২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

‘কোভিড পরবর্তী শিশুশিক্ষা হোক সামাজিক’

‘কিডজ’ এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শিশু-কিশোরদের নানা বিষয়ে ভাবনা জানাচ্ছেন কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক কবি মাজহার সরকার।

কিডজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Feb 2023, 10:14 PM

Updated : 08 Feb 2023, 10:21 PM

আফসানা বেগম কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। শিশু-কিশোরসাহিত্যসহ তার বইয়ের সংখ্যা ২৪। উল্লেখযোগ্য বই: ‘প্রতিচ্ছায়া’, ‘বেদনার আমরা সন্তান’, ‘আমি অথবা আমার ছায়া’, ‘দিনগত কপটতা’ ইত্যাদি। অনুবাদ করেছেন নাদিন গর্ডিমার, উইলিয়াম ফকনার, হুলিও কোর্তাসার, অ্যালিস মানরো, আইজ্যাক আসিমভ, ফিদেল কাস্ত্রোসহ অন্যান্য লেখকের রচনা। ২০১৪ সালে পেয়েছেন জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার।

অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে ‘কিডজ’ এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শিশু-কিশোরদের নানা বিষয়ে আফসানা তার ভাবনা জানাচ্ছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক কবি মাজহার সরকার।

এবারের বইমেলায় আপনার কী কী বই প্রকাশিত হয়েছে? বিষয়বস্তু কী?

এবারের বইমেলায় আমার একটি গল্পের বই ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া দুটো অনুবাদ বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হবে। অনুবাদ দুটি হলো আইজ্যাক আসিমভের রোমান ইতিহাসের বই, রোমান আম্পায়ার ও রোমান রিপাবলিক।

এবারে আমার গল্পের বইয়ের নাম ‘দহনদিনের বীণা’, প্রকাশিত হয়েছে প্রথমা প্রকাশনী থেকে। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীকালে সমাজে মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে ধারণ করে- এ বিষয়ে লেখা বেশকিছু গল্পের সংকলন বইটি। গল্পগুলোতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অতি সাধারণ মানুষের কাহিনি, বিশেষ করে নারীর অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি, যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাসে সাধারণত স্থান পায় না। উপন্যাস ‘অনন্তের কাছে’ প্রকাশিত হয়েছে কথাপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুজন তরুণ-তরুণীর সংলাপের মধ্যে দিয়ে কাহিনি এগোয়। কথোপকথনে সাম্প্রতিক সামাজিক জীবন কখনো পরাবাস্তবতার দিকে চলে যায়। আলাপে আলাপে যে জটিলতার সৃষ্টি হয় কাহিনির এক স্তরে এসে তার সমাধানও হয়।

নতুন সংস্করণে যে অনুবাদ বই দুটো আসবে তার বিষয়বস্তু রোমান সাম্রাজ্যের পত্তন, উত্থান ও বিস্তৃতি। আইজ্যাক আসিমভ কল্পকাহিনি লেখার আদলে ইতিহাস লেখেন।এ বই দুটিও তার ব্যতিক্রম নয়। অনুবাদে আমি তার রচনার মূল সুরটি বজায় রাখতে চেষ্টা করেছি।         

আপনার বইপড়া শুরু কখন ও কীভাবে?

খুব অল্পবয়সে বলতে গেলে শিশুকালে বাড়িতে বই নাড়াচাড়া করতে করতে বইয়ের সঙ্গে পরিচিতি। তারপর প্রাইমারি স্কুলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পাওয়া বই দিয়েই প্রথম বই পড়ার অভ্যাসের শুরু। ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যদের আনা বই ও ম্যাগাজিন পড়া এবং শহরের লাইব্রেরি ও স্কুলের লাইব্রেরি থেকে ক্লাসিক বই তুলে এনে পড়ার মধ্যে দিয়ে নিয়মিত পাঠক হওয়া।

চারদিকে মানুষকে তখন বিনোদন বা অবসর কাটানোর মাধ্যম হিসেবে বই পড়তেই দেখেছি। হাতের কাছে বই পাওয়াও সহজ ছিল। তাই পাঠের আনন্দ আবিষ্কার করা কঠিন হয়নি। এভাবে বই পড়তে পড়তেই বই পড়ার অভ্যাসের শুরু।

সাহিত্যচর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবে কি কোন অনুষঙ্গ পেয়েছিলেন?

যখন লেখালেখি শুরু করি তখন সাহিত্যচর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিল একাকিত্ব ও নিজেকে আবিষ্কার করার তাগিদ। পাঠক ছিলাম বরাবরই, তাই জমে থাকা কথা কল্পকাহিনির আদলে লিখে ফেলা একরকম আনন্দের ছিল। লিখতে পারার তৃপ্তিই অনুপ্রেরণা হিসেবে পরবর্তী লেখার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

হারুকি মুরাকামি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি তার শৈশব-কৈশোরে খুব বেশি জাপানি সাহিত্য পড়তেন না। পরিবারে জাতীয় সংস্কৃতি চর্চা থাকলেও তার একঘেয়ে লাগতো। তা থেকে পালাতে চাইতেন। প্রশ্ন হলো, যে কোন জাতীয়তাবাদ আমাদের শিশুদের মননশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারছে কিনা?

