নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে: তারেক রহমান
“যারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, যারা পরিকল্পনা করে রাখে যে ১২ তারিখের পর থেকে তারা জনগণকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে, তাদেরকে উচিত শিক্ষা আপনাদেরকে দিতে হবে।”
জামায়াতে ইসলামকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিষয়ে ভোটারদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “এই গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেম রূপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে।”
বুধবার দুপুরে বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক ময়দানে বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় তারেক রহমানের এমন বক্তব্য আসে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপি নেতা বলেন, “পাঁচই আগস্টের পরবর্তীতে আমরা আশা করেছিলাম যে স্বৈরাচার যারা জনগণের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা যেই ভাষায় কথা বলত জনগণকে, বিভিন্ন বাংলাদেশের সম্মানী গুণী মানী ব্যক্তিকে যেভাবে অপদস্থ করত, যেভাবে মানুষকে তারা ছোট করত, নিশ্চয়ই পাঁচই আগস্টে তাদের পালিয়ে যাবার পরে এই রীতি নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
“কিন্তু দুঃখের সাথে আমরা খেয়াল করলাম যে এই রীতি বন্ধ হয় নাই। একটি রাজনৈতিক দল, যাদের একটি অন্য পরিচয় আছে, জনগণ যাদেরকে একটি ভিন্ন পরিচয়ে চেনে, জনগণ তাদের কি পরিচয়ে চেনে? গুপ্ত পরিচয়ে চেনে, গুপ্ত পরিচয়ে।”
জনসভায় উপস্থিত নেতাকর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তারেক প্রশ্ন করেন– “আপনারা চেনেন কারা তারা? বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারা সেই গুপ্ত? চেনেন আপনারা?
এ সময় জনসভা থেকে সমস্বরে আওয়াজ ওঠে “জামায়াত।”
তারেক রহমান তখন বলেন, “প্রিয় ভাই বোনেরা, বর্তমানে বাংলাদেশে এক নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে।”
কেন তাদের জালেম বলা হচ্ছে, সেই ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের সমাজে, সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে নারীর অবদান তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আজ আমরা অত্যন্ত কষ্টের সাথে দেখছি, অত্যন্ত ঘৃণার সাথে দেখছি, এই যে নতুন জালেম, যাদেরকে মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে, এই জালেমদের নেতা, সে দুইদিন আগে প্রকাশ্যে বলেছে… বাংলাদেশের নারীদের জন্য সে একটি অত্যন্ত কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছে।
“দেশের মা-বোনদের প্রতি যে ব্যক্তি বা যেই দলের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই; দেশের মা-বোনদের কষ্টের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান নেই, তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক বাংলাদেশ কখনো অগ্রগতি আশা করতে পারে না। তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক বাংলাদেশের মানুষ সম্মানজনক কোনো মর্যাদা পূর্ণ আচরণ আশা করতে পারে না।”
মুসলমানদের মহানবীর (সা.) স্ত্রী বিবি খাদিজাও যে একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন, তিনি যে ব্যবসা করতেন, সে কথা তুলে ধরে তারেক বলেন, “এরা বলে ইসলামের রাজনীতি করে, অথচ নবীর স্ত্রী নিজে যেখানে একজন কর্মজীবী মহিলা ছিলেন, সেখানে কেমন করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কেমন করে সেই রাজনৈতিক দলটি তাবৎ বাংলাদেশের নারী সমাজকে এমন একটি কলঙ্কিত শব্দে জর্জরিত করল!”
জামায়াতের নায়েবে আমিরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “ওই যে গুপ্ত সংগঠনটির আরেকটি ঘটনা বলি। তাদের আরেক নেতা যার বাড়ি কিনা কুমিল্লা জেলায়। সেই নেতা কিছুদিন আগে তাদের এক দলীয় সমাবেশে বলেছে তাদের কর্মীদেরকে যে ‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন, তারপরে পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে’।
“এই কথা থেকে প্রমাণিত হয় কী তাদের মেন্টালিটি, কোন পর্যায়ের মানুষ হলে তারা জনগণকে নিয়ে এরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য কথা তারা বলতে পারে।”
তারেক রহমান বলেন, “এইসব লোক যদি নির্বাচিত হয়, এইসব লোক যদি দায়িত্ব পায়, তাহলে আজকেই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে জনগণের ভাগ্যের একটি দুর্বিষহ অবস্থা হবে, দেশের মানুষের ভাগ্যের কি দুর্বিষহ অবস্থা হবে।”
বরিশালের ভোটারদের উদ্দেশে তারেক বলেন, “এইসব গুপ্তদের বিরুদ্ধে আপনাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, সজাগ থাকতে হবে। যারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, যারা পরিকল্পনা করে রাখে যে ১২ তারিখের পর থেকে তারা জনগণকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে, তাদেরকে উচিত শিক্ষা আপনাদেরকে দিতে হবে।”
প্রতিশ্রুতি
তারেক রহমান বলেন, “দেশ যদি গড়তে হয় প্রতিটি নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে আজকে। তা না হলে এই দেশকে আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না
“সেইজন্যই আমরা নারীদেরকে, বিশেষ করে গ্রামের খেটে খাওয়া নারী যারা, শহরের খেটে খাওয়া নারী যারা, কর্মজীবী নারী যারা, সহ সকল গৃহিণীর কাছে, সকল পরিবারের মায়েদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যার মাধ্যমে আমরা এই নারীদেরকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারি। যেন তারা পুরুষের পাশাপাশি পরিবারে, সমাজে, দেশে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।”
