প্রতিজ্ঞা পূরণের পর এবার শেষের গর্বের আশায় ইংল্যান্ডের নতুন নায়ক
সেমি-ফাইনালে শেষ সময়ে গোল করে দলকে ফাইনালে তোলা ওয়াটকিন্স এখন শিরোপার গৌরব এনে দিতে চান দেশকে।
‘রাতারাতি নায়ক’ বুঝি একেই বলে। সংবাদমাধ্যম, ফুটবল অনুসারীদের থেকে শুরু করে গোটা ইংল্যান্ডে এখন তুমুল আগ্রহের কেন্দ্রে অলি ওয়াটকিন্স। তিনি নিজেও যেন উড়ছেন স্বপ্নডানায়। তবে দ্রুতই যে বাস্তবতার জমিনে ফিরে আসতে হবে, সেটাও তার জানা। সবচেয়ে বড় ম্যাচ তো এখনও বাকি। সেই ম্যাচ জিতে গোটা দেশকে গৌরবের উপলক্ষ এনে দিতে চান এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড।
এমনিতে ইংলিশ ফুটবলে মোটামুটি পরিচিতই ছিলেন ওয়াটকিন্স। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে আট বছরের ক্যারিয়ারে নজরকাড়া কিছু পারফরম্যান্স তার আছে। ইংল্যান্ডের জার্সিতেও গোল করেছেন আগে। তবে বড় মঞ্চে গোল এবারই প্রথম। ২০২০ ইউরো কিংবা ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি দলে জায়গা পাননি। এবার স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ খুব একটা পাচ্ছিলেন না। অবশেষে মোক্ষম সময়েই তা কাজ লাগালেন।
গোলের ধরন, ম্যাচের সময় ও পরিস্থিতি, সব মিলিয়েই গোলটি অবিস্মরণীয়। সেমি-ফাইনালের একদম শেষ সময়ে তার ওই দুর্দান্ত গোলই ফাইনালে তুলেছে ইংল্যান্ডকে। এখন তাই তিনি গোটা দেশের নায়ক।
ম্যাচের পর চমকপ্রদ একটি গল্প শুনিয়েছিলেন ওয়াটকিন্স। ‘প্রাণের কসম’ কেটে তিনি জানান, সতীর্থ কোল পালমারকে আগেই বলেছিলেন যে, তার পাস থেকেই গোল করবেন তিনি। ম্যাচের ৯০তম মিনিটে পালমারের পাস থেকেই গোলটি করেন ওয়াটকিন্স।
ইংল্যান্ড দলের নিজস্ব শো ‘লায়নস ডেন’-এ পালমারও এবার জানালেন, সেটি স্রেফ গল্প নয়।
“মাঝবিরতিতে আমরা একসঙ্গে খেলছিলাম… পরস্পরকে স্রেফ পাস দিচ্ছিলাম আর কী.. তখন সে (ওয়াটকিন্স) বলল, ‘আজকে আমরা মাঠে নামব, তুমি আমাকে বল বানিয়ে দেবে, আমি গোল করব…” এবং সত্যিই যখন সেটা হলো, পুরো পাগলাটে ব্যাপার ছিল।”
এই প্রত্যাশার পাশাপাশি আরও একটি প্রতিজ্ঞাও ছিল ওয়াটকিন্সের। দলের তৃতীয় গোলকিপার ডিন হেন্ডারসন ও সেন্টার-ব্যাক লুইস ডাঙ্ককে তিনি কথা দিয়েছিলেন, গোল করতে পারলে তাদেরকে নিয়ে উদযাপন করবেন। ওই দুজনের কেউই গোটা আসরে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামতে পারেননি। সুযোগের অপেক্ষায় লম্বা সময় বাইরে থাকতে হয়েছে ওয়াটকিন্সকেও। তাই মনোবেদনার ব্যাপারটা তিনি বোঝেন। ঠিকই গোল করে ওই দুজনের সঙ্গেই উদযাপন করেছেন তিনি। সেই গল্পও শোনালেন ওয়াটকিন্স।
“ডিনো ও ডাঙ্কির কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, গোল করলে ওদের দিকে ছুটে গিয়ে ওদেরকে নিয়ে উদযাপন করব। যারা মাঠে নেমে অবদান রাখার সুযোগ পায় না, কখনও কখনও নিজেদেরকে একটু আড়ালের মনে হতে পারে তাদের। এজন্যই ওদের সঙ্গে উদযাপন করেছি।”
