৫৫২ মিনিটের মাস্টারক্লাসের পর বাভুমার যে গর্ব
প্রতিরোধ আর পাল্টা আক্রমণের সমন্বয়ে অসাধারণ ইনিংস খেলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দারুণ অবস্থানে নিয়ে গেছেন অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা।
টেম্বা বাভুমা ক্রিজে গিয়ে গার্ড নিয়েছিলেন রোববার। আউট হন মঙ্গলবার। মাঝের সময়টায় তিনি রচনা করলেন মহাকাব্য। যেটিকে বলা যায় তার ক্যারিয়ারের প্রতীকী। যেখানে ছিল লড়াই, স্কিল, নিবেদন ও প্রতিজ্ঞা। সবকিছু মিলিয়ে সেখানে প্রাপ্তি একটি গর্ব। বিপর্যয়ে দলের আশ্রয়স্থল হওয়ার, বিপদে দলকে ভরসা জোগানোর আর ধ্বংসস্তূপে সৌধ গড়ে তোলার গর্ব।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গেবেখা টেস্টের প্রথম দিনে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন বাভুমা, দক্ষিণ আফ্রিকার রান তখন ২ উইকেটে ১২। স্কট বোল্যান্ডের সামনে হ্যাটট্রিকের হাতছানি। সেখান থেকেই তার লড়াইয়ের শুরু। বৃষ্টি ও আলোকস্বল্পতা মিলিয়ে সেদিন খেলা হলো স্রেফ ১২.২ ওভার। বাভুমা পার করে দিলেন সময়টা।
পরদিন আবহাওয়ার বাধা পেরিয়ে লম্বা সময় পর খেলা শুরু হলো। দক্ষিণ আফ্রিকা হারাল আরও তিন উইকেট। কিন্তু বাভুমা অটল। সেদিন খেলা হলো ৩০ ওভারের একটু বেশি। দিন শেষে বাভুমা অপরাজিত ৪১ রানে।
অবশেষে তৃতীয় দিনে খেলা হলো পুরো দিন। জমে উঠল ব্যাট-বলের লড়াই। সেখানে নায়ক একজনই। সেই বাভুমা! প্রায় গোটা দিন ব্যাট করলেন। কখনও চোয়ালবদ্ধ লড়াই, কখনও প্রতিরোধ, কখনও পাল্টা আক্রমণ। ৯ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মেলে ধরলেন ব্যাটিং মাস্টারক্লাস।
নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন আউট হলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়কের নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছেন ৫৫২ মিনিটে ৩৩৪ বলে ১৭৯ রান। তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস।
এর চেয়েও বড় কথা। দল তখন এমন অবস্থানে, যেখান থেকে এই ম্যাচ হারার আর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, বরং জয়ের হাতছানিও আছে। এক পর্যায়ে ৬ উইকেটে ১১০ রান নিয়ে কাঁপছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই দল ইনিংস ঘোষণা করল ৫ উইকেটে ৪২৫ রান নিয়ে!
