২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

সিলেটে ‘বিদ্রোহেও অবিচল’ বিএনপি

স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে সব আসনে নীরব ভোট বেশি। তারাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে।

সিলেটে ‘বিদ্রোহেও অবিচল’ বিএনপি
সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরের নির্বাচনি প্রচার।

সিলেট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Feb 2026, 01:26 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:52 PM

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিকে মোটামুটি ‘নিরাপদ’ মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। 

তারা বলছেন, একটিতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ধানের শীষের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে; এখানে জামায়াতের জয়ের ইতিহাস আছে। 

২০০১ সালে সিলেট-৫ আসনে জামায়াত নেতা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও সেটি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে। 

এই আসনেই বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মামুনুর রশীদের অবস্থান শক্ত। তাকে ও তার সমর্থক ৯ নেতাকে এরই মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

যদিও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ভাষ্য, তারা সব আসনেই জয়ের জন্য লড়ছেন।

সিলেট-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের নির্বাচনি প্রচার।

সিলেট-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের নির্বাচনি প্রচার।

স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে সব আসনে নীরব ভোট বেশি। তারাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই রাজনৈতিক নেতারা তাদের জয়-পরাজয়ের হিসাব কষছেন।

তবে ভোটের মাঠ অনেকাংশেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক ও তাদের নেতা-কর্মীদের দখলে। এই দুই দলের প্রার্থীরাই ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনসংযোগ, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। 

বিএনপির মনোনয়ন ‘বঞ্চিতরা’ কিছুদিন নীরব থাকলেও এখন কেউ কেউ দলীয় প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নেমেছেন। অনেকেই আবার নামেননি।  

জামায়াতে ইসলামীর জোটে আসন ভাগাভাগি হওয়াতে প্রার্থী নিয়ে কিছুটা বিপাকে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা।

‘মিথ ও মর্যাদার’ লড়াই

সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিকে সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টি আসনের মধ্যে সবসময় ‘মর্যাদার’ মনে করা হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করেন, সেই দলই সরকার গঠন করে- এটা মিথে পরিণত হয়েছে।

সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা।

সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা।

এই আসনে আট প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের হাবিবুর রহমানের মধ্যে।

পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া খন্দকার মুক্তাদির দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে প্রচারে থাকায় এগিয়ে থাকলেও ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে হাবিবুর রহমানও লড়াইয়ের আলোচনায় রয়েছেন।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বাবা খন্দকার আবদুল মালিক সিলেট বিএনপি প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৮ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হন। তার কনিষ্ঠ ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০১৮ সালেও বিএনপির হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন। 

এদিকে, বিএনপির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমির হাবিবুর রহমান। তাকে নিয়ে দলে কোনো কোন্দল নেই, নেই কোনো অসন্তোষ। 

সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের নির্বাচনি প্রচার। 

সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের নির্বাচনি প্রচার।

ইসলামী ছাত্রশিবির দিয়ে রাজনীতির পথ চলা শুরু হাবিবুরের। ১৯৮২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি সিলেট জেলা শাখার আমির থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে হাবিবুর রহমান সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। 

এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- সিপিবির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল (মই), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া (আ্যাপেল), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), বাসদ-মার্কসবাদীর সঞ্জয় কান্তি দাস (কাঁচি)।

‘ইলিয়াস-স্মৃতিতে নির্ভার’ লুনা

বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনের এক সময় সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপির রাজনীতিতে আসেন। এবার তিনি ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করছেন।

তার সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলীর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা। 

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মামুনুর রশীদের প্রচার; যিনি ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিতি।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মামুনুর রশীদের প্রচার; যিনি ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিতি।

তারা মনে করেন, ইলিয়াস আলীর কারণে এখানে ব্যাপক জনপ্রিয় তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি ভোটের প্রচারে ইলিয়াস আলীর সময়ে হওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। 

এদিকে, এই আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন। এ নিয়ে দুই নেতার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।

অবশেষে হুমায়ুন কবিরকে দলের যুগ্ম মহাসচিব (পররাষ্ট্র) হিসেবে মনোনীত করায় লুনা ‘ঝামেলা মুক্ত’ হন বলে মনে করেন সমর্থকরা। 

