ইতিহাসগড়া এই সাফল্যই সাউথগেটের ‘সেরা অর্জন’
টানা চারটি বড় আসরে ইউরোপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল ইংল্যান্ড, কোচ গ্যারেথ সাউথগেট তৃপ্তি নিয়ে বললেন, ‘গত ৫০ বছরের মধ্যে সেরা কিছু রাত দেশের মানুষকে উপহার দিয়েছি আমরা’
ইউরোতে টানা দ্বিতীয় ফাইনাল। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার দেশের বাইরে ফাইনালে ওঠার কীর্তি। টানা চারটি বড় আসরে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা। গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ড দলকে নিয়ে প্রশ্ন যতই থাকুক, উত্তর লেখা আছে তাদের সাফল্যেই। এবারের সাফল্য তো যেন ছাড়িয়ে গেছে আগের সব কিছুকেই। ইংল্যান্ড কোচের চোখে এই অর্জনই সবচেয়ে ঝলমলে।
ইউরোর দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জিতেছে ইংল্যান্ড। ডর্টমুন্ডে বুধবার সপ্তম মিনিটে শাভি সিমন্সের গোল এগিয়ে দেয় ডাচদের। একটু পরই পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান হ্যারি কেইন। পরে বদলি নামা অলি ওয়াটকিন্স ম্যাচের শেষ সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে ফাইনালে তোলেন দলকে।
গত ইউরোতেও ফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে সেই ফাইনালে ইংলিশদের বেদনায় পুড়িয়ে টাইব্রেকারে জিতে যায় ইতালি।
এবার ফাইনালে উঠেই ইতিহাস গড়ে ফেলেছে এই দল। ইংল্যান্ডের সুদীর্ঘ ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার দেশের বাইরের আসরের ফাইনালে উঠতে পারল তারা। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তারা শিরোপা জিতেছিল দেশের মাঠে। গত ইউরোতে খেলা হয়েছে ১১টি দেশে। ইংল্যান্ড নিজেদের সব ম্যাচ খেলেছে লন্ডনে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামেই।
সাউথগেটের কোচিংয়ে বিশ্বকাপেও খুব খারাপ করেনি ইংল্যান্ড। ২০১৮ আসরে তারা সেমি-ফাইনালে খেলে, গত আসরে কোয়ার্টার-ফাইনালে।
বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে এই যে টানা চারটি বড় আসরের ধারাবাহিকতা, এমন সাফল্য নেই ইউরোপের আর কোনো দলের।
তবে সাউথগেট নিজে সবার ওপরে রাখছেন এবারের সাফল্যকে।
“আমার মনে হয়, এটিকেই সেরা বলতে হবে। আরেকটি দারুণ মাইলফলক এটি। তবে শুধু ফলাফলই নয়, যেভাবে আমরা খেলেছি, ম্যাচজুড়ে যেভাবে মেলে ধরেছি নিজেদের, দারুণ তা।”
“বিদেশের মাঠে প্রথমবার দলকে ফাইনালে তুলতে পারায় আমি দারুণভাবে গর্বিত।”
২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব নেন সাউথগেট। তার পর থেকে বড় আসরে দল ধারাবাহিকতা দেখালেও কৃতিত্ব কমই পেয়েছেন তিনি। বরং দলের খেলার ধরন নিয়ে প্রবল সমালোচনা তাকে শুনতে হয়েছে বেশির ভাগ সময়। এবারও ইউরোর শুরুতে দুই ম্যাচে দুয়ো দেওয়া হয়েছে তাকে। সংবাদমাধ্যমে তাকে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে। সেই তিনিই দলকে এনে দিলেন অনন্য সাফল্য।
