জাতীয় কবি নজরুলের জন্মদিনে সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা
“বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী জাতীয় কবির চেতনা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুগেযুগে অনুপ্রেরণা জোগাবে।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে তার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
এরপর এক স্মরণ সভায় নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি, সেখানে সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সংগীত পরিবেশন করেন।
সোমবার কবির জন্মবার্ষিকীর সকালে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে কবির সমাধিতে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর তারা ফাতেহা পাঠ করেন।
পরে কবির সমাধি প্রাঙ্গণে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেখানে কাজী নজরুল ইসলামের চেতনা ধারণ করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
স্মরণসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বক্তব্য রাখেন ।
এছাড়া বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা রাখেন। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যা সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ সালেকীন) অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
উপাচার্য ওবায়দুল ইসলাম বলেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও অভাব-অনটনের মধ্যেও জাতীয় বইএ লেখনি থেমে থাকেনি। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে তার সফল বিচরণ ছিল।
জাতীয় কবিকে তিনি সাম্যের, বিদ্রোহের, প্রেমের শান্তির ও সব্যসাচী কবি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “গবেষণা ও চর্চার মাধ্যমে তার দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।”
বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী জাতীয় কবির চেতনা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুগেযুগে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি
বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি নজরুল ইসলাম। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাকে বাংলাদেশে এনে নাগরিকত্ব ও জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র তিনি মারা যান।
শৈশবে পিতৃহারা নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের মক্তবে। পরিবারের ভরণ-পোষনের জন্য মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি গ্রামের মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ নেন।
রাঢ় বাংলা (বর্ধমান-বীরভূম) অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গীক লোকনাট্য লেটো দলে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যে নজরুলের শিক্ষকতার সমাপ্তি ঘটে। ওই সময়ই তাৎক্ষণিক কবিতা ও গান লেখার দক্ষতার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
১৯১০ সালে লেটো গানের দল ছেড়ে দিয়ে প্রথমে রানীগঞ্জ সিয়ারসোল স্কুল এবং পরে মাথরুন স্কুলে (নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউশন) ভর্তি হলেও আর্থিক অনটনের কারণে আবারও আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নিতে হয় নজরুলকে। সেখানেই আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
রফিজউল্লার আগ্রহে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন নজরুল। সেখানে এক বছর ছিলেন তিনি। সেই ত্রিশালেই নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রবেশিকা শেষ না করেই ১৯১৭ সালের শেষ দিকে স্কুল ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন নজরুল। ১৯২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর চলে তার সেই সামরিক জীবন।
১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী'। ব্রিটিশ রাজের ভিত কেঁপে উঠেছিল তার অগ্নিগর্ভ কবিতার বজ্রনির্ঘোষে। ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য বেশ কয়েকবার কারারুদ্ধ হতে হয় তাকে।
একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তার গ্রন্থ অগ্নিবীণা, প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, ছায়ানট, বিষের বাঁশি, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী, ব্যথার দান, ঘুমের ঘোরে, মৃত্যুক্ষুধা।
নজরুল প্রতিভার আরেকটি দিক প্রভা ছড়িয়েছে সংগীতে। শ্যামা সংগীত ও ইসলামী গজল- দুই ধারাতেই সমান দখল দেখানো নজরুলের লেখা গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি।
সৈনিক জীবনের সমাপ্তির পর নজরুলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজাফফর আহমদের সঙ্গে। সে সময় তিনি সাপ্তাহিক লাঙ্গল, গণবাণী, ধূমকেতু, সওগাত ও সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন।
নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।
১৯২১ সালে কুমিল্লায় প্রমীলা দেবীর সঙ্গে পরিচয়ের তিন বছর পর পরিণয়। কবি পরিবারে আসেন কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ।
১৯৪২ সালে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্রমশ বাকশক্তি হারান নজরুল। স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। নজরুল হন বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশেষ সমাবর্তনের মাধ্যমে নজরুলকে সম্মানসূচক 'ডিলিট' উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয় নজরুলকে।
সে বছরই ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মানবতা ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের। জাতীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে।
