ের প্রায় ১৭ একর জায়গাও বিভিন্ন সমিতির নামে বরাদ্দ এবং বড় অংশ বস্তিবাসীর দখলে থাকার কথা বলা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়, আবাসিক ও সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য লেকটি পিপির নির্দেশনা মোতাবেক ‘উন্নয়ন করা প্রয়োজন’।
কমিউনিটি সেন্টার ও শিশুপার্কের জন্য নির্ধারিত দেড় বিঘার বেশির ভাগ জায়গায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে করেছে এবং বাকি অংশে মসজিদ কমিটি অবৈধভাবে দেয়াল তুলে নিজেদের দখলে রেখেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এমনকি রূপনগর আবাসিক এলাকার প্ল্যানে একটি খেলার মাঠ এবং লেক সংলগ্ন একটি পার্কের সংস্থান থাকলেও সেসবের অস্তিত্ব নেই বলেও তাদের তদন্তে পাওয়ার কথা বলা হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বরাবর রাজউকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, হাসপাতাল হিসেবে বরাদ্দকৃত প্লটে অবৈধভাবে অটোমোবাইল গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ইমারত নির্মাণ আইনের পরিপন্থি। শর্ত ভঙ্গ করে অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে।
সবশেষ গেল ৯ মে ফের ‘হাসপাতালের জায়গা নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড বন্ধ’ চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ নিয়ে ঘুরেছি, সবাই আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু আমরা রূপনগরবাসী সেই হাসপাতাল এখনো পেলাম না। আমরা বিষয়টির দ্রুত সুরাহা চাই।”
তদারকির ঘাটতি কিনা জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, “আমাদের প্রত্যেকটা সরকারি অফিসে দেখবেন জনবল সবসময় একটু কম থাকে। আমরা স্বাভাবিক সেবা দিয়েই কুলাইতে পারছি না। এখন যে নিয়েছে জমিটা হাসপাতাল করার জন্য, তারও একটা দায়িত্ববোধ আছে।
“শুধু সরকারের উপরে চাপায় দিলে কিন্তু সরকার সব দায়ভার নিয়ে একা চলতে পারে না। পাবলিককেও আগায় আসতে হবে। যে ভদ্রলোক নিয়েছেন জায়গাটা, উনি তো দেশের নাগরিক, দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলবেন।”
