তাকে হারানোর বেদনা অভিভাবক হারানোর মত: রাজ্জাককে নিয়ে শাকিব
পাঁচশর বেশি চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে খ্যাত ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক নামে।
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাকের হারানোর বেদনা ‘অত্যন্ত ব্যক্তিগত’ বলে জানিয়েছেন চিত্রনায়ক শাকিব খান। রাজ্জাককে নিজের অভিভাবক ও মাথার ওপর ছায়া হিসেবেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
নায়ক রজ্জাকের নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে শুক্রবার ফেইসবুকে একটি পোস্টে নিজের আবেগ প্রকাশ করেছেন শাকিব।
এই নায়ক বলেছেন নায়করাজকে হারানোর শূন্যতা আজও সমানভাবে অনুভব করেন তিনি।
শাকিবের কথায়, “তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি নায়ক ছিলেন না, ছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের অভিভাবক, অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসার এক বিশাল আশ্রয়।”
শাকিব লিখেছেন, “তিনি স্নেহ দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকদিন দেখা না হলেও কীভাবে যেন বুঝে যেতেন, আমি কেমন আছি, কীসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি! তাকে হারানোর বেদনা আমার কাছে নিজের অভিভাবক হারানোর মত - খুবই ব্যক্তিগত।”
রাজ্জাককে নিজের এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা বর্ণনা করে শাকিব লিখেছেন “তিনি নেই, কিন্তু তাঁর স্নেহ, শিক্ষা ও আশীর্বাদ এখনও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যতদিন থাকবে, নায়করাজ ততদিনই থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের অহংকার হয়ে।
“শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি আপনাকে। শান্তিতে থাকুন, আমাদের প্রিয় নায়করাজ।”
পাঁচশর বেশি চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে খ্যাত ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক নামে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাদা কালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে গেছেন তিনি।
অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজ্জাকের জন্ম। টালিগঞ্জের খানপুর হাইস্কুলে পড়ার সময় নাটকের মধ্যে দিয়ে অভিনয় শুরু। কলেজে পড়ার সময় ‘রতন লাল বাঙালি’ নামে একটি সিনেমার অভিনয় করেন তিনি।
অভিনেতা হওয়ার মানসে ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমালেও সেখানে সফল না হওয়ায় টালিগঞ্জে ফেরেন রাজ্জাক। কিন্তু কলকাতায়ও পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন।
১৯৬৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে অভিনয়ের সুযোগ নেন রাজ্জাক। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি তবে নায়ক হিসেবে নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে।
সেই সময়ের সংগ্রামের কথা রাজ্জাক নিজেই বলে গেছেন এভাবে- “আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি, না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি।”
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
এক সময় জহির রায়হানের নজরে পড়েন রাজ্জাক। তিনি ‘বেহুলা’য় লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ দিলেন রাজ্জাককে, সুচন্দার বিপরীতে। ‘বেহুলা’ ব্যবসাসফল হওয়ায় আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে।
সুদর্শন রাজ্জাক সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দেন ঢালিউডকে। এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়।
সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেছেন তারা। ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’ এবং স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্র উপহার দেন এই জুটি।
রাজ্জাকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘মনের মতো বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বেঈমান’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে বাংলাদেশে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সূচনা ঘটান রাজ্জাক। এরপর ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে পর্দায় দেখেছে দর্শক।
তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র কার্তুজ, পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র আয়না কাহিনী।
অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় তাকে। ২০১৫ সালে তিনি পান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার।
বদনাম, সৎ ভাই, চাপা ডাঙ্গার বউসহ প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক। তার মালিকানার রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।
অভিনয় জীবনের বাইরে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক।
শেষের দিকে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যের নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের ২১ অগাস্ট ৭৫ বছর বয়সে চলে যান নায়করাজ রাজ্জাক।