“আমার নিজেরও তো বাইরে বসে থাকার অভিজ্ঞতা কম হয়নি। সবাইকে তাই স্পেশাল অনুভব করাতে চেয়েছি। এটা দারুণ লেগেছে যে ওরা সবাই লাফিয়ে মাঠে ছুটে এসেছে এবং উদযাপনের অংশ হয়েছে।”
ওয়াটকিন্স মাঠে নামার ঠিক আগে, ৭৯তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে বল জালে পাঠিয়েছিলেন বুকায়ো সাকা। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোল হয়নি। ওই গোলটি হয়ে গেলে নিশ্চিতভাবেই মাঠে নামানো হতো না ওয়াটকিন্সকে। গোল না হওয়ায় খেলার চিত্র বদলাতে এরপরই একসঙ্গে ওয়াটকিন্স ও পালমারকে মাঠে নামান কোচ গ্যারেথ সাউথগেট।
পেছন ফিরে তাকিয়ে ওয়াটকিন্স এখন বলছেন, সাকার গোল না হওয়াটাই তার জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছে।
“অবশ্যই, একদিক থেকে সেটা আশীর্বাদই ছিল… আমরা সুযোগ পেয়ে যাই পার্থক্য গড়ার। মাঠে নামার সময় ম্যানেজার (সাউথগেট) বলেছিলেন, ‘যাও এবং আমাদেরকে জিতিয়ে দাও’ এবং আমরা সেটা করতে পেরেছি।”
ওয়াটকিন্স মাঠে নামার পর খেলার বাকি ছিল আর মিনিট দশেক। তবে এই সময়েই দারুণ কিছু করার বিশ্বাসটা ছিল অ্যাস্টন ভিলার ২৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডের।
“এই বিশ্বাসটা নিজের ভেতরে থাকতে হবে যে, যখনই মাঠে নামি, দলে কিছু যোগ করতে হবে, প্রাণশক্তি বয়ে আনতে হবে। আমি যখন বলটি সেখানে পেলাম, জানতাম যে এখন স্বার্থপর হতে হবে এবং শট নিতে হবে। কারণ আরেকটি সুযোগ নাও পেতে পারি…।”
ইংল্যান্ডের জয়ের নায়ক কৃতিত্ব দিচ্ছেন কোচকেও। শুধু এই ম্যাচের কারণেই নয়, বছরের পর বছর ধরে যেভাবে গোটা দলকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছেন সাউথগেট, সেটির প্রতিফলনই মাঠে পড়ছে বলে মনে করেন ওয়াটকিন্স।
“ফুটবলারদের যে বন্ধন, এই একতা, এসব তৈরি করেছে সে। আমাদের দুজনের (ওয়াটকিন্স ও পালমার) এটা প্রথম বড় আসর এবং এসেই দেখতে পাচ্ছি, ছেলেরা পরস্পরের কতটা ঘনিষ্ঠ। আমাদের ভালো অনুভব করাতে এবং ম্যাচের জন্য তৈরি করতে কত সময় যে ব্যয় করেন তিনি!”
এই উচ্ছ্বাস, অভিনন্দন, ভালোবাসার যে জোয়ার, তাতে এখনই ভেসে যেতে চান না ওয়াটকিন্স। রোববার ফাইনালের লড়াইয়ে নামতে হবে টুর্নামেন্টের এখনও পর্যন্ত সেরা দল স্পেনের বিপক্ষে। এত কাছে এসে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সুযোগ তারা হারাতে চান না। সমর্থকদের পাশে চান আর একটি ম্যাচের জন্য।
“অবশ্যই খুব দ্রুত মনোযোগ ফেরাতে হবে খেলায় এবং আমাদের জন্য এটা বিশাল সুযোগ নিজেদেরকে, পরিবারকে এবং সবাইকে গর্বিত করার। আমরা সবাই সেটি করার চেষ্টা করব।”
“আপনারা আমাদের সমর্থন করে যান। স্রেফ আর একটি ম্যাচ… আপনাদের সমর্থন অলক্ষিত থাকে না। ছেলেরা সবাই এসব ভিডিও দেখে।”