তবে হুমায়ুন কবিরকে বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর কোথাও ধানের শীষের প্রচারে দেখা যায়নি।

এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন-গণফোরামের মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী (লাঙ্গল)।

সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুসলেহ উদ্দিন রাজুর নির্বাচনি প্রচার। 

সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুসলেহ উদ্দিন রাজুর নির্বাচনি প্রচার।

জোটের সুবিধা-অসুবিধা 

ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিক। তার সঙ্গে মূল লড়াইয়ে থাকবেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু। 

এম এ মালিকের অবস্থান ভালো থাকলেও মুসলেহ উদ্দিন রাজু তার বাবা ইসলামি পণ্ডিত মাওলানা নুরুদ্দিন গহরপুরীর পরিচয়ে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। রাজুর রিকশা প্রতীকে জোটের লোকজনও প্রচার চালাচ্ছেন। 

আর এই আসনে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন; তারাও ধানের শীষকে বিজয়ী করতে মাঠে নেমেছেন। 

এ ছাড়া এই আসনে বিএনপি প্রার্থীর বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ। সবশেষ জোটের সিদ্ধান্তে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। 

ভোটাররা বলছেন, বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী লোকমান আহমদ থাকলে নির্বাচনি লড়াই হত হাড্ডাহাড্ডি। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন। তবে মূল লড়াইয়ে থাকবেন রিকশা প্রতীকের মুসলেহ উদ্দিন রাজু।  

এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনওয়ারুল হক (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা (ফুটবল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর (কম্পিউটার)।

নির্বাচন উপলক্ষে সিলেট-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের মতবিনিময় সভা।  

নির্বাচন উপলক্ষে সিলেট-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের মতবিনিময় সভা।

‘মেয়র-চেয়ারম্যানের’ লড়াই

কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এখানে ধানের শীষের প্রার্থী। 

আর জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জয়নাল আবেদীন। আরিফ ও জয়নালের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

আরিফুল হক সিলেট-১ আসনে মনোনয়র প্রত্যাশী ছিলেন। আর জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন আরিফুল হককে ‘বহিরাগত’ বলে প্রচার চালাছেন। তবে সিলেট-৪ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন আরিফুল। 

এদিকে, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন। তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের দুই বারের সাবেক চেয়ারম্যান। এলাকায় তার শক্তিশালী অবস্থান রয়েছেন।

এই আসন থেকে জামায়াত কখনও নির্বাচিত হতে পারেনি। আর নির্বাচনের ‘ম্যাজিক ম্যান’ হিসেবে আরিফুলের খ্যাতি রয়েছে। তার সমর্থকদের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনে স্থানীয়, বহিরাগত কোনো বিষয় নয়। এখানে উন্নয়নই মূল লক্ষ্য।

নির্বাচনি প্রচারে সিলেট-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী

নির্বাচনি প্রচারে সিলেট-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী

এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (ট্রাক)।

‘ফুলতলী হুজুর ফ্যাক্টর’

দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মামুনুর রশিদ; যিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিত। ভোটের মাঠে তার ‘ফুটবল’ হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন কর্মী-সমর্থকরা।  

দলের শৃঙ্খলা না মানায় এরই মধ্যে তাকে সিলেট জেলা বিএনপির প্রথম সহসভাপতি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার সঙ্গে কাজ করছেন এমন আরও কয়েক নেতা বহিষ্কার হয়েছেন। 

বিএনপি এই আসনটি তার জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি খেজুর গাছ প্রতীকে লড়ছেন। ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপি জোট থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষে এখানে প্রার্থী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুল হাসান। তিনি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে লড়ছেন। 

তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে এসেছেন আরেক আলোচিত রাজনীতিক ‘চাকসু মামুন’। তার গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলা বিএনপির নেতারা ঘন ঘন জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সফর করছেন। জোট প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন।  

নির্বাচনি প্রচারে সিলেট-৬ আসনে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।