১৯৯৩ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বরিশালকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার ছেলে তারেক বলেন, “আমরা এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজ করেছি। কিন্তু আরো বহু কাজ করা বাকি।”
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত হলে বরিশাল-ভোলা ব্রিজ নির্মাণ, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন, ভোলায় মেডিকেল কলেজ করা, নদী ভাঙ্গন সমস্যার সমাধানে বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
পাশাপাশি রাস্তাঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, কৃষকদের জন্য হিমাগার নির্মাণ, কৃষি কার্ড চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, ভোলার গ্যাস কাজে লাগিয়ে শিল্প গড়ে তোলার কথাও তিনি বলেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “এই সকল সমস্যার সমাধান বিএনপি তখনই করতে পারবে যখন আপনারা ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়যুক্ত করবেন।”
‘ভুয়া’ ব্যালেট পেপার, সিল ছাপানোর খবর প্রসঙ্গে
তারেক রহমান বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজে আমরা কিছু খবর দেখতে পাচ্ছি। ওই যে যারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, ওই যে যাদেরকে বাংলাদেশের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে, আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে, আমরা বিভিন্নভাবে শুনতে পাচ্ছি যে তাদের পরিচিত যেসব প্রেস আছে, সেখানে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে…যেটি তারা পকেটে করে নিয়ে হবে।
“শুধু তাই নয়, আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোন যারা আছেন, তাদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, তাদের কাছে গিয়ে তারা বিকাশ নম্বর নিচ্ছে।“
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “এই গুপ্তের দল, এই জালেমের দল বলে, তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। আরে ভাই, নির্বাচনের আগেই তো শুনলাম, আপনারা জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছেন, নির্বাচনের আগেই তো দেখলাম আপনাদের লোকজন এনআইডি নম্বর নিয়ে যাচ্ছেন মা-বোনদের কাছ থেকে, বিকাশ নম্বর নিয়ে যাচ্ছেন।
“প্রথমেই তো আপনারা অনৈতিক কাজ শুরু করছেন। অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক কাজ দিয়ে, তারা কি করে সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে?“
‘ভোট হাইজ্যাক করতে যেন না পারে’
তারেক রহমান বলেন, “মা বোনদেরকে অপমান করার পরে তারা বলছেন যে তারা এটা করে নাই। তাদের আইডি বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কথা অনুযায়ী, আইডি হ্যাক হয় নাই। যখন তারা ধরা পড়ে গিয়েছে, বিভিন্ন রকম মিথ্যা কথা তারা বলা শুরু করেছে। যারা একটি অপরাধকে ঢাকার জন্য মিথ্যা কথা বলে, আর যাই হোক তারা সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না।
“কাজেই এদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আপনাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। আজ এই মাঠে লক্ষ মানুষ যারা আছেন আপনারা স্ব স্ব এলাকায় ফিরে গিয়ে আপনার এলাকার যে সকল ভাই বোন আছে যারা ভোটার আছেন তাদের সকলকে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলবেন। যাতে করে ১২ তারিখে আপনার অধিকার অন্য কেউ হাইজ্যাক করে নিয়ে যেতে না পারে।”
বরিশাল মহানগর আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদারের সঞ্চালনায় এই সমাবেশে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ আসনে বিএনপি মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
তারা হলেন, জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ (বরিশাল-২), জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), মো. রাজিব আহসান (বরিশাল-৪), মো. মজিবর রহমান সরওয়ার (বরিশাল-৫), আবুল হোসেন খান (বরিশাল-৬); রফিকুল ইসলাম জামাল (ঝালকাঠি-১), ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো (ঝালকাঠি-২), মোঃ নজরুল ইসলাম মোল্লা (বরগুনা-১) মোঃ নূরুল ইসলাম (বরগুনা-২); আলতাফ হোসেন চৌধুরী (পটুয়াখালী-১), মো. সহিদুল আলম তালুকদার (পটুয়াখালী-২), মো. নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩), এ বি এম মোশাররফ হোসেন (পটুয়াখালী-৪) ; আলমগীর হোসেন (পিরোজপুর-১), আহম্মদ সোহেল মনজুর (পিরোজপুর-২), মোঃ রুহুল আমীন দুলাল (পিরোজপুর-৩) ; আন্দালিভ রহমান (ভোলা-১), মোঃ হাফিজ ইব্রাহিম (ভোলা-২), হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম (ভোলা-৩), মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম (ভোলা-৪)।
তাদের সবাইকে পাশে দাঁড় করিয়ে তারেক রহমান বলেন, “এই মানুষগুলোকে দিয়ে গেলাম আপনাদের কাছে আমি ধানের শীষে। ১২ তারিখ পর্যন্ত এদেরকে দেখে রাখবেন আপনারা, ১৩ তারিখ থেকে ইনশাআল্লাহ এরা আপনাদেরকে দেখে রাখবে।
“এরা আপনাদের পায়ে পড়ে থাকবে, এরা আপনাদের এলাকায় পড়ে থাকবে এলাকার উন্নয়নের জন্য।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নুরুল ইসলাম মনি, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিনওে জনসভায় বক্তব্য দেন।
ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে এসে বেলা ১২টায় বরিশালে নামেন তারেক রহমান। সেখানে থেকে মাঠে পৌঁছান ১২টা ২৬ মিনিটে। বক্তব্য শেষ করে তিনি হেলিকপ্টারে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি।
