০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের রুনা খান

রুনা খান ২০০২ সালে ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংস্থাটি বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার উন্নয়নে কাজ করে আসছে।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের রুনা খান
রুনা খান

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Aug 2026, 01:44 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:11 PM

প্রান্তিক ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিতে চলতি বছরের র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান।

সোমবার ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন।

রুনা খানের সঙ্গে এ বছর আরও দুজন ‘এশিয়ার নোবেল’খ্যাত এ পুরস্কার পাচ্ছেন। তারা হলেন সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও আইনজ্ঞ টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চি।

আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন বলেছে, ২০২৬ সালের বিজয়ীদের এমন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত চিরস্থায়ী মূল্যবোধের’ প্রতিফলন ঘটায়।

এর মধ্যে রয়েছে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে নিতে সক্ষম করে তোলা।

দুর্গম অঞ্চলে মানুষের পাশে ‘ফ্রেন্ডশিপ’

১৯৯৭ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের একটি চর পরিদর্শনে যান রুনা খান। সেখানে যা দেখেন তাতে তিনি গভীরভাবে আলোড়িত হন।

চরবাসীদের চাহিদা সম্পর্কে গভীরভাবে জানার পর, ২০০২ সালে তিনি তাদের জন্য একটি ভাসমান হাসপাতাল চালু করেন। তবে আরও বড় কিছু করতে চাইলে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন—এমন উপলব্ধি থেকে ওই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশ', যা পরে চর অঞ্চলের মানুষের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বর্তমানে সাতটি ভাসমান হাসপাতাল ও ডাঙায় স্থাপিত দুটি হাসপাতাল, ৫৫০টি মোবাইল ক্লিনিক এবং ৭০০ জন প্রশিক্ষিত ‘ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটি মেডিক এইড’ এর মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে এ সংস্থা।

গত দুই দশক ধরে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, জীবিকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি ক্ষমতায়নের মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা কাজ করছে।

২০০ হেক্টরের বেশি ম্যানগ্রোভ বনায়ন তৈরিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ১০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবককে উদ্ধার ও ত্রাণকাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ফ্রেন্ডশিপ। ১৩৭টি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হাবের মাধ্যমে ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ নতুন কাজের সন্ধান পেয়েছেন।

‘জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য স্থানান্তরযোগ্য স্কুল’— এই নীতির ওপর ভিত্তি করে ফ্রেন্ডশিপ এমন স্কুল নির্মাণ করেছে, যেগুলো নদীভাঙনের মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুলে ফেলে অন্যত্র পুনরায় তৈরি করা যায়।

সংস্থাটিতে এখন সাড়ে সাত হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই উঠে এসেছেন বিভিন্ন দুর্গম এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে।

ফ্রেন্ডশিপের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক উদ্দেশ্যভিত্তিক সংস্থা। এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যেখানে বিশেষ করে যাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন এবং যাদের প্রয়োজন প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, তারা মর্যাদা ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকার সমান সুযোগ পাবেন।

সামাজিক সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি যেসব জনগোষ্ঠীর জন্য সংস্থাটি কাজ করে, তাদের স্বার্থকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে ফ্রেন্ডশিপ।

ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে রুনা খানের কাজের স্বীকৃতিতে এবার র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এল। এর আগে ২০২৫ সালে জলবায়ু নিয়ে বাংলাদেশের কাজের জন্য ফ্রেন্ডশিপ ‘আর্থশট প্রাইজ’ও পেয়েছিল এ সংস্থা।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন বলছে, এবারের পুরস্কারের জন্য তারা রুনা খানকে নির্বাচিত করেছে, কারণ তিনি গভীর সহানুভূতি নিয়ে নিজেরে দেশের হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে ফ্রেন্ডশিপ গড়ে তোলা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহস, দূরদৃষ্টি ও একাগ্রতার পরিচয় দিয়েছেন।

যেভাবে শুরু র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের

ফিলিপিন্সের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নামে এ পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।

একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয় র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন। পরের বছর, ১৯৫৮ সালে, প্রথমবার এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রতিবছর ৩১ অগাস্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

এশিয়ার নেতৃত্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত এ পুরস্কার দেওয়া হয় এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে, যাদের কাজ মানব উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে।

রুনা খান চতুর্দশতম বাংলাদেশি, যিনি র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন।

এর আগে সর্বশেষ ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ এ পুরস্কার পান।