নজর কাড়ছে হেলালের ৫৭ প্রজাতির ভিনদেশি আম
এসব জাতের আম চাষ করে বেকারত্ব দূর করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে, বলেন বাগান মালিক।
চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদীতীরে পরিত্যক্ত ইট ভাটায় লাগানো গাছে শোভা পাচ্ছে ভিনদেশি অর্ধশতাধিক প্রজাতির আম।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থী এসব নজর কাড়া আম দেখতে এখানে ছুটে আসছেন।
মাত্র পাঁচ বছর আগে চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহতলী এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ধরে রাসায়নিক ও বিষমুক্ত বিদেশি ফলের চাষ শুরু করেন কৃষি উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন।
এখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রো’ নামে একটি বাগান। তার বাগানে দেশি-বিদেশি ফলের গাছ আছে। এর মধ্যে শুধু আমই আছে ৫৭ জাতের।বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে দুলছে ভিনদেশি নানা প্রজাতির আম।
থোকায় থোকায় ঝুলছে হালকা খয়েরি, হালকা কাঁচা হলুদ, লাল-হলুদ ও সবুজ রঙের আম। আম গাছকে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন শ্রমিকরা।
উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় ও উচ্চ ফলনশীল আমের দেখা মিলছে তার এই বাগানে। এখানে ৫৭ জাতের যে আম রয়েছে তা ইউরোপ, আমেরিকান, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা। ভিনদেশি এসব আম ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা প্রতি কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই আম চাষ করছেন বলে দাবি তার।
তিনি জানান, তার বাগানে বিদেশি ৫৭ জাতের আমের মধ্যে রয়েছে- ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, লেমনজেস্ট, বেইলি মার্বেল, রোসারোসা, সানসেট, আতাউল্ফ, কারাবাও, আলফানসো, গ্লেইন, হাডেন, মায়া, সেনসেশন, অস্টিন, অস্টিন গোল্ড, আর-টু ই-টু, ক্যাংসিংটন প্রাইড, ঝিইল, টমি অ্যাটকিনস, রেড আইভরি, কিং অব চাকাপাত, মিয়াজাকি, জাম্বো রেড চাকাপাত, ব্ল্যাকস্টোন, থ্রিটেস্ট, কেন্ট, কেইট, পালমার (ফ্লোরিডা), চিলি ম্যাঙ্গো, কেসার, পোষা আম্বিকা, পোষা অরুনিমা, পোষা সুরাইয়া, মল্লিকা, তোতাপুরি, হানিডিউ, নামডকমাই, নামডকমাই সিমওয়াং, গোল্ডেন নামডকমাই, আপেল ম্যাঙ্গো, মহাচানক, চিলতাখাস, ক্যারিই, ওকরংথন (চায়নিজ), এসআর ম্যাংগো, কাটিমন, হানিডিউ, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ফ্রাংসিস, থাই কাঁচামিঠা, বারি-৪, গৌরমতি ইত্যাদি।হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমের মধ্যে ২০ ধরনের আম এই বাগানে রয়েছে। গত বছর ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রো থেকে ৪৭ জাতের আম প্রায় ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। এবার আরও ১০ জাতের আমের পরীক্ষামূলক চাষাবাদ বাড়িয়ে মোট ৫৭ জাতের আম এখানে উৎপাদন করে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ৮ লাখ টাকা।সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পরীক্ষামূলকভাবে এসব আমের চাষ করছেন বলে দাবি এই কৃষি উদ্যোক্তার।
হেলাল উদ্দিনের দাবি, ভিনদেশি এই আম দেশের মাটিতেও চাষ উপযোগী। বেকার যুবকেরা সুস্বাদু এই আমের চাষ করে নিজেদের বেকারত্ব দূর করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
এই উদ্যোক্তা বলেন, এসব আম নিয়ে নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা কাজ করে লাভবান হন। এখানে ৫৭ জাতের যে আম রয়েছে তা বিভিন্ন ক্লাইমেট থেকে নেওয়া। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, এশিয়ানসহ বিভিন্ন ওয়েদার থেকে সংগ্রহ করা। এগুলোকে দেশের আবহাওয়া উপযোগী করে ফলনের চেষ্টা করি।
তিনি বলেন, “আমরা বছরে ৬-৭ মাস আমের ফলন যদি ধরে রাখতে পারি তাহলে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। মৌসুম ছাড়া আমের দাম বেশি থাকে। আমার এখানে ৩০০-১০০০ টাকা করে প্রতি কেজি আম বিক্রি করি। বাগান থেকেই ক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। আমি মনে করি, এগুলো দেশের জন্য সম্ভাবনার উচ্চ ফলনশীল আম।”
তার আম বাগানে কোনো প্রকার রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না দাবি করে তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করি, বিষমুক্ত ফল চাষ করতে। যার কারণে আমের মধ্যে দাগ পড়ে গেছে। যদি কড়াভাবে কীটনাশক ব্যবহার করতাম, তাহলে এ দাগ পড়ত না।”
রঙ-বেরঙের ভিনদেশি আম দেখতে প্রতিদিন এখানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। এসব আম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জেনে বাগান করার পরিকল্পনার কথাও জানালেন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকজন।
হেলাল উদ্দিনের আম বাগান দেখতে আসা আবুল কালাম বলেন, “আমি এখানে ঘুরতে এসেছি। এসে এখানকার আম খেয়েছি। খুবই সুস্বাদু।”
জাকির হোসেন নামে ঘুরতে আসা আরেক ব্যক্তি বলেন, “ফেইসবুকের মাধ্যমে জানতে পারি, শাহতলী ‘ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রোতে’ অনেক বিদেশি জাতের আম আছে। প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি। এখানে এসে নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস করলাম। আমি নিজে এ ধরনের একটি আমের বাগান করার চিন্তা করছি।”
বাগানের কর্মচারী নাজমুল বলেন, “আমি এখানে দীর্ঘ চার বছর ধরে কাজ করি। আমগুলো দেখে আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। আমরা আম গাছের পরিচর্যা করি। গাছগুলোতে কোনো রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না।”
আরেক কর্মচারী বাপ্পি বলেন, “আমাদের এখানে অনেক দামি বিদেশি আমগাছ আছে। প্রতিদিন বিকালে অনেক লোকজন এখানে ঘুরতে আসে। তারা বিভিন্ন জাতের আম কিনে নেয়।”
চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, “হেলাল উদ্দিন পরিত্যক্ত ইটভাটায় ‘ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রো’ নামে একটি বাগান তৈরি করেছেন। তার এখানে দেশি-বিদেশি ফলের গাছ আছে। এর মধ্যে শুধু আমই আছে ৫৭ জাতের। আশা করি, তিনি নতুন নতুন প্রজাতির চারা ও ফল মাঠ পর্যায়ে চাষিদের কাছে পৌঁছে দেবেন।”
বিদেশি আম সর্ম্পকে তিনি বলেন, “আমের জাতগুলো ভালো এবং উৎপাদনশীল। এসব জাত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চাষিদের মাঝে সম্প্রসারণ করা হবে।”