এবারই প্রথম নয়, আগেও নানা সময়ে দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন বাভুমা। দিনের খেলা শেষে তিনি বললেন, কঠিন পরিস্থিতিই বের করে আনে তার সেরাটা।
“যখন আমি ক্রিজে যাই, তখন সবকিছুই বোলারদের পক্ষে ছিল; কন্ডিশন, আলো, পিচ। আমরা শুরুতেই দুটো উইকেট হারিয়েছিলাম। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকবারই পড়েছি। এটাই আমার সেরাটা বের করে আনে।
“কাজের ধরনের দিক থেকে এবার কোনো ভিন্নতা ছিল না। সবসময় এভাবেই কাজ করি – নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলি। দলকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসতে পারলে গর্ববোধ করি। এবার ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে যা ভিন্ন ছিল, তা হলো এবার (বড়) রান করতে পেরেছি।”
৬৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে তার পঞ্চম সেঞ্চুরি এটি। এই পরিসংখ্যান খুব উজ্জ্বল কিছু নয়। তবে প্রথম ৫৫ টেস্টে তার সেঞ্চুরি ছিল স্রেফ একটি। সেই অধ্যায় পেরিয়ে পরের ১৩ টেস্টে চারটি সেঞ্চুরি করতে পারলেন।
এবারের ইনিংসটি যদিও তার কাছে আলাদা জায়গা নিয়ে থাকবে নানা কারণে। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার প্রথম শতরান এটিই। দ্বিতীয়ত, যেভাবে তিনি ইনিংসটি গড়েছেন। সব মিলিয়ে দারুণ খুশি ৩৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
“অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি সেঞ্চুরি করতে পেরে আমি খুশি। পুরো ব্যাপারটা ঠিকমতো উপলব্ধি করার সময় এখনও পাইনি। অবশ্যই নিউল্যান্ডসের সেঞ্চুরিটা (ক্যারিয়ারের) নানা কারণে সেরা হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে, দলকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা এবং তারপর একটি বড় সেঞ্চুরি করা—এটা নিঃসন্দেহে আমার ব্যাটিং ক্যারিয়ারে একটি কাঁটার মতো ছিল। মানসিকভাবে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরে ভালো লাগছে।”
নায়ক বাভুমার পাশে দুজন পার্শ্বনায়কও ছিলেন। দল যখন ধুঁকছিল, তখন ক্রিজে গিয়ে স্বভাবজাত পাল্টা আক্রমণে ৮৫ রানের ইনিংস খেলেন মার্কো ইয়ানসেন। সপ্তম উইকেটে বাভুমার সঙ্গে তার জুটি চির ১৩২ রানের।
দ্বিতীয় নতুন বলের প্রথম ওভারেই ইয়ানসেনকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন বোল্যান্ড। মনে হচ্ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসও শেষে পথে। কিন্তু সেখান থেকেই অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে অধিনায়ককে সঙ্গ দেন সাইমার হার্মার। অষ্টম উইকেটে গড়ে ওঠে ১৮৩ রানের জুটি!
আগের ১৫ টেস্টে স্রেফ একবার ৪০ ছুঁতে পারা ব্যাটসম্যান হার্মার এবার ২০৮ মিনিট ক্রিজে থেকে উপহার দেন ১৫৭ বলে ৮২ রানের ইনিংস।
লড়াইয়ে দুই সঙ্গীকে কৃতিত্ব দিতে ভুললেন না বাভুমা।
“মার্কো (ইয়ানসেন) বোলারদের ওপর চড়াও হয়েছিল। ব্যাটের মাঝখানে বল লাগছিল তার এবং মাঠের ফাঁকা জায়গায় বল পাঠাতে পারছিল। সাইমনও (হার্মার) নিবেদন দেখিয়েছে। নিজেদের উইকেট অনেক বেশি মূল্যবান মনে করছিল তারা।”
হার্মার আউট হওয়ার পরের ওভারেই বাভুমা আউট হন। ইনিংসও ঘোষণা করে দেন তখনই। শেষ বিকেলে অস্ট্রেলিয়ার একটি উইকেট নিতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা।
ম্যাচে বাকি আর মোটে দুই দিন। জয়-পরাজয় বের করাটা খুবই কঠিন। তার পরও জয়ের ছবি আঁকার সাহস এখন পাচ্ছেন বাভুমা।
“ফলাফল যদি আমাদের পক্ষে আনতে হয়, তবে এই দুই দিনের বেশিরভাগ সময় আমাদের মাঠেই কাটাতে হবে। মানসিকভাবে এর জন্য আমাদের সারারাত ধরে প্রস্তুতি নিতে হবে। পিচে এখনও কিছু (প্রাণ) আছে, বিশেষ করে নতুন বলের কারণে।
“যদি আমরা টানা বেশ কিছুক্ষণ ধরে বল সঠিক জায়গায় রাখতে পারি, তাহলে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। আমরা জিততে চাই এবং সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