নির্বাচনি প্রচারে সিলেট-৬ আসনে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।

সবশেষ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন আব্দুল লতিফ চৌধুরী- ‘ফুলতলী হুজুরের’ ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী। এবার তিনি ভোটের মাঠে নেই। 

ভোটারদের অভিমত, এই আসনে ‘ফুলতলী হুজুরের’ ব্যাপক সমর্থক রয়েছেন। অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, ফুলতলী হুজুরের সংগঠন ‘আনজুমানে আল ইসলাহের’ ভোট যেদিকে গেছে সেদিকেই ভোটের বাতাস তৈরি হয়েছে। এই ‘ভোট ব্যাংক’ সবসময় জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখে। 

ভোটারদের ধারণা, ‘ফুলতলী মসলকের’ একটা বড় ভোট ‘চাকসু মামুনের’ বাক্সে যেতে পারে। সেটা হয়ত মামুনের ব্যক্তি ইমেজ, দলীয় একাংশের সমর্থনের সঙ্গে বাড়তি শক্তি দেবে।

এ আসনে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে এবং দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। 

‘বিদ্রোহে কুপোকাত’ বিএনপি

গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী।

তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। 

নির্বাচনি প্রচারের সময় সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক কুশিয়ারা নদীর ভাঙন পরিদর্শন করেন।

নির্বাচনি প্রচারের সময় সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক কুশিয়ারা নদীর ভাঙন পরিদর্শন করেন।

এ ছাড়া এই আসনে নিজস্ব ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মাওলানা ফখরুল ইসলামের। তিনি লড়াইয়ের ময়দানে জোরেশোরে ছুটছেন।

গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, এখানে বিএনপির মূল সমস্যা দলীয় বিভক্তি। ২০১৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ফয়সল আহমদ চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ডা. এনামুল হক চৌধুরী, বিএনপি নেত্রী সৈয়দা আদিবা হোসেন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

ভোটের মাঠে এরা কেউ হয়ত প্রকাশ্যে ‘বিদ্রোহী’ হননি। কিন্তু ধানের শীষের পক্ষে ভোটের প্রচারেও তাদের দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে এক ছাতার নিচে না আনতে পারলে এটাই বিএনপির সর্বনাশ করতে পারে বলে কর্মী-সমর্থকদের আশঙ্কা। 

বিশেষ করে ফয়সল আহমদ চৌধুরী বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ছিলেন। পরে দলের চূড়ান্ত টিকেট পান এমরান আহমদ চৌধুরী।  

জামায়াতে ইসলামীর দুই উপজেলাতেই শক্ত ভিত্তি রয়েছে। দলে কোনো কোন্দল নেই, সেটি সেলিম উদ্দিনকে সুবিধা দিচ্ছে। 

তবে কেউ কেউ এই আসনের এলাকাভিত্তিক ভোটের প্রভাবকে একেবারে নাকচ করে দিতে চান না। কারণ, জামায়াতের সেলিম উদ্দিন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী ফখরুল ইসলামের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলাতে।

সিলেট-৪ আসনে নির্বাচনি প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। 

সিলেট-৪ আসনে নির্বাচনি প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন।

এটা কাজে লাগলে বিএনপির প্রার্থী গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ভালো অবস্থানে থাকবেন বলেও মনে করছেন তার নেতাকর্মীরা। 

নেতারা যা বলছেন

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নেতাকর্মীরা এক হয়ে কাজ করছেন। আমাদের নির্বাচনি এলাকায় কিছু ছোটখাটো সমস্যা ছিল, সেটা আমরা সমাধান করেছি। যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“সিলেটের সব আসনে বিএনপি ও জোটের প্রার্থীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন। আশা করছি, সবকটি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সংসদে যাবেন।”

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর শাখার আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখতেছি, মানুষজন একটা পরিবর্তন চাচ্ছে, পুরাতন বন্দোবস্ত আর চাচ্ছে না। বিশেষ করে সমাজের তরুণ ভোটারদের একটা বড় আকাঙ্ক্ষা হল পুরাতন বন্দোবস্ত যেন আর ফিরে না আসে।”