ফাইনালে ওঠার পর নিজের অভিমানের প্রকাশও একটু মিশে থাকল তার প্রতিক্রিয়ায়।
“আমাদের সবারই ভালো লাগে ভালোবাসা পেতে, ঠিক না? যখন কেউ দেশের জন্য কিছু করতে থাকে, যখন কেউ গর্বিত একজন ইংলিশ… তার জন্য ওরকম সমালোচনা হজম করা কঠিন।”
তবে সবাই তো আর সমালোচক নন! এই দলের সমর্থক-অনুসারীও আছেন প্রচুর। বিশেষ করে, দেশের বাইরে গিয়ে দলকে অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়ে যান যারা, তাদের প্রতি আলাদা করেই কৃতজ্ঞতা জানালেন কোচ।
“টানা দ্বিতীয় ফাইনালে ওঠা এবং উপভোগ করতে পারা সত্যিই খুবই, খুবই স্পেশাল। বিশেষ করে সফরে আসা সমর্থকদের জন্য। ইংল্যান্ডের এই সমর্থকরা অসাধারণ… যে পরিমাণ পয়সা তারা খরচ করছে, যতটা নিবেদন তাদের, তাদেরকে এই ধরনের একটি রাত উপহার দিতে পারা দারুণ তৃপ্তির।”
“ছয় বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বেশ কিছু এমন রাত তাদেরকে দিতে পেরেছি আমরা। দেশের মানুষকে অসাধারণ কিছু রাত আমরা উপহার দিয়েছি, গত ৫০ বছরের সেরা কিছু রাত।’
সাউথগেটের মতে, এই দলের বড় শক্তি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারা। সেমি-ফাইনালে হ্যারি কেইনের বদলি হিসেবে মাঠে নেমে শেষ সময়ে নায়ক হয়ে ওঠা ওয়াটকিন্সকে দিয়েই উদাহরণটা দিলেন তিনি।
“আধুনিক ইংল্যান্ড দলের পথরেখাই ফুটে ওঠে এতে। পাশাপাশি দলটির সহনশীলতা ও মানসিকতাও স্পষ্ট বোঝা যায়। অলি ওয়াটকিন্সকেই দেখুন, (নিয়মিত খেলার সুযোগ না পেয়ে) যত হতাশাই তার থাকুক না কেন, সে একইভাবে অনুশীলন করে গেছে দিনের পর দিন।”
“পরস্পরের পাশে থাকে এই দল, ওদের বন্ধনটা এত ভালো… আজকে রাত আরেকবার সেটির প্রমাণ মিলেছে।”
বিদেশের মাঠে প্রথমবার ফাইনালে ওঠার ইতিহাস তো গড়া হলো। এবার প্রথম ইউরো জয়ের স্বাদ কেন মিলবে না! সাউথগেট অবশ্য ভীষণ সর্তক। প্রতিপক্ষ যে স্পেন!
এবারের আসরে দুর্দান্ত ফুটবলের প্রদর্শনীতে সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছে স্প্যানিশরা। রোববারও তারা মাঠে নামবে ফেভারিট হিসেবেই। প্রতিপক্ষকে সেই সমীহ দেখাচ্ছেন সাউথগেটও। তবে নিজেদের স্বপ্নের কথাও তিনি জানিয়ে রাখলেন।
“প্রথমে যেটা করতে হবে, ওদেরকে (স্পেন) বেশি বল পেতে দেওয়া যাবে না। যেভাবে বলছি, কাজটা এতটা সহজ নয় যে আমরা বল পায়ে রাখব, আর ওরা শুধু ছুটোছুটি করবে। বল পায়ে এবং বল ছাড়া, দুইভাবেই আমাদেরকে অসাধারণ খেলতে হবে। ওরা আসরের সেরা দল।”
“আমরা এখনও পর্যন্ত যা করেছি, সেসব দিয়েই এই পর্যায়ে এসেছি। এখন নিজেদের শ্রেয়তর সংস্করণটা মেলে ধরতে শুরু করেছি। ওদের মতো আমাদেরও ভালো সম্ভাবনা আছে। আমরা এখানে এসেছি (শিরোপা) জয়ের জন্য। কাজটা অনেক কঠিন। কিন্তু আমরা এখনও আছি এবং লড়াই করছি।”