এখন বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগ। সারা পৃথিবীর তথ্য আমাদের চোখের সামনে ঘোরাফেরা করে। শিশুদের হাতে যে প্রযুক্তি আছে তাতে যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো সাংস্কৃতিতে তারা অবগাহন করতে পারে। একইসঙ্গে কয়েকটি ভাষার সঙ্গে তাদের গভীর পরিচিতি ঘটে। এখন তাই কেবল নিজের ভূখণ্ডের জাতীয়তাবোধ শিশুর মননশীলতা তৈরি করতে অপারগ। বর্তমানে বেশিরভাগ শিশু মিশ্র সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে বলে জাতীয়তাবোধের প্রতি জীবনভর দায়িত্বশীল থাকা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

প্রতিবছর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সারমর্মে আমরা ‘অমর একুশে বইমেলা’ করি। কেবল বই ছাপিয়ে কি ভাষা রক্ষা করা সম্ভব?

ভাষার লিপি রক্ষার্থে বই ছাপানো ও ছড়িয়ে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে ভাষা প্রকৃতপক্ষে এক জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে না। ভাষা প্রবাহমান। প্রতিনিয়ত নানান ভাষার নানান শব্দ ও ভাব তাতে মিশে যায়। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজলভ্যতার কারণে ভাষা আগের চেয়েও দ্রুত পরিবর্তনশীল। ভাষা লিখিত ও মৌখিক দুভাবেই ভিন্ন চেহারা নিতে নিতে মানুষের জীবন যাপনে মিশে থাকে। এক্ষেত্রে বই ছাপানো ভাষা রক্ষার অনেক পদক্ষেপের মধ্যে একটি হতে পারে।

যদিও অমর একুশের বইমেলা ভাষা আন্দোলনের রেশ হিসেবে বিবেচনা কথা করা হয়, তবে আমি এতে মূলত ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই। বই পণ্য হিসেবে এখানে উপস্থাপিত হয়, পণ্য অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে ভাষার দীর্ঘজীবিতার ক্ষেত্রে কিছু উপকার হলে ভালো। তবে আমার কাছে বইমেলার পুরো কার্যক্রমে ভাষা রক্ষার উদ্দেশ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভের উদ্দেশ্য বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

এবছর বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন বইয়ে নানা ভুল নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। এ থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর উপায় কী?

শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর একমাত্র উপায় নির্ভুল বই উপস্থাপন। বইয়ের ভুলগুলো সংশোধন করে নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মহামারী-উত্তর সময়ে ১০ বছর বয়সী বিশ্বের কেবল এক তৃতীয়াংশ শিশু পড়তে পারে এবং সাধারণভাবে লেখা একটি গল্প বুঝতে পারে। এ অবস্থায় শিশুশিক্ষা বাড়াতে এবং তাদের বইপাঠে অভ্যস্ত করতে আমাদের উপায়গুলো কী হওয়া উচিত?

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে জীবন, পরিবেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রাথমিক পাঠ পাওয়ার সময়টিতে পৃথিবীর অসংখ্য শিশুকে বাড়ির ভেতরে বন্দি করে রাখতে হলো। তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেখার সময় অবহেলায় চলে গেল। তারা বিদ্যালয় ভুলে হয়তবা একটি ডিভাইসের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অতিমারী পরবর্তী সময়ে শিশুকে প্রযুক্তির উপরে নির্ভরশীলতা ভুলিয়ে পুনরায় বা নতুন করে সামাজিক হবার শিক্ষা দেওয়া আমার কাছে জটিল বলে মনে হয়। আবার বেশ বড়ো একটা সময় হেলায় হারিয়েছে বলে তাদের উপরে একবারে অনেককিছু চাপিয়েও দেওয়া যাবে না। আমার ধারণা ধীরে ধীরে তাদেরকে বাড়িতে এবং স্কুলে পাঠ ও সামাজিক কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় স্কুল ও বাড়িতে তাদেরকে আকর্ষণীয় ব্যবহারিক কাজে ব্যস্ত রাখা প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।

ই-বুক তো চলে এসেছে, শিশুকিশোররা গেজেট ব্যবহার করতে শিখছে। এটা অর্থপূর্ণ সংবেদ তৈরি করতে পারছে কিনা? কী করা প্রয়োজন?

আজকাল অনেক শিশুই কাগজের বইয়ে অভ্যস্ত হবার আগেই ই-বুক হাতে পায়। আমার মনে হয়, যে মাধ্যমেই পড়ুক সে তো পাঠই করছে। তাই ই-বুক পড়তে স্বাচ্ছন্দবোধ করলে তাকে ওই মাধ্যমেই গুরুত্বপূর্ণ রচনা পড়তে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।

আপনার শৈশবের কোন আনন্দের বা দুঃখের স্মৃতি?

আমার শৈশব ছিল আনন্দে মোড়ানো। সংস্কৃতিচর্চা আর পাঠের পারিবারিক পরিবেশে আমি বেড়ে উঠেছি। পাঠজনিত আনন্দের স্মৃতি হলো, পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার পর বাবার হাত থেকে শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলী উপহার পাওয়া। আর দুঃখের স্মৃতি হলো, অর্ধেক পড়ার পর জোবাইদা মির্জার ‘নানা রঙের দিনগুলি’ বইটা হারিয়ে যাওয়া, যা অবশ্য আমি তিরিশ বছর পরে শাহবাগের এক বইয়ের দোকানে পাই ও বাকি অর্ধেক পড়তে পারি। তাই ছোটোবেলার সেই দুঃখের স্মৃতি এখন আর দুঃখ দেয় না।

শিশু-কিশোরদের জন্য আর কী লেখার বা করার পরিকল্পনা আছে আপনার?

এ বছরটায় আমি অস্বস্তিতে আছি এটা নিয়েই যে এ বছর শিশুকিশোরদের জন্য দু-একটা গল্প ছাড়া দীর্ঘ কিছু লিখিনি। আগামি বছরে অবশ্যই শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার পরিকল্পনা থাকছে। আসছে বছরে কিশোর উপন্যাস ও সায়েন্স ফিকশন লেখার ইচ্ছে রাখি।