‘অন্ধকার’ থেকে আলোর পথে ৫ নারীর ‘স্বপ্নবুনন’
“এখন অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছি, যেখানে একটু শান্তিতে আছি।”
ফাল্গুনের রোদ পড়ছে ময়মনসিংহ নগরীর আর কে মিশন রোডে; সেখানকার একটি ছোট কর্মসংস্থান কেন্দ্রে তখন ব্যস্ততার সুর।
ভেতরে কয়েকজন কিশোরী ও তরুণী কাপড় বুনছেন; রোদের ঝিলিকের চেয়েও তাদের চোখে-মুখে যেন আত্মবিশ্বাসের আভা বেশি। এই তরুণীদের বুনন কেবল সুতো আর কাপড়ের নয়; এ যেন এক ‘অন্ধকার অতীত’ মুছে নতুন করে বেঁচে থাকার ‘স্বপ্নবুনন’।
অভাবের তাড়নায় পথ হারিয়ে পাচারের শিকার হওয়া কিংবা চরম ঝুঁকিতে থাকা পাঁচ নারীর জীবনে ফিরছে স্বস্তি। এসব নারীদের জীবন এক সময় ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের পর থেকে ‘স্বপ্নবুনন’ তাদের দিয়েছে নতুন পরিচয়।
রোববার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেউ নিপুণ হাতে সেলাই করছেন। কেউ কাপড়ে ব্লক-বাটিকের নকশা তুলতে ব্যস্ত। কেউ আবার ব্যস্ত গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করায়।
মূলত ‘শিশু যৌন পাচার ও বাণিজ্যিক যৌন শোষণ নিরসনকল্পে’ এই বিশেষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রবেশন কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়।
এর পুরো নাম ‘স্বপ্নবুনন ফ্যাশন অ্যান্ড টেইলার্স’, যাদের কাজ স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। অবহেলিত ওই কিশোরী ও তরুনীদের দক্ষ করে তুলতে এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ‘শাপলা মহিলা সংস্থা’ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে।
‘স্বপ্নবুনন’ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নাহরিন সুলতানা নীলা বলছিলেন, যৌনপল্লী ও তৎসংলগ্ন এলাকার শিশু ও মায়েদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
“ময়মনসিংহের সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক মফিদুল আলমের নির্দেশনায় ‘শাপলা মহিলা সংস্থার’ সমন্বিত পরিকল্পনায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এক সময়ের দিশেহারা এই পাঁচ কিশোরী এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলছেন।”
উদ্বোধনের পর থেকেই স্থানীয়দের মাঝে ‘স্বপ্নবুনন’ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখানে ন্যায্য মূল্যে টেইলারিং সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্লক-বাটিক ও এ্যামব্রয়ডারি পোশাক, কসমেটিকস ও নারীদের সামগ্রী, লন্ড্রি ও রিপু করার সুবিধা, নিত্যপণ্য, শিশু সামগ্রী ও খাবার মিলছে এখানে।
‘স্বপ্নবুনন’ উদ্যোগের সুফল পাওয়া পাঁচ তরুণীর মধ্যে দুজনের বয়স এখনও ১৮ বছরের নিচে। বাকি তিনজনের বয়স ২০ এর কোঠায়; যাদের মধ্যে একজন বিবাহিত। তাদের সবার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়।
অভাবের তাড়নায় দিশেহারা এক তরুণী তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “পরিবারে অনেক অস্বচ্ছলতা ছিল। বাইরে বের হলে পুরুষরা অন্য নজরে তাকাত, সারাক্ষণ বিরক্ত করত।
“কখনো টাকার লোভ, আবার কখনো দেশে বা বিদেশে ভালো কাজের প্রলোভন দেখানো হত। এক সময় মনে হত এসব প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়ে ওঠেনি। এখন অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছি, যেখানে একটু শান্তিতে আছি।”
আরেক তরুণীর জীবন-সংগ্রামও প্রায় একই রকম। পেটের দায়ে তাকে রাত-বিরাতে অন্যের বাসায় কাজে যেতে হত।
তিনি তার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “পরিবার দরিদ্র হওয়ায় রাতেও কাজ করতে হত। সেই সময়গুলোয় খুব ভয় লাগত, মানুষ অনেক আজেবাজে কথা বলত।
“আসলে মেয়েদের জীবনটা অনেক কষ্টের। সবকিছু গুছিয়ে সুন্দর করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা আমাদের জন্য অনেক কঠিন।”
অভাব, সামাজিক লাঞ্ছনা আর লালসার শিকার হওয়া পাঁচ তরুণীর জীবনে এখন লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তারা এখন দেখছে এক সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। তাদেরই একজন এখন নতুন জীবন নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বদলে যাওয়া জীবনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ওই তরুণী বলেন, “অন্ধকার জীবন থেকে বের হওয়া এক সময় কল্পনার মত ছিল। এখন সব বাস্তব মনে হচ্ছে। জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ পেয়ে আমরা কৃতজ্ঞ।”
পরিবর্তনের ছোঁয়ায় পাল্টে যাওয়া জীবন নিয়ে আরেকজন বলেন, “স্বপ্নবুননে প্রতিদিন বিক্রি বাড়ছে এবং মানুষ তাদের কাজকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।”
‘স্বপ্নবুনন’ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নাহরিন সুলতানা নীলা জানান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে গ্রহণ করা হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। কেবল প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়নি, বরং তাদের কাজের সুবিধার জন্য বাজেট বরাদ্দ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়েছে।
বর্তমান জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান এই উদ্যোগকে ‘মহতী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে এই কিশোরী ও তরুণীরা সফল হবেই। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে প্রশাসন পাশে থাকবে।”
জেলা প্রবেশন অফিসার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “যৌন ঝুঁকি বা পাচারের ঝুঁকিতে থাকা এমন পাঁচ তরুণী ও কিশোরীর সন্ধান করে শাপলা মহিলা সংস্থা, সৌরভ নারী কল্যাণ সংঘ এবং আলোকিত শিশু প্রকল্প।
“পরে ওই নারীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, পরিবারের অস্বচ্ছলতার কারণে তারা সে পথ বেছে নিতে পারে। তারপর তাদের দুই মাস প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
এর মধ্যে প্রবেশন অফিস ৫০ হাজার, জেলা সমাজ কল্যাণ পরিষদ ৫০ হাজার এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় বলে জানান তিনি।
