২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

চার বছরেও ‘কপাল ফেরেনি’, ফিরল লাশ

“ছয় মাসের সন্তান আর নতুন সংসার রেখে আবার গেল, এখন বাচ্চাটার বয়স নয় মাস,” বলেন নিহত সোহেলের শাশুড়ি।

চার বছরেও ‘কপাল ফেরেনি’, ফিরল লাশ
সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ফরিদ উদ্দিনের লাশ গ্রহণ করতে বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন বোন রুলি।

মাছুম কামাল মাছুম কামাল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Aug 2026, 10:58 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:27 PM

সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদ উদ্দিন। চার বছরেও তার ‘ঋণ শোধ হয়নি’, কপাল ঘোচেনি। এর মধ্যেই তিনি ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে।

ফরিদের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামে। সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে যেসব বাংলাদেশির প্রাণ গেছে তাদেরই একজন তিনি।

বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার লাশ গ্রহণ করতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন বোন রুলি। অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘণ্টা দুই আগে ফরিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার।

ভাইয়ের কথা তুলে ধরে বিমানবন্দরে রুলি বলেন, “কাজ থ্যাকা আইসা গরুর মাংস দিয়া ভাত রানছিল। ফোন দিয়া বলছিল—‘খাইয়া উইঠা ঘুমামু, ঘুম থ্যাকা উইঠা সবাই একসাথে কথা বলব। তোর ভাবি যেন ফোন না দেয়।

“আগুন লাগার মাত্র ২ ঘণ্টা আগের কথা। এরপর খবর এল ভাই আর নাই, আগুনে পুড়ে শেষ।”

ফরিদের এক ভাগনে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে দেশে পরিবারকে জানান।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন ফরিদ। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে তার সংসার। তার মৃত্যুতে এখন পুরো পরিবার দিশেহারা।

রুলি বলেন, ধারদেনা করে তার ভাই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় পালিয়ে পালিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এখন লাশ এল দেশে।

“ভাইকে আমরা সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে পাঠাইছিলাম। কিন্তু ভাই তো ঠিকমত কাজই পায় নাই, এক টাকা ঋণও শোধ করতে পারে নাই। সব চাপ আমাদের ওপরই ছিল।

“এখন ছোট ছোট বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ওনার স্ত্রী কীভাবে চলব? পরিবারে তো আর কোনো উপার্জন করার লোক নাই। সরকারের কাছে দাবি, ভাইয়ের ঋণগুলো যেন শোধের ব্যবস্থা করে এবং এতিম বাচ্চা দুটোর লেখাপড়া ও সংসারের জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করে।”

গত ৯ অগাস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ বৃহস্পতিবার দেশে এসে পৌঁছায়, যার মধ্যে সাতজনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার। অন্য দুজন নাটোরের নলডাঙ্গা ও রাজশাহীর বাগমারার বাসিন্দা।

নিহত আরেকজন নওগাঁর ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছর পর দেশে ছয় মাসের জন্য এসেছিলেন। এরপর আবার সৌদিতে ফিরে যান। তার নয় মাস বয়সের এক সন্তান রয়েছে।

সোহেলের শাশুড়ি শরিফা বলেন, “মেয়ের জামাইয়ের তো নিজের কোনো জায়গা-জমি ছিল না। কোনোরকমে একটা ঘর তুলেছিল। ছয় মাসের সন্তান আর নতুন সংসার রেখে আবার গেল, এখন বাচ্চাটার বয়স নয় মাস।

“আমার মেয়েটা কেঁদে কেঁদে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। আর বাচ্চাটা ঘরে কান্নাকাটি করছে।”

ফরিদ ও সোহেল ছাড়াও আত্রাইয়ের নিহত অন্যরা হলে- গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রমানিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামানিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, মার্কাসুন্দা গ্রামের তমেজউদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল।

এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙা থানার মহিষডাঙা গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রাম গ্রামের কলিমুদ্দিন মাঝির ছেলে শ্যামল উদ্দিন মাঝির মরদেহ দেশে এসেছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে কফিনগুলো প্রত্যেকের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে পাঠানো হয়।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন অনুদান হিসেবে ৩ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।