নিস্পৃহ ভোটার, নিরুত্তাপ নির্বাচন: আসলে কী বলছে?
ঢাকার মেয়র ইলেকশনে আসলে কত শতাংশ ভোট পড়েছে? সরকারী বেসরকারী হিসেবে আমরা এটা নিশ্চিত যে সত্তর ভাগ মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাননি। এই যে কেন্দ্র বা ভোট বিমুখিতা এর জন্য দায়ী কারা? আসলে কি ভোটাররা দায়ী? মিডিয়ায় দেখছি তাত্ত্বিক নামে পরিচিত বুদ্ধিজীবীরা একতরফা লেখাগুলো লিখেই চলেছেন। তাদের কথা পড়লে বা শুনলে আহমদ ছফার সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে- বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের উন্নতি হবে না। আমরা কি কিছু বলা বা সত্য বলার মানে এই যে আমরা শেখ হাসিনা বিরোধী? কে না জানে তার কোনও বিকল্প নেই। তিনি না থাকলে আমাদের জাতির অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি পড়বে। প্রগতিশীল মানুষজন হয়তো থাকতেই পারবেন না দেশে। কিন্তু ক্রমাগত যে জনবিচ্ছিন্নতা তার প্রতি মনযোগ না দিলে আখেরে কী হতে পারে সে আশংকাই আমাদের মনকে ভয়ার্ত করে তোলে। সুবিধাবাদী বা সুযোগভোগীরা সারা জীবনে এসব মানেননি বোঝেনও না।
ভোট সুষ্ঠু হলে কী ফলাফল হতো সেটা দেখার ইচ্ছে মরে গেছে মানুষের। কারণ তারা ইতোমধ্যে জেনে গেছে এদেশে ইলেকশান মানে হয় একতরফা, নয় কারচুপি, নয়তো রাতের ভোট। গণতন্ত্রের নামে মুখে ফেনা তোলা মানুষরা এটা জেনেও কুলুপ এঁটে থাকেন। মেয়র পদের কথা বাদ দিলাম। দেখুন একেক জন ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থীর কী ফরিয়াদ! তিনি আবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী!
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের ফলাফল জালিয়াতি করে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীকে পরাজিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেন, এই অনিয়মে নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত। তারা দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টারকে অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। অর্থের বিনিময়ে পরাজিত প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে আর বিজয়ী প্রার্থীকে পরাজিত দেখানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ফল জালিয়াতির বিষয় প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা দক্ষিণের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ফলাফল স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
ফল জালিয়াতি করে ভোটে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগসমর্থিত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রে তার প্রাপ্ত ৪৪৯টি ভোট যোগ না করে বরং সেই ভোট তৃতীয় অন্য এক প্রার্থীর হিসেবে যোগ করে তাকে পরাজিত দেখানো হয়েছে।
কী বোঝা গেলো? সব বিষয়ে কোথাও শর্সের মধ্যে ভুত। মানুষ এখন সারাবিশ্বে রাজনীতি বিমুখ। এর কারণ কি আমাদের তা অজানা না। যখন থেকে মিডিয়া মানুষের হাতে হাতে ঘরে ঘরে উন্মুক্ত সব চ্যানেল মোবাইল কম্পিউটার বা অন্য মাধ্যম তখন থেকে জনসভার প্রয়োজন গেছে ফুরিয়ে। পয়সা খরচ করে মিথ্যা শোনার জন্য কেন যাবেন মানুষ? আর নেতারা যা বলেন বা প্রতিশ্রুতি দেন তার নব্বই ভাগই মূলত মনগড়া। মানুষ জানে এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে জঘন্য সব কথা কথা বলবে। আনবে নানা ধরনের অভিযোগ। আগে আমরা এগুলো বিশ্বাস করতাম, করতে বাধ্য হতাম। কিন্তু মিডিয়া যখন মুঠোবন্দি তখন সত্য প্রকাশে লাগে কয়েক মিনিট। এরপর আছে মানুষের ভিডিও ধারণের সুযোগ। আর পায় কে? টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কোথায় কী ঘটছে সব এক মিনিটে হাজির। তাই নেতারা এখন অফিস বা কার্যালয় বন্দি। তিনি আওয়ামী লীগের প্রগলভ কেউ বা বিএনপির মুখ খিঁচানো রিজভি যেই হোন না কেন কথা এক রকমই- যত দোষ নন্দ ঘোষের।
আর একটা মজার বিষয় দেখলাম, বিএনপি কেন হরতাল ডেকেছিল সেটা নিয়ে আহাজারী। আরে বাবা হরতাল তো সফল হয় নি! তো মৃত শিশুর জন্য আপনারা কাঁদেন কেন? এটা মানি বিএনপির পিঠ দেয়ালে ঠেকা। তারা এই হরতাল ছাড়া আর কী উপহার দিতে পারে মানুষকে? সে রাজনীতি তাদের নাইও। তাদের দল-বল, মনোবল কোনটা নাই। এমন দল সেই পুরানো অকেজো হাতিয়ার হরতাল ছাড়া আর কী ডাকতে পারে? কিন্তু আমরা যে বলছি, তারা বদলায়নি। আওয়ামী লীগ বা আমরা কি বদলেছি? বদলালে ভোটে ভয় কেন? সব দল সব ধরনের মানুষ জানে এখন নির্বাচনের নামে কী হয়, কেন হয়। যেটা বিশ্বাস করি মূলত একতরফা বিষয় আর একমুখিনতা ধীরে ধীরে বুদ্ধিকে গ্রাস করে মানুষের মেধাকে ভোঁতা করে দেয়। তখন আর তার কোন মুখ-চোখ-কান থাকে না, থাকে শুধু লেজ। আর সে লেজ নাড়াকেই আমরা বলি সমর্থন।
বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ার কোন কারণ নাই আমার। আমি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বাসী । কিন্তু ঢাকার মেয়র নির্বাচন নিয়ে যতটা উত্তাপ বা আগ্রহ ছিল তাতে পানি ঢেলে দিয়েছেন কারা? না সরকার, না প্রশাসন, না কোন মস্তানতন্ত্র। স্বয়ং ভোটাররাই বুঝিয়ে দিয়েছেন খামোখা ভোট কেন্দ্রে যাবার দরকার নাই। এটা তো ঘর সংসার অফিস আদালত সব জায়গায় দেখি আমরা। বাড়িতে কাজের মানুষ নামে পরিচিত গৃহকর্মীদের কি কিছু বলার থাকে? বাড়িতে বয়সে ছোটদের কী কোনও কথা আমলে নেয় কেউ? সংসারে অল্প উর্পাজন বা পিছিয়ে পড়া সদস্যদের কথা কি কেউ গ্রাহ্য করে? এ যেন তেমন কিছু। আমজনতার কথা কেউ শোনে না। পরিস্থিতি কতটা গম্ভীর হলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে বলতে হয় তাকে কারচুপি করে হারানো হয়েছে।
আমরা রাজনীতি করি না। ফলে মারপ্যাঁচ বুঝিনা। আমাদের ধারণা ভোট মানে জনগণের মতামতের প্রতিফলন। সে জায়গায় যদি এমন নয়-ছয় হতে থাকে মানুষ কেন ভোট কেন্দ্রে যাবেন? এত কম ভোট পড়েছে তারপরও দেখছি গুরুতর সব অভিযোগ আনা হচ্ছে। মৌখিকভাবে একজনকে বিজয়ী বলে ঘোষণার পর আবার বদলে গেছে ফলাফল। পরে কর্তারা বলছেন মৌখিক কথাই নাকি চূড়ান্ত না। কি সাংঘাতিক সব কথা। এসব প্রমাণ করে দেয় কোথাও কোন ধারাবাহিকতা নাই। নাই স্বচ্ছতা। আওয়ামী লীগের এই টানা শাসন আর শেখ হাসিনার উদ্ভাসের কালে ও যদি সিস্টেম ঠিক করা না যায়, জনগণগ্রাহ্য করে তোলা না যায়, ভবিষ্যত কী হতে পারে?
এটা আমরা অনেকে মানি সুষ্ঠু ভোট হলে হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে কিন্তু নৌকার জয় হবে। মানুষ অতো বোকা না। তারা দেশ সমাজ সংসার জীবনের প্রগতি পায়ে ঠেলে অকারণে বিলেতের ভূত ডেকে আনবে না। তারা এটাও বোঝে কোন দল আসলে কী হতে পারে। মানুষ নিশ্চিতভাবে মানে বিএনপির এখন না আছে নেতৃত্ব, না কোন ভবিষ্যৎ। এমন দলকে তারা জাতি পরিচালনার ভার দেবে কেন? কিন্তু ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্রের নামে যেকোনও অচলায়তন বা একমুখি মনোভাব কোনকালে সুফল বয়ে আনে নি। তাই ভালোবাসা থেকেই বলি ভোটারদের দোষ দেবেন না। তারা যা উৎসব জানতো তা এখন অতীত। তারা যে ভোটকে পরিবর্তনের হাতিয়ার মানতো তা এখন হয় হাস্যকর, নয়তো একতরফা। অথচ বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগের না আছে বিকল্প, না কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী।
ভোটারেরা কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থেকে বাড়িঘরে হয়তো নিজেদের মত করে সময় কাটিয়েছে। কিন্তু তাদের চোখ-কান তো খোলা। তারা সব দেখে, সব শোনে। তাদের নীরবতার মানে কি সেটা নিশ্চয়ই একদিন সময় বলে দেবে।
