২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

ফরিদপুর-৪: ‘বিএনপির পাশে আওয়ামী লীগ’, জামায়াত জোটে বিভক্তি

“নিক্সন চৌধুরী ও কাজী জাফর উল্যাহর আস্থাভাজনেরা বিএনপিতে ভিড়েছেন মূলত মামলা ও গ্রেপ্তার এড়াতে।”

ফরিদপুর-৪: ‘বিএনপির পাশে আওয়ামী লীগ’, জামায়াত জোটে বিভক্তি
বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুলের প্রচার ও গণসংযোগ।

বিডিনিউজ২৪

মফিজুর রহমান শিপন. ফরিদপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Feb 2026, 04:01 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:51 PM

আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফর উল্যা এবং যুবলীগ নেতা মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর বদৌলতে ফরিদপুরের সদরপুর, চরভদ্রাসন এবং ভাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ আসন এমনিতে সারাদেশে আলোচিত। 

দীর্ঘ সময় ধরে আসনটি মূলত এই দুই নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিক্সন চৌধুরীর এখান থেকে টানা তিনবার জয় পেয়েছেন। শুধু ২০০২ সালে উপনির্বাচনে একবার বিএনপির প্রার্থী জিতেছিল। 

তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আসনটির নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনের মাঠে ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে থাকা বিএনপি এখন সামনের সারিতে অবস্থান নিয়েছে। 

অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আসনটি উন্মুক্ত রেখেছে। ফলে এখানে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুদলের প্রার্থী রয়েছে।  

এখানে নানা সামাজিক ও সেবামূলক কাজ করে পরিচিতি পাওয়া একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এ এম মুজাহিদ বেগ ফুটবল প্রতীক নিয়ে মাঠে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছেন। তার সমর্থকরা তাকে নিয়ে ব্যাপকভাবে আশাবাদী।   

এই আসনে প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির শহিদুল ইসলাম বাবুল (ধানের শীষ), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মিজানুর রহমান মোল্যা (রিকশা) এবং জামায়াতে ইসলামীর মো. সরোয়ার হোসেন।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টির রায়হান জামিল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইসহাক চোকদার, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির আতাউর রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীক নিয়ে মুহাম্মদ মজিবুর হুসাইন লড়াই করছেন।

নির্বাচনি গণসংযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ। 

নির্বাচনি গণসংযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ।

আসনটির ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।   জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যেকোনো একজন সরে দাঁড়ালেও এই আসনে জোটের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। 

তবে, সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় রয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট এবং দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিএনপির প্রার্থীর প্রচারে সামিল হওয়ার খবর। যদিও এটা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি। 

এই আসনের বিএনপি প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল পাশের ফরিদপুর-২ আসনের নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি সদরপুর উপজেলায় অবস্থান করে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। 

স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে আলোচনা আছে- মনোনয়ন পাওয়ার পর শহিদুল আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকায় কৌশল পরিবর্তন করে দলে ভিড়িয়ে নিয়েছেন দলটির নেতা-কর্মীদের। এ কারণে তিনি ভালো অবস্থানে রয়েছেন।

সদরপুর উপজেলার ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন বলছিলেন, “বিগত দিনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী ও কাজী জাফর উল্যাহর আস্থাভাজনেরা বিএনপিতে ভিড়েছেন মূলত মামলা ও গ্রেপ্তার এড়াতে। প্রত্যেকে প্রকাশ্যে ধানের শীষের প্রচারে নেমে পড়েছেন। তাদের মধ্যে বেশি নিক্সন ও কাজী জাফর উল্যাহ-সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের নেতারা রয়েছেন।”

ভাঙ্গা গোলচত্বর এলাকায় চায়ের দোকান করেন খন্দকার জাহিদ। তার ভাষ্য, বিগত দিনে কাজী জাফর উল্যাহকে ভোট দিলেও এবার তিনি ধানের শীষে ভোট দেবেন।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিএনপি প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি বলছিলেন, “এখানে আট প্রার্থী রয়েছেন। তবে এই নির্বাচনের জন্য আমি যেভাবে লড়াই করেছি এবং যে পরিমাণ নিপীড়নের শিকার হয়েছি, অন্য কেউ তার ধারেকাছেও নেই। ১৭ বছরে আমি ১২৮ বার জেলে গিয়েছি, জুলুমের শিকার হয়েছি। নিজের জন্য না, দেশের মানুষের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য।”

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মিজানুর রহমান মোল্যা তার রিকশা প্রতীকে প্রচার চালাচ্ছেন। 

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মিজানুর রহমান মোল্যা তার রিকশা প্রতীকে প্রচার চালাচ্ছেন।

আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ চরভদ্রাসন উপজেলার বেগ পরিবারের সদস্য। দীর্ঘদিন যাবৎ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাসহ ক্রীড়া জগতে পরিচিতি রয়েছে পরিবারটির।

তিনি বলছিলেন, নির্বাচনের মাঠে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’থাকলে বিজয়ী হবেন। তিনি বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তিন উপজেলার ভোটারদের মধ্যে মামলা ও গ্রেপ্তারে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। 

“আমার নির্বাচনে সবচেয়ে কাছের লোকের নামেও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।”

রোববার সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি অভিযোগ করেন, “কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকিসহ অস্ত্র নিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা-মামলার ভয়, পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার, প্রচারে বাধা, ব্যানার-ফেস্টুন ছিড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে একটি বড় রাজনৈতিক দল।”

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসেনের গণসংযোগ।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসেনের গণসংযোগ।

এ ছাড়া অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা দলটিতে ভিড়ে নির্বাচনি মাঠে ভীতি ছড়াচ্ছেন। বিষয়গুলো নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন প্রার্থী।

তবে তিনি সেই রাজনৈতিক দলের নাম বলেননি। যাদের বিরুদ্ধে প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন, তারা বিএনপি নেতাকর্মী হলেও সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  

এই আসনে জোরেশোরে প্রচারে আছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মিজানুর রহমান মোল্যা। সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এই নেতাও ভোটের মাঠে পিছিয়ে নেই। তবে মূল বাধা হয়েছে জামায়াত জোটের অমীমাংসিত প্রার্থী নিয়ে। 

এসব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় নেতারা এ সমস্যাকে চূড়ান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আশা করি, আমাদের জোটের যেকোনো একজনকে রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।”

ফরিদপুর-৪ আসনে রয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজারের বেশি ভোটার।