২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

‘মানবিক বিচারক’ ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রিওর জীবনাবসান

“তিনি কেবল একজন বিচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিচারকের আসনে সমানুভূতির প্রতীক, যিনি দেখিয়েছেন মানবতা দিয়েও বিচার করা সম্ভব।”

‘মানবিক বিচারক’ ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রিওর জীবনাবসান
ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রিও

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Aug 2025, 01:01 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:37 PM

সহানুভূতিশীল বিচারক হিসেবে অনলাইনে খ্যাতি পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রিও মারা গেছেন।

‘কট ইন প্রভিডেন্স’ নামে রিয়েলিটি কোর্ট শোর উপস্থাপক ক্যাপ্রিওর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

বুধবার তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে তার সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে বলা হয়, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের সঙ্গে ‘দীর্ঘ ও সাহসী লড়াইয়ের’ পর ‘শান্তিতে পরলোকগমন’ করেছেন ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রিও।

সিএনএন লিখেছে, ক্যাপ্রিও তার আদালতকে এমন এক স্থান হিসেবে বর্ণনা করতেন, ‘যেখানে মানুষ ও মামলার সঙ্গে সদয় ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা হয়’। জরিমানা মওকুফ বা ন্যায়বিচার প্রশ্নে দয়াশীল হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।

গত সপ্তাহে ক্যাপ্রিও ফেইসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে তিনি স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার তথ্য দেন। ফের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা জানিয়ে সবাইকে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।

ক্যাপ্রিওর অনুষ্ঠানটি তার আদালতেকক্ষে ধারণ করা হত, যেখানে তার সহজ-সরল হাস্যরস ও সহানুভূতি ফুটে উঠতো। এ অনুষ্ঠানের ক্লিপগুলো সোশাল মিডিয়ায় ১ বিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়েছে।

বিচারক হিসেবে ক্যাপ্রিও এমন এক ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছিলেন, যা অনেকের চেয়ে আলাদা; তিনি অনেকের মত  আক্রমণাত্মক ছিলেন না, বরং ছিলেন সহানুভূতিশীল।

ইউটিউবে ছোট ছোট ভিডিওতে ক্যাপ্রিওকে প্রায়ই তার আদালতকক্ষে আসা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে দেখা যায়। টার্ন সিগন্যাল না দেওয়া থেকে শুরু করে জোরে পার্টি করার মত অপেক্ষাকৃত ছোট অভিযোগের ক্ষেত্রে তিনি কেবল সতর্ক করতেন।

বিচার ব্যবস্থায় যে সবার সমান প্রবেশাধিকার নেই, সেই বাস্তবতা তুলে ধরতেও নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছেন ক্যাপ্রিও।

ক্যাপ্রিও এক ভিডিওতে বলেছিলেন, “‘সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার’- বাক্যাংশটি এ ধারণা তৈরি করে যে- ন্যায়বিচার সবারই পাওয়ার কথা। কিন্তু আদতে তা নয়। প্রায় ৯০ শতাংশ নিম্ন-আয়ের আমেরিকানকে স্বাস্থ্যসেবা, অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ, ভেটেরান্স বেনিফিট, এমনকি ট্রাফিক লঙ্ঘনের মত নাগরিক বিষয়গুলোতে একা একাই লড়াই করতে হয়।”

বিচারকের দায়িত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্যাপ্রিওকে লাখ লাখ দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছিল। তার সেই সব ভিডিও সবচেয়ে জনপ্রিয়, যেগুলোতে তিনি বাচ্চাদের বিচারকের আসনে ডেকে তাদের বাবা-মায়ের বিচার করতে সাহায্য করতে বলেন।

এক ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যাপ্রিও মনোযোগ দিয়ে শুনছেন এক নারীর কথা, যার ছেলে হত্যার শিকার হয়েছে। শুনানি নিয়ে তার ৪০০ ডলারের জরিমানা বাতিল করেন বিচারক।

আরেক ক্লিপে দেখা যায়, ঘণ্টায় ৩ দশমিক ৮৪ ডলার আয় করা এক বারটেন্ডারের ট্রাফিক সিগনাল ভঙ্গের মামলা খারিজ করে দিয়ে ক্যাপ্রিও দর্শকদের বলেন, কেউ যাতে বিল না মিটিয়ে কখনো পালিয়ে না যান।

“কেউ এটা দেখে থাকলে- আমি চাই আপনি বুঝুন— খাবার খেয়ে বিল না দিয়ে পালিয়ে যাবেন না, কারণ ধরা পড়বেনই; আর যে গরিব মানুষ মাত্র তিন ডলার ঘণ্টা মজুরিতে কাজ করছে, তাদেরই আপনার বিল দিতে হবে।”

সোশাল মিডিয়ায় ক্যাপ্রিওকে একজন বিশ্বস্ত স্বামী, পিতা, দাদা, পিতামহ ও বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছে তার পরিবার।

“তার সহানুভূতি, বিনয় এবং মানুষের ভালোর প্রতি অটল বিশ্বাসের জন্য তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। আদালতকক্ষের ভেতরে ও বাইরে নিজের কাজের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি মানুষের জীবন স্পর্শ করেছেন। যারা তাকে চিনতেন, তাদের কাছে তার উষ্ণতা, হাস্যরস এবং সদয় আচরণ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

রাষ্ট্রীয় এবং স্থানীয় রাজনীতিকরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার জীবনকে উদযাপন করেছেন।

রোড আইল্যান্ডের গভর্নর ড্যান ম্যাকি বলেন, “জাজ ক্যাপ্রিও কেবল জনসেবা করেননি, তিনি অর্থপূর্ণ উপায়ে তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। উষ্ণতা ও সহানুভূতিশীল আচরণের কারণে সহজেই মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছিল।

“তিনি কেবল একজন বিচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিচারকের আসনে সমানুভূতির প্রতীক, যিনি দেখিয়েছেন মানবতা দিয়েও বিচার করা সম্ভব।”

ক্যাপ্রিওর সঙ্গে যৌথ মালিকানায় রেস্তোরাঁ চালু করা রবার্ট লিওনার্ড বলেন, “তাকে ভীষণভাবে মিস করব। তিনি ছিলেন সব মিলিয়ে অসাধারণ। সাধ্যে থাকলে কাউকে সহায়তা করতে পিছ পা হতেন না।”

ক্যাপ্রিও প্রায় চার দশক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে প্রভিডেন্স মিউনিসিপাল কোর্ট থেকে অবসরে যান।

তিনি বড় হয়েছেন রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্স শহরের ফেডারেল হিল এলাকায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে ক্যাপ্রিও বলেছিলেন, “আমি আশা করি মানুষ বুঝবে যে, সদয়, ন্যায়পরায়ণতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে চমৎকারভাবে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব। আমরা তীব্র বিভাজিত একটি সমাজে বাস করছি। আমি চাই মানুষ দেখুক যে, পীড়ন ছাড়াই ন্যায়বিচার দেওয়া সম্ভব।